নিজের আলয়ে রাখুন অ্যালয় ভেরা

Tuesday, 09 October 2018 04:18 PM

অ্যালয়ভেরা বা ঘৃতকুমারী হল জনপ্রিয় একটি ভেষজ উদ্ভিদ। এটি Liliaceae গোষ্ঠীভুক্ত একটি উদ্ভিদ। এটি প্রধানত গৃহে উৎপাদিত উদ্ভিদ, এর উচ্চতা সাধারণত ১.৫ থেকে ২.৫ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। এই গাছের পাতাগুলি খুব লম্বা ও পুরু হয়ে থাকে। এই গাছের পাতার প্রস্থচ্ছেদ মোটামুটি গোলাকৃতি এবং খুব রসালো হয়ে থাকে। পাতার কিনারাগুলি ক্ষুদ্র কণ্টকযুক্ত হয়ে থাকে। পাতার উপড়ের পুরু আবরণকে কাটলে ভেতরে নিহিত ক্বাথ্‌ জাতীয়, উগ্র গন্ধযুক্ত, ও তিক্ত স্বাদের চটচটে পদার্থ নির্গত হয়ে থাকে। অ্যালয়ভেরার পাতা ২৫-৩০ সেমি দীর্ঘ ও ৩ থেকে ৫ সেমি প্রস্থবিশিষ্ট হয়ে থাকে। এই গাছে অক্টোবর থেকে জানুয়ারির মধ্যে পুষ্পবিকশিত হয়ে থাকে এবং প্রচুর পরিমাণে হাল্কা গোলাপি বর্ণের পুষ্প বিকশিত হয়। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে এইসব উদ্ভিদে ফল ধরে।

অ্যালয়ভেরা প্রধানত বীজ থেকে উৎপাদিত উদ্ভিদ নয়। প্রধানত সবজি চাষের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, সেই একি পদ্ধতি অ্যালয়ভেরার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। অ্যালপ্যাথিক ঔষধের দামের আকাশছোঁয়া দাম বৃদ্ধি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে আয়ুর্বেদিক ঔষধের জনপ্রিয়তা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সারা বিশ্বে এই বৎসর প্রায় ৮০ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার আয়ুর্বেদিক ঔষধের ব্যবসা হয়েছে এবং এটি আগামী পাঁচ বৎসরে এই ব্যবসার প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে। আমেরিকা বর্তমানে সবথেকে বেশী আয়ুর্বেদিক বাজার দখল করে রয়েছে, যেখানে ভারত ও চিনের মোট বাজারের পরিমাণ ২০ শতাংশ, যা এই দেশগুলিতে অ্যালোয়ভেরা চাষের  বাণিজ্যিক বৃদ্ধি ঘটিয়ে বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

মাটি ও জলবায়ু অ্যালয়ভেরার জন্য উষ্ণ, আর্দ্র, ও বৃষ্টিবহুল জলবায়ুর আবশ্যকতা রয়েছে। এটি যে কোনো রকমের মাটিতে জন্মাতে পারে, তবে বেলে দোঁয়াশ মাটিতে সবথেকে ভালো চাষ হয়, এবং এই মাটির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে জৈব পদার্থ থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। উজ্জ্বল সূর্যালোকে এই গাছের বৃদ্ধি খুব বেশী হয়ে থাকে। এই গাছকে যদি ছায়া ও জল ধারণে উপযুক্ত মাটিতে চাষ করা হয় তাহলে এর মধ্যে রোগপোকার ও রোগভোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে। সুতরাং, এই গাছের বাণিজ্যিক চাষে সাফল্য পেতে গেলে জলশোষনকারী মাটিযুক্ত উচ্চভূমিরূপের প্রয়োজন। এছাড়া এই উদ্ভিদের জন্য ১০০-১২০ সেমি বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চল অত্যন্ত অনুরূপ।

