নবজাতক বাছুরের যত্ন

Thursday, 31 October 2019 12:29 PM

একটি দুগ্ধ খামারের সাফল্য মূলত দুগ্ধ প্রাণীর যত্ন এবং পরিচালনার উপর নির্ভর করে। খামারের সমস্ত কাজকর্ম পরিকল্পনা এবং খুব সতর্কতার সাথে সম্পাদন করা উচিত। যদি আপনি কোনও প্রাণীর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে আরও বেশি উত্পাদন চান, তবে সেই প্রাণীটির যত্ন তার জন্মের ঠিক পরেই শুরু করা উচিত। এই সময়ে যে কোনও ছোট ভুল কৃষক বা উত্পাদকের জন্য বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই নিবন্ধে, আমরা দুগ্ধজাত গবাদি পশুদের নবজাতক বাছুরের পরিচর্চার জন্য যে সকল পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, সেগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

প্রথমত, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল গাভীর প্রসব করার সম্ভাব্য তারিখটি জানা। একটি গাভীর গর্ভধারণের সময়কাল গড়ে ২৮২ দিন। তবে এটি ২৭০ থেকে ২৯০ দিনের মধ্যে পরিবর্তিত হতে পারে। কৃষক কৃত্রিম গর্ভধারণ বা প্রাকৃতিক সঙ্গমের দিন থেকে সহজেই প্রসবের দিন গণনা করতে পারেন। পরিকল্পনাও সেই অনুযায়ী শুরু করা উচিত। যখন গর্ভধারণের সময়টি সমাপ্ত হওয়ার কাছাকাছি হয়, তখন গরুটির স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। প্রসবের সময় উপস্থিত হলে গরুটিকে অবিলম্বে সন্তান প্রসবের জন্য বিশেষ ঘরটিতে স্থানান্তরিত করতে হবে। ঘরটি পরিষ্কার করে জীবাণুনাশক করতে হবে, ঘরটি যেন উন্মুক্ত হয়, যাতে বায়ুচলাচল ভালভাবে করতে পারে এবং ভালভাবে আস্তরণ দিতে হবে। সাধারণত প্রসবের প্রক্রিয়াটি প্রায় ২ থেকে ৩ ঘন্টা সময় নেয়। যে সকল গাভী  প্রথম বার বাচ্চা দিচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি ৪ থেকে ৫ ঘন্টা বা তার বেশি সময় নিতে পারে। প্রসবের সময়, প্রাণীটিকে বিরক্ত করা উচিত নয়, তবে দূর থেকে লক্ষ্য করা উচিত। সাধারণত, গৃহপালিত পশুদের কোনও মানুষের কোনও সহায়তার প্রয়োজন হয় না। যদি কোনও সঙ্কটজনক অবস্থা দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রসবের পরে, গরু এবং বাছুর উভয়ের জন্য যথাযথ যত্ন নেওয়া উচিত। বাছুরের যত্ন নেওয়ার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলি মনে রাখতে হবে-

  • নবজাতক বাছুরের জন্মের পরের সময়টি হল তার পুরো জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। একে সুবর্ণ সময় বলা হয়।
  • বাছুরের জন্মের পরপরই নাক এবং মুখ থেকে সমস্ত শ্লেষ্মা সরিয়ে ফেলা উচিত। যদি বাছুরটি শ্বাস নিতে অক্ষম হয়, তবে বাছুরটিকে পাশে রাখার পরে বক্ষ সঙ্কুচিত ও প্রসারিত করে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবহার করা উচিত।
  • মাকে বাছুরটিকে লেহন করতে দেওয়া উচিত, যা বাছুরের দেহের মধ্যে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে এবং বাছুরটিকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত করে।
  • জন্মের পরে বাছুরের নাভিতে টিঙ্কচার আয়োডিন প্রয়োগ করুন। কর্ড যদি দীর্ঘ হয়, তবে আয়োডিন লাগানোর আগে এটি শরীর থেকে প্রায় ২ ইঞ্চি কেটে ফেলতে হবে।
  • সাধারণত, বাছুরটি তার জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে তার পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। তবে যদি বাছুরটি দাঁড়াতে অক্ষম হয়, তবে স্বল্প সহায়তা প্রদান করা উচিত। এটিও নিশ্চিত করা উচিত যে, বাছুর মায়ের দুগ্ধ চুষার আগে গরুর বাঁট পরিষ্কার করতে হবে।
  • বাছুরের জন্মের পর কমপক্ষে দুদিনের জন্য প্রথম দুধ বা কোলস্ট্রাম পাওয়া উচিত। কোলস্ট্রাম বাছুরের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। বেশ কয়েকটি পুষ্টি উপাদান এবং অ্যান্টিবডি কোলস্ট্রামে উচ্চ পরিমাণে উপস্থিত থাকে। এই অ্যান্টিবডিগুলি বাছুরটিকে সংক্রমণ এবং রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে। কোলস্ট্রামকে বাছুরটির "জীবনের পাসপোর্ট" বলা হয়। প্রতিদিন বাছুরের দৈহিক ওজনের কমপক্ষে ১০% দুগ্ধ পান করানো উচিত, যা প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫-৬ লিটার হতে পারে ।
  • সম্ভব হলে বাছুরটিকে তার মা-এর থেকে দূরে সরিয়ে প্রতিপালন করা উচিত। বিশেষত বড় দুগ্ধ খামারে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়। এটি সমস্ত পরিচালনামূলক কাজকর্মকে সহজতর করে এবং পশুখাদ্য ও শ্রমের ব্যয় হ্রাস করে।  কখনও কখনও বাছুরকে ২-৩ দিনের জন্য গরুর কাছে থাকতে দেওয়া হয়।
  • প্রথম কয়েক সপ্তাহ বাছুরটিকে আলাদা খোঁয়াড়ে বা ঘরে রাখলে ভাল হয়। এতে বাছুরের উপর নিশ্চিতভাবে আরও যত্ন এবং মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়। ২ মাস পরে, বাছুরটিকে বাকি বাছুরদের সঙ্গে একদলে রাখা যেতে পারে।
  • যদি সম্ভব হয়, তবে বডিওয়েট নিয়মিত রেকর্ড করা উচিত। এটি খাওয়ার পরিমাণ এবং বাছুরের বৃদ্ধির হার নির্ধারণে সহায়তা করবে।
  • বিশৃঙ্গীতকরণ ১৫ দিনের মধ্যে করা যেতে পারে। প্রাণীদের বিশৃঙ্গীতকরণ করা জরুরি, এটি পাশাপাশি থাকা অন্যান্য প্রাণীদের থেকে ক্ষত রোধ করতে সহায়তা করে।
  • সঠিকভাবে টিকা দেওয়া ও কৃমিনাশক ওষুধ ব্যবহার করা উচিত। চিকিত্সার সময়সূচী জানতে কোনও পশুচিকিত্সকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এই অনুশীলনগুলি রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রাণীদের আরও ভাল উত্পাদনশীলতা নিশ্চিত করবে।

 উপরের বিষয়গুলি থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, বাছুরের জন্মের পরে তার যত্ন নেওয়া কেবল প্রাণীর জন্যই নয়, কৃষকের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই সঙ্কটজনক সময়ে প্রাণীটিকে যে কোন রকমের পরিস্থিতি, মানসিক চাপ ও রোগ থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এই পদ্ধতি পশুদের  থেকে ভাল উত্পাদনশীল কর্মক্ষমতা নিশ্চিত করবে এবং কৃষকের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।

তথ্যসূত্র - ডঃ প্রসন্ন পাল

অনুবাদ - স্বপ্নম সেন



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online

Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.