উদ্যানপালনে চাষের অভিমুখ বদলই চাষির আয় দ্বিগুন করার পথ :

Monday, 26 March 2018 03:40 PM

ফল ও সবজি, আমাদের ভিটামিন ও পুষ্টি উপাদানের উৎস; মশলা, ভারতীয় খাবারের উপকরণের রাজা আর উত্তর থেকে দক্ষিনে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতি্হ্যের সঙ্গে প্রসারিত; নানা ফুলের  মালা, আমাদের উৎসব অনুষ্ঠানের যা অঙ্গ এ সব নিয়েই ‘উদ্যানপালন’ যা কৃষির এক গুরুত্বপূর্ণ শাখা। কৃষিজাগরণ টিমের সৌভাগ্য হলো ভারত সরকারের হর্টিকালচার কমিশনার ডঃ বি.এন.এস. মুর্তির সঙ্গে নানা সাফল্য, সমস্যা ও সম্ভাবনার প্রসঙ্গ সাক্ষাতকারের মাধ্যমে  আলোচনার।

প্রশ্ন ১: ভারতবর্ষের আঙ্গীকে উদ্যানপালনের অবস্থা কিরকম?

ড: মুর্তি : উদ্যানপালন হল এক বৈচিত্রের সম্ভার যার মধ্যে আছে ৬টি উপভাগ। সবজি ফসল, ফল, মশলা, নানা ফুল, বাগিচা ফসল ও মাশরুম সমূহ। উদ্যান পালন ভারতে অন্যান্য খাদ্য শষ্যের তুলনায় খুবই ভালো ফল করেছে। কারন এগুলির বাজার দর ভালো আর এসব ফসলের মরশুমী বৈচিত্র। তবুও এসব ফসলের পরিবহন ও চয়নোত্তর ব্যবস্থাপনা হল সেই সব জায়গা যেখানে মূল সমস্যাগুলি আছে। একটি অঙ্ক আপনাদের উদ্যান ফসলের লাভ বোঝাতে সক্ষম হবে, যেমন একজন চাষি এককেজি গমে যা লাভ করতে পারে তার দশগুন লাভ উদ্যানফসলের ঐ পরিমান উৎপাদনে সম্ভব। এবং কলার মত ফল  ৩০ গুন লাভ দিতে পারে। এই উচ্চ সম্ভাবনা বিচার করেই চাষিদের আয় দ্বিগুন করতে উদ্যানফসলে ক্রপিং ইনটেনসিটির পরিবর্তন এক ম্যাজিকের মত কাজ করতে পারে।

প্রশ্ন ২: আন্তর্জাতিক গুনমানের তুলনায় ভারতীয় উদ্যান ফসলের গুনমাণে কতটা পার্থক্য রয়েছে?

ড.মুর্তি : আন্তর্জাতিক বাজারে উৎপাদন প্রথমে বাছাইকরণ তারপরে গ্রেডিং বা মান অনুযায়ী পৃথকীকরণ এবং বিপননের মাধ্যমে উৎপাদন স্থল থেকে আসে। আন্তর্জাতিক বাজার উৎপাদনের গুনমানকে বেশী গুরুত্ব দেয়, তাই ‘এ’ গ্রেড উৎপাদন বাজারে বিক্রির জন্য আসে ও তুলনায় নিচের গুনমানের উৎপাদন প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত হয়। আর সেখানে ভারতে মাত্র ২-৫% উৎপাদন প্রক্রিয়াকরণে যায়। কম প্রক্রিয়াকরণের কারনে ভারতে বেশীরভাগ উৎপাদন বাজারে নানা গুনমান অনুযায়ী কম-বেশী পার্থক্যের মূল্যে’র চাপে পড়ে। আর তাই ‘এ’, ‘বি’, ‘সি ইত্যাদি গ্রেড, উৎপাদনের ওজন, আকারের উপর নির্ধারিত হয়।

প্রশ্ন ৩: দেরীতে হলেও উদ্যানপালন কিভাবে পরিমানগতভাবে ও গুনগতভাবে এগিয়ে এসেছে? সার্বিক কৃষির বিচারে পরিসংখ্যানে উদ্যানপালন কেমন অবস্থায় আছে?