যেহেতু এই গাছ বীজ রা বীজাঙ্কুর থেকে জন্মায় না, তাই এই গাছ উৎপাদনের জন্য স্বাভাবিকভাবে বড় অ্যালয়ভেরার মূল ব্যবহার করলে ভালো উৎপাদনের আশা করা যেতে পারে। এই মূলের মজ্জা অংশটিকেও ব্যবহার করা যায় নতুন উদ্ভিদ উৎপাদনের ক্ষেত্রে, যেমনটা কলা গাছের উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। প্রধানত এই মজ্জা থেকে উদ্ভিদ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বর্ষাকালকেই সবথেকে বেশি উপযোগি সময় হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। প্রতিটা গাছের জন্য ১.৫ ফুটx ১ ফুট, ১ফুট x ২ ফুট, অথবা ২ ফুট x ২ ফুট জন্য জায়গা রাখা উচিত। জমি তৈরির জন্য ২ থেকে ৩ বার লাঙ্গল দিতে হবে এবং আগাছা নির্মূল এর জন্য মই দিতে হবে এবং ঢেলা ভাঙতে হবে। এরপর সমান জমি তৈরি করতে হবে, যার মধ্যে ১৫-২০ ফুট ঢালু থকবে যাতে জল কোনোভাবে না দাঁড়াতে পারে। 

কীভাবে অ্যালয়ভেরা পুঁতবেন?

১) যদি আপনি অ্যালয়ভেরা পুঁততে চান, তাহলে একটি উষ্ণ অঞ্চল বেছে নিতে হবে যেখানে গাছটি দিনে অন্তত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সূর্যালোক পেতে পারে।

২) এরপর আপনাকে ক্যাকটাস চাষের উপযুক্ত মাটি তৈরি করতে হবে যার মধ্যে কিছুটা মাটি ও কিছুটা বালি রাখতে হবে। খেয়াল রাখবেন যাতে মাটিতে জল না দাঁড়ায়।

৩) অ্যালয়ভেরার মূল অংশটি মাটি দিয়ে ঢাকা দিলেও এটা দেখতে হবে যাতে পাতার মধ্যে মাটি না লাগে। কারণ পাতায় মাটি লাগলে সেই পাতা পচে যেতে পারে।

৪) চারা পোঁতার পর কয়েকদিন মাটিতে কোনো জল না দেওয়াই ভালো। 

কখন চারার স্থানান্তর ঘটাবেন ?

অ্যালয়ভেরার মূল সাধারণত ছোট ও পাতা মূলত মূলের চেয়ে ভারী হয়ে থাকে, তাই এই গাছকে সেই সময়ই স্থানান্তর ঘটান উচিত যখন এদের শীর্ষ অংশটি ভারী ও উচ্চতাবিশিষ্ট হয়। যদি এই গাছের মূল অংশটি বাড়তে থাকে, তখন এই গাছের শাঁস বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে তাদের অনুকূল পাত্রে বাড়তে দেওয়া উচিত। আর আপনার যদি ভরভারন্ত গাছের প্রতি আকর্ষন থাকে তাহলে আপনাকে অনেক বড় পাত্রে এই গাছের স্থানান্তর ঘটাতে হবে, এবং অবশ্যই মূলের পাত্রজুড়ে ছড়িয়ে পরার আগে।

উদ্ভিদের জন্য পর্যাপ্ত সূর্যালোক ও উষ্ণতা প্রয়োজন

অ্যালয়ভেরাকে এমন স্থানে জন্মাতে দিতে হবে যাতে গাছটি সারাদিনে অন্তত দশ থেকে বারো ঘণ্টা পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায়। যদি এই গাছ সারা গ্রীষ্মে  ভাল সুর্যালোক পায় তাহলে শীতকালে সুপ্ত অবস্থায়ও বেঁচে থাকতে পারে। যাইহোক, কোনোভাবে যদি তাপমাত্রার পরিমাণ ২৫ ডিগ্রীর নিচে চলে যায় তাহলে এই গাছের ক্ষতি হতে পারে।

