ম্যাক্রোপ্রোপাগেসান প্রদ্ধতিতে কলার চাষ

Wednesday, 20 November 2019 08:33 PM

বাণিজ্যিকভাবে কলা চাষের জন্য ও স্বাস্থ্যকর-চাষের উপকরণ সরবরাহের চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী, সুস্থ-কলা চারা উৎপন্নের সস্তা ও সহজ কৌশল প্রয়োজন। যদিও পশ্চিমবঙ্গে ‘গ্র্যান্ড নাইনে’ জাতের টিস্যু-কালচার কলাচারা বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায়, এ রাজ্যে চাষ করা হয়, এমন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাত যেমন, মর্তমান, রোবাস্টা, চম্পা, বাগদা কাঁঠালী, বেহুলা ইত্যাদির টিস্যু কালচার চারা বর্তমানে উপলব্ধ নয়। এই প্রেক্ষিতে, ম্যাক্রোপ্রোপাগেসান প্রদ্ধতিতে কম খরচে স্বাস্থ্যকর কলাচারা তৈরি করে বাণিজ্যিক কলা চাষের সফলতা পেতে পারেন । এই প্রদ্ধতির কার্যকর কৌশলটি হল, একটি সুস্থ-তেউড়ের প্রধান অঙ্কুরটির (এপিক্যাল মেরিস্টেম) প্রভাব দমন করে, পার্শ্বীয় অঙ্কুরগুলিরকে উদ্দীপিত করা । এই কাজটি বিশেষ কৌশলে ও হরমোন প্রয়োগ করে করা হয় । 

ম্যাক্রোপ্রোপাগেসান প্রদ্ধতির কৌশল : 