 ড. মুর্তি : ভারতীয় কৃষি মোট ১৫০ মিলিয়ন হেক্টর ফসল জমি অধিকার করে আছে যার ১৭% এলাকা উদ্যানফসলের অন্তর্গত আর ভারতের জিডিপি- তে যার ৩০% অবদান। ভারত বর্তমানে ২০% গ্রেড ‘এ’ ফসল উৎপাদন করে যা উন্নত কৃষি পদ্ধতি দিয়ে বাড়ানো সম্ভব। তৃতীয় আনুমানিক পরিসংখ্যানে আমাদের মোট উদ্যানফসল উৎপাদন ২৯৯.৮৫ মিলিয়ন টন যা গত বছরের ২৮৩.৪ মিলিয়ন টনের তুলনায় ৪.৮% বেশী আর জমির বৃদ্ধির পরিমান ২.৬%।

গত বছরের উদ্যানফসলের উৎপাদন অন্যান্য কৃষি উৎপাদনের পরিমানকে (এবছর ২৭১ মিলিয়ন টন ) ছাপিয়ে গেছে। মাত্র ২৫.১ মিলিয়ন হেক্টর জমি থেকে উদ্যানপালনে ২৯৯.৮৫ মিলিয়ন টন ফসল উৎপাদন যা এক উন্নতিরই লক্ষণ।

প্রশ্ন ৪: কিভাবে আমরা উৎপাদনের গুনমান ও পরিমান দুটোই বাড়াতে পারি?

ড. মুর্তি : একটি ভালো উৎপাদনের জন্য আমাদের নিশ্চয়ই দরকার একটি ভালো আরম্ভ। আরম্ভের অর্থ গুনমানে ভালো বীজ ও বীচন। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি হল সময়মত  সার-ব্যবস্থা ইত্যাদি। সেচ যা আমাদের দেশে সহজলভ্য নয় তা একটি বড় সমস্যা। উন্নত গুনমানের উৎপাদন শতাংশে বাড়াতে শুরু করতে হবে উন্নত বীজ বা রোপন দিয়ে। ভারতীয় পরিকাঠামোতে উন্নত চিহ্নিত করণ সমেত ভালো কলমের অভাবে গুনমানে কমতি পড়ে যায়। তবুও চাষিরা নিজেদেরকে তথ্যের সঙ্গে ওয়াকিবহাল রাখেন ও নিজেদের উপায়ে সমস্যার সমাধানের কাজ চালিয়ে যান। কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রগুলিও সর্বতোভাবে কৃষি প্রযুক্তির জ্ঞান চাষিদের মধ্যে সম্প্রসারনের ফলে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ছে।

প্রশ্ন ৫: কেন ফল-সবজি ভারতীয় জলবায়ুতে ভালোভাবে উৎপাদন দিতে সক্ষম হচ্ছে?

ড. মুর্তি : উদ্যানপালনের মধ্যে ফল সবজির তুলনায় বেশী উৎপাদন ক্ষমতা ও ফলাফল দিতে সক্ষম। ভারত নানা কৃষি আবহাওয়ার উপর ভিত্তি করে প্রচুর আম, কলা, পেঁপে, বেদানা ফলনে সক্ষম। কিন্তু অন্যান্য ফলের তুলনায় বেদানার ফলাফল দেবার ক্ষমতা বেশী। নার্শারীগুলির সংশিত মান্যতাকরণের মাধ্যমে উৎপাদন স্থলেই ভালো কলম পাওয়া সম্ভব। আর ‘স্টার-রেটেড’ ও বাছাই করা নার্শারীগুলি উৎপাদনকে এভাবেই সাহায্য করে চলেছে।

প্রশ্ন ৬: মৌসুমী বৃষ্টি কিভাবে উৎপাদনকে প্রভাবিত করে?

ড. মুর্তি : গত কয়েক বছর ধরে ভারত ভালো মৌসুমী বৃষ্টি পাছ্ছে। কেবল কিছু জেলা খরার কবলে পড়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উদ্যানপালন মৌসুমী বৃষ্টির থেকেও সুনিশ্চিত সেচের উপরই নির্ভর করে। অন্যান্য খাদ্যশষ্যের তুলনায় আমাদের এখানে ভূগর্ভস্থ ও ব্যবহৃত সেচের জলের পূনঃব্যবহার দরকার।

প্রশ্ন ৭: উদ্যানজাত ফসলের রপ্তানীর কী অবস্থা?