১) শক্ত জমির অঞ্চলে অ্যালয়ভেরাকে বাড়ির বাইরে বছরের পর বছর রেখে দেওয়া যেতে পারে। যদি এই রকম অঞ্চল ছাড়া আপনি অন্য ধরণের কোন অঞ্চলে বাস করেন তাহলে দিনের বেলায় আপনি গাছকে বাইরে ও তুহিন পরার আগে বাড়ির ভেতরে রাখতে পারেন।

২) যদি আপনার বাড়ির পশ্চিম ও দক্ষিণ জানালায় (উত্তর গোলার্ধের মানুষের ক্ষেত্রে) অথবা পশ্চিম ও উত্তর জানালায় (দক্ষিণ গোলার্ধের মানুষের ক্ষেত্রে) অবাধ সূর্যালোক প্রবেশ করে তাহলে আপনার অ্যালয়ভেরাকে জানালার পাশে রাখতে পারেন।

৩) অত্যন্ত ঠাণ্ডা অঞ্চলেও এই গাছের বৃদ্ধি ঘটান সম্ভব যদি গ্রীনহাউসে চাষ করা হয়, তবে তাপমাত্রার ব্যাপারটি খুব খেয়াল করা উচিত।

পাত্রের মাটির উপড়ে পাথরের আচ্ছাদন দিতে হবে

অ্যালয়ভেরা গাছের পাত্রে মাটির উপর আপনি যদি চান ছোট ছোট পাথর দিয়ে গাছের চারপাশটি ঢেকে দিতে পারেন। এতে দুটি কাজ হবে, ভূমিক্ষয় রোধ হবে ও মাটির আর্দ্রতা সুরক্ষিত থাকবে। তবে এই পাথরের আচ্ছাদনের সাথে গাছের বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক নেই। আপনি এই পাথরের আচ্ছাদনের বদলে আপনি পাত্রের মাটি খোলাও রাখতে পারেন। যদি সাদা পাথর দিয়ে মাটির আচ্ছাদন তৈরী করেন তাহলে তারা সূর্যালোক বিকিরণের মাধ্যমে গাছের গোঁড়ার সুরক্ষা করতে পারে, অবশ্য এটা খুবই ভালো উপায় হতে পারে যদি আপনি উষ্ণ অঞ্চলের বাসিন্দা না হন।

প্রাত্যহিক যত্ন ও সুরক্ষা

এই উদ্ভিদের বৃদ্ধিকালে মাটি শুকিয়ে গেলে তাতে জল প্রদান করা উচিত। গ্রীষ্ম ও অন্যান্য উষ্ণ মরশুমে প্রাত্যহিকভাবে মাটিতে জল দিলে গাছের শ্রীবৃদ্ধি খুব ভালো হয়। যাইহোক এই শুখা বা টানের মরশুমে যদি কোনো কারণে বেশী জল দেওয়াও হয়ে যায়, পরিবেশ তা শোষণ করে নেয়। তাই মাটি একেবারে শুকনো না হওয়া পর্যন্ত জল দেওয়া একেবারেই উচিত নয়। ( প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মাটির শুষ্কতা উপরিতল থেকে ৩ ইঞ্চি গভীরতা পর্যন্ত হতে হবে)

শীতকালে অনিয়মিত জলদান

অ্যালয়ভেরা শীতকালে অথবা দীর্ঘদিন যাবৎ শীতল আবহাওয়া চলাকালীন সুপ্ত উদ্ভিদে পরিণত হয়। যদি না পর্যন্ত আপনি একে আপনার পাশাপাশি কোনো গরম ঘরে না রাখেন, তাহলে সারা মরশুমে মাসে মাত্র এক থেকে তিনবার একে জল দিতে হবে।