  • ধাপ-১. রোগ বিহীন কলা বাগান থেকে ৩-৬ মাস বয়সী (১-২ ফুট লম্বা, সরু পাতাযুক্ত) স্বাস্থ্যকর তেউড় সংগ্রহ করতে হবে ।
  • ধাপ-২. তেউড়ের কন্দ থেকে মাটি ও শেকড় ছেটে ফেলুন ও ভালো করে পরিষ্কার করুন । কন্দ বরাবর তেউড়ের ওপরের অংশ কেটে বাদ দিন । একে বলা হয় শিরচ্ছেদ বা ডিক্যাপিটেসান ।
  • ধাপ-৩. কন্দের কাটা অংশের মাঝে যে মাজ বা অঙ্কুর থাকে, সেটি ছুরির ডগা দিয়ে তুলে ফেলু্‌ন, যা একটি ২ সেন্টিমিটার ব্যাস এবং ২ সেন্টিমিটার গভীরতাযুক্ত ছোটো গহ্বর মতো হবে । এবার কন্দের উপরি তলে অল্প গভীরে কেটে, আড়াআড়ি ভাবে ৬-৮ টি অংশ বিভক্ত করুন । একে বলা হয় ডিকরটিকেসান
  • ধাপ-৪. কন্দ গুলি শোধন করতে হবে । এর জন্য, ছত্রাকনাশক (যেমন, ব্যাভিস্টিন ১ গ্রাম/লি জলে), কীটনাশক (যেমন, আসাটাফ ০.৭৫ গ্রাম/লি জলে) এবং প্রয়োজনে ব্যাকটেরিয়ানাশক (যেমন, স্ট্রেপ্টোসাইক্লিন ১/৬ গ্রাম/লি. জলে)-এর দ্রবনে ১০-১৫ মিনিটের জন্য কন্দ গুলি ডুবিয়ে রাখতে হবে এবং তারপর সেগুলি তুলে ২-৩ ঘণ্টা ছায়ায় শুকোতে হবে । 
  • ধাপ-৫. একটি কাঠের গুঁড়োর বেড বানাতে হবে, যার দৈর্ঘ্য ৩-৫ মিটার, প্রস্থ ১ মিটার, গভীরতা ১০-১৫ সেমি. । পরিষ্কার ও শুকনো কাঠের গুঁড়োএই বেডে বিছিয়ে দিন, ২৫-৩০ সেমি. x ২৫-৩০ সেমি. ব্যবধানে ছোট পিট তৈরি করুন এবং প্রতি পিটে ৫০ গ্রাম ভার্মিকম্পোস্ট ও ১০ গ্রাম ট্রিকোডার্মা ভিরিডি বা ১০ গ্রাম বেসীলাস সাবটিলিস প্রয়োগ করুন । একটি করে কন্দ প্রতি পিটে বসান । 
  • ধাপ-৬. রোজ-ক্যান দিয়ে হালকা সেচ প্রয়োগ করে কাঠের গুঁড়ো ভিজিয়ে দিন, যাতে মিডিয়ার আর্দ্রতা প্রয়োজন মতো বজায় থাকে । এই ভাবে সপ্তাহে ২-৩ দিন হালকা সেচ প্রয়োগ করতে হবে ।
  • ধাপ-৭. সপ্তাহে দুবার কন্দের ওপর হরমোনের দ্রবন স্প্রে করতে হবে । ১০ পিপিএম মাত্রার বেঞ্জাইল-এমিনো পুরিন (বিএপি)দ্রবন প্রতি কন্দে ৪-৫ মিলি পরিমান প্রয়োগ করুন । 
  • ধাপ-৮. হরমোন প্রয়োগের ফলে, কন্দের সুপ্ত কুঁড়ি জাগরিত হবে এবং ২০-৩০ দিনের মধ্যে প্রতি কন্দে ২-৫ টি “প্রাথমিক পর্যায়ের” অঙ্কুর বা ডগা উৎপন্ন হবে। ২-৩ টি পাতাযুক্ত (১৫-২০ সেমি. দীর্ঘ) এই প্রাথমিক অঙ্কুর বা ডগা গুলিকে পুনরায় শিরচ্ছেদ বা ডিক্যাপিটেসান ও ডিকরটিকেসান করতে হবে । তারপর, আগের মতই, সেচ ও হরমোনের দ্রবন স্প্রে করতে হবে । 
  • ধাপ-৯. প্রাথমিক পর্যায়ের অঙ্কুর বা ডগা থেকে ১৫-২৫ দিনের মধ্যে প্রতিটি প্রাথমিক পর্যায়ের ডগা পিছু ৩-৪ টি করে দ্বিতীয় পর্যায়েরঅঙ্কুর বা ডগা উৎপন্ন হবে । আগের মতই, এই দ্বিতীয় পর্যায়ের অঙ্কুর বা ডগাগুলিকেও ডিক্যাপিটেসান, ডিকরটিকেসান এবং সেচ ও হরমোনের প্রয়োগ রতে হবে । এর ফলে, “তৃতীয় পর্যায়েরঅঙ্কুর বা ডগা উৎপন্ন হবে, যা সংখ্যায় কন্দ প্রতি ২৫-৪৫ টি হতে পারে ।
  • ধাপ-১০. এই তৃতীয় পর্যায়ের অঙ্কুর বা ডগাগুলি ২-৩ টি পাতাযুক্ত হলে, সেগুলি কন্দ থেকে আলাদা করতে হবে । ধারালো ছুরি দিয়ে সাবধানে কাটতে হাবে যাতে প্রতি ডগার গোড়াতে কন্দের কিছুটা অংশ থাকে, যা থেকে শেকড় উৎপন্ন হবে ।
  • ধাপ-১১. এই ডগাগুলির গোড়ায় রুট হরমোন প্রয়োগ রতে হবে । ৫ পিপিএম মাত্রার ইন্দোল -3-বুটিকের অ্যাসিড (আইবিএ) দ্রবনে ডগাগুলির গোড়ার অংশ ৪-৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে । তারপর, সেগুলি বালির বেডে লাগাতে হবে ।
  • ধাপ-১২. বালির বেড প্রস্থে ১ মি, দৈর্ঘ্যে ২-৩ মি, গভীরতায় ১০-১৫ সেমি. হতে পারে । রুট হরমোন প্রয়োগের পর, ডগাগুলিকে এই বালির বেডে ১০-১৫ সেমি. দূরত্বে লাইনে রোপণ করতে হবে এবং লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব হবে ২০-২৫ সেমি. । রোজ-ক্যান দিয়ে হালকা সেচ প্রয়োগ করে বালি ভিজিয়ে দিন, যাতে প্রয়োজন মতো আর্দ্রতা বজায় থাকে । এই ভাবে সপ্তাহে ৩-৪ দিন হালকা সেচ প্রয়োগ করতে হবে । 
  • ধাপ-১৩. শেকড় উৎপন্ন হতে ১০-১৫ দিন লাগবে । তারপর, চারাগুলি বালির বেড থেকে সাবধানে তুলে পলিথিন প্যাকেটে বসাতে হবে । বাগানে মাটি, কোকোপ্যাট বা বালি এবং ভার্মিকম্পোস্ট বা জৈব সার ১:১:১ অনুপাতে মিশিয়ে প্যাকেটের মিডিয়া তৈরি করতে হবে। এছাড়া, প্রতি প্যাকেটে ৫ গ্রাম ট্রিকোডার্মা ভিরিডি প্রয়োগ করে চারা রোপণ করুন । 
  • ধাপ-১৪. চারাগুলিকে ছায়াযুক্ত জায়গায় বা শেড নেটের নিচে রেখে, রোজ-ক্যান দিয়ে সপ্তাহে ৩-৪ দিন হালকা সেচ প্রয়োগ করতে হবে । এইভাবে চারাগুলি ৩০-৩৫ দিনের বৃদ্ধি পেয়ে ৩০-৪০ সেমি. দীর্ঘ হবে এবং মূল জমিতে রোপণ জন্য উপযুক্ত হবে

তথ্যসূত্র - ড. সঞ্জিত দেবনাথ (অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোফেসর, আই.সি.এ.আর.-সর্ব ভারতীয় সমন্বিত ফল গবেষণা প্রকল্প, বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়)

স্বপ্নম সেন (swapnam@krishijagran.com)



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online

Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.