ড. মুর্তি : উদ্যানপালন বিভাগে ভারতের রপ্তানী এখন উচ্চতার অভিমুখে। ২০১৪-১৫ সালে রপ্তানীর বানিজ্যিক মূল্য পৌঁছোয় ২৮,৬২৮ কোটিতে। ফল ও সবজিতেই একমাত্র রপ্তানীর মূল্য ছিল ৭.৭ কোটি টাকা। ফুলে রপ্তানীর পরিমান মূল্য ৪৬০ কোটি। আর অন্যান্য প্রধান রপ্তানী হয়েছে কাজুবাদাম ও মশলা ফসল। ভারতীয় উপকূলে কাজুর প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থাপনা ভালো। কিন্তু উন্নত গুনমানের কাঁচা কাজুবাদামের অভাবে প্রক্রিয়াকরণ কারখানাগুলি তা আমদানী করে লাভ করে। সরকার কাজুবাদাম উৎপাদন বাড়াবার জন্য তেলেঙ্গানা, কর্নাটক, তামিলনাড়ু, গুজরাট ও ছত্তিশগড়কে প্রাধান্য দিয়ে যথা সম্ভব চেষ্টা চালাচ্ছে। কাজুবাদাম হচ্ছে একটি লাভজনক ফসল যার এক কেজি থেকে ১৮০-২০০ টাকা আয় সম্ভব।

প্রশ্ন ৮: প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশ হওয়া সত্বেও আমাদের চয়নোত্তর ক্ষতির সম্মুখিন হতে হচ্ছে। কিভাবে আমরা এর মোকাবিলা করবো?

ড.মুর্তি: আমাদের দেশে হিমঘরগুলির অবস্থা শোচনীয়। বিদ্যুতের অভাব এগুলিকে অব্যবহার্য অবস্থায় ঠেলে নিয়ে গেছে। আর ফসল চয়নের পর ২০-৩০% নষ্ট হচ্ছে যার ফল চাষিদেরকেই ভুগতে হচ্ছে। এই ক্ষতি হিমঘরগুলি দ্বারা রোখা সম্ভব। কিন্তু প্রত্যেকটি ফল /সবজির আলাদা আলাদা সংরক্ষন চাহিদা। আবার হিমঘরের সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামো যেমন প্যাক হাউস, রাইপেনিং চেম্বার ইত্যাদিরও অভাব আছে। এসবের উন্নতি ঘটালে উদ্যানফসলের উৎপাদনকে আমরা ২০ দিন থেকে ৬ মাস অবধি সংরক্ষিত করতে পারি। পরিকাঠামো বৃদ্ধির ঘাটতি আছে আলু, টমাটো ও পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও যেগুলিকে ম্যাজিক ফসল বলা যায়। কিন্তু সরকারী তরফে ব্যবস্থাপনা ও প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে আর ২-৩ বছরে এই ম্যাজিক ফসলগুলির জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে। একটি ১-২ মেট্রিক টন মজুদ-ক্ষমতার হিমঘরের জন্য ৬-৮ কোটি টাকার বিনিয়োগ দরকার।

প্রশ্ন ৯: চাষিদের আয় দ্বিগুন করতে উদ্যানপালন বিভাগের কি দিশা ঠিক করা হয়েছে ?

ড.মুর্তি: চাষিদের আয় দ্বিগুনের লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ হবে বিপননের সুযোগ বাড়ানো ও বিপনন তথ্যের সঙ্গে চাষিদের অবগত করে তাদের ব্যবসা বাড়ানো। তিনটি ফসল - পেঁয়াজ, আলু  টমাটো হয় কৃষি অর্থ-ব্যবস্থাকে  গড়ে নয় ভাঙ্গে। আমাদের বিভিন্ন ফসল মরশুম উৎপাদন-ব্যপ্ততাকে দেখে চলতে হবে। বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন কৃষি-জলবায়ু কিছু নির্দিষ্ট উৎপাদনের সহায়ক। সেইসব রাজ্যকে নির্দিষ্ট করে ফসলের যোগান বাড়াতে হবে। প্রথাগত ব্যবস্থা বদলে সমন্বিত বিপনন-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। উদ্যানফসলের সাথে পরিপূরক জীবিকা যেমন মৌমাছি পালন এসবে গুরুত্ব দিলে বাড়তি আয় সম্ভব। সরকার উদ্যানপালনের উন্নতিকল্পে ‘মিশন ফর ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট  অফ হর্টিকালচার’ চালাচ্ছে, যাতে নার্শারী উন্নয়ন থেকে টেঁকসই সেচ-ব্যবস্থা, মজুদ ও সংরক্ষণে ভর্তুকী নিয়ে বিপনন যোগাযোগ সমগ্র সমৃদ্ধির দিকগুলিকে উন্নতির লক্ষ্যে এই মিশনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ডঃ বি.এন.এস. মুর্তি অগ্রনী চাষিদের ভর্তুকীর জন্য না পিছিয়ে গিয়ে সামনে এগিয়ে তাদের উৎপাদনের ভালো আয়ের আশ্বাস দিয়েছেন।

 

Share your comments



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online


Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.