বৎসরে একবার সার প্রদান

অ্যালয়ভেরা চাষে খুব বেশি সার লাগে না। তাই এই গাছে যদি খুব বেশি পরিমাণ সার প্রদান করা হয় তাহলে গাছের পক্ষে ভীষণ ক্ষতিকারক হতে পারে, অথবা এর শাঁস অংশটি আমাদের কাছে রাসায়নিক বিষ হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। তাই বছরে মাত্র একবার কম পরিমাণে নাইট্রোজেন, অধিক পরিমাণে ফসফরাস ও কম পরিমাণে পটাশিয়াম সার ১০:৪০:১০ অথবা ১৫:৩০:১৫ অনুপাতে গাছের বৃদ্ধিকালিন সময়ে প্রয়োগ করতে হবে।

অত্যন্ত যত্ন সহকারে আগাছা নির্মূল করতে হবে

অ্যালয়ভেরা গাছের চারপাশে ঘাস বা তদ্‌সদৃশ কোনো আগাছা জন্মাতে দেওয়া যাবে না। যদি আপনার গাছ বাইরে থাকে তাহলে এই ধরণের আগাছাগুলির ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত যত্নসহকারে করতে হবে, কারণ বেলে দোঁয়াশ মাটি অত্যন্ত নরম, অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আগাছানাশ করতে গেলে গাছের শিকড়ে চোট লেগে যেতে পারে।

গাছের পাতা মসৃণ ও নিচু হলে তার প্রতিকার

যদি গাছের পাতা সমান ও নিচু ভাবে বাড়তে থাকে তখন গাছেকে আর পর্যাপ্ত সূর্যালোকে রাখতে হবে। অ্যালয়ভেরার পাতার বৃদ্ধির নিয়মই হলো পাতা সূর্যালোকের দিকে উঁচু হয়ে অথবা ঋজু ভাবে নির্দিষ্ট কোণ করে বৃদ্ধি পাবে। যদি এই পাতা ভূমির দিকে সমানভাবে বৃদ্ধি পায় তবে বুঝতে হবে যে এই পাতাগুলি পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাচ্ছে না। তখন গাছকে উজ্জ্বল সূর্যকিরণের দিকে সরিয়ে দিতে হবে। যদি গাছ ঘরের ভিতরে থাকে, তাহলে একে যতখানি সম্ভব বাইরে দিনের বেশীরভাগ সময়ে রাখা উচিত।

গাছের পাতা বাদামী হলে তার প্রতিকার

যদি গাছের পাতা বাদামি হতে থাকে, এর অর্থ গাছ পর্যাপ্ত সূর্যালোকের থেকে বেশি পরিমাণে সূর্যালোক পাচ্ছে, তখন গাছকে অতিরিক্ত সূর্যালোক থেকে বাঁচানোর জন্য দুপুরের পর ছায়ানিবিড় স্থামে সরিয়ে আনা উচিত।

গাছের পাতা সরু ও কুঁচকে গেলে তার প্রতিকার

যদি অ্যালয়ভেরার পাতা সরু ও কুঁচকে যেতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে যে গাছে কম পরিমাণ জল প্রবেশ করছে। এক্ষেত্রে গাছের গোঁড়ায় প্রতিনিয়ত জল প্রদান করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যাতে জল খুব তাড়াতাড়ি মাটি দ্বারা শোষিত হয়ে যায়, নাহলে জমা জলের সংস্পর্শে পাতার পচন ঘটতে পারে।

গাছের পাতা হলুদ হয়ে গেলে বা ঝরতে থাকলে তার প্রতিকার

অ্যালয়ভেরার পাতা হলুদ হয়ে পচতে আরম্ভ করলে বুঝতে হবে গাছে অতিরিক্ত জলের প্রদানের কারণে এই ঘটনা ঘটছে, তখন দুই সপ্তাহের জন্য জল দেওয়া বন্ধ রাখা উচিৎ, এবং হলুদ ও কুঁকড়ে যাওয়া অংশগুলি জীবাণুমুক্ত ছুরি দিয়ে অতি সাবধানে ছেঁটে ফেলতে হবে।

- প্রদীপ পাল

Share your comments



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online


Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.