জাপানে বনসাইয়ের ইতিহাস

Tuesday, 04 September 2018 10:54 AM

ধারণা করা হয়, বনসাই গাছের চীন থেকে জাপান যাত্রাটি পুরোপুরিই ধর্মীয় কারণে। মতান্তরে, আজ থেকে প্রায় ১২০০ বছর আগে হান রাজবংশের শাসনামলে চীনা সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুরা জাপানে দেশান্তরী হন। সেসময়ে তারা নিজেদের সাথে পবিত্র উপহার হিসেবে ছোট ছোট বনসাই গাছ নিয়ে যান এবং উপহার হিসেবে সেগুলো জাপানের সন্ন্যাসীদের দেন। জাপানিরা বরাবরই চীনাদের গুণমুগ্ধ ছিল, এবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না। তারা দ্রুত বনসাই বানানোর কায়দা-কানুন শিখে ফেললো।

সময়ের সাথে ধীরে ধীরে বনসাইকে পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে ভাবা হতে লাগলো। বনসাই নিয়ে বিভিন্ন জাপানি লোকগাথাও রয়েছে। এর মাঝে অতি বিখ্যাত একটি গল্প এক দিগ্বিজয়ী সামুরাই যোদ্ধাকে নিয়ে, যে তার সংগ্রহের সর্বশেষ তিনটি বনসাই গাছকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে একজন শীতার্ত ভিক্ষুকে একটু উষ্ণতা দেবার জন্যে। এই লোকগাথাটি নিয়ে পরবর্তীতে থিয়েটারে নাটক হয়, এছাড়া গল্পটি ছবির মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় অঙ্কিত হয়।

মধ্যযুগের দিকে জাপানের সব ধরনের মানুষের মাঝে বনসাই বেশ জনপ্রিয় হয়ে গেল। ফলে বনসাই শিল্পীদের কদর রাতারাতি বেড়ে গেল সেখানে। এদিকে তখন অনেকে নিজেরাই বনসাই তৈরি করতে লাগলো ঘরে বসেই, আবার নিজেদের সংগ্রহের বনসাই দিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজনও করলো অনেকে।

১৬০০ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ধীরে ধীরে এই খর্বাকৃতি গাছের খবর বাকি পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। বিভিন্ন দেশের বণিকরা জাপানে ব্যাবসা করতে এসে বনসাই গাছ দেখে অভিভূত হয়ে পড়ল। ১৭০০ সালের শেষের দিকে জাপানিরা বনসাই গাছ নিয়ে দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করতে লাগলো, লন্ডন আর ভিয়েনার মত বড় বড় শহরগুলোতে এটি নিয়ে হৈ চৈ পড়ে গেল। ১৮০৬ সালের দিকে ইংল্যান্ডের রানী শার্লটে উপহার হিসেবে জাপানের তরফ থেকে সুন্দর একটি বনসাই গাছ পেলেন। এভাবেই জাপানিদের বনসাই ধীরে ধীরে বাকি দুনিয়াতে ছড়িয়ে গেল।

বনসাই তৈরির প্রাচীন পদ্ধতি

জাপানিরা বনসাই তৈরির জন্য প্রথমদিকে কেবল কিছু নির্দিষ্ট ফুল ও ফলের গাছ বেছে নিত, আর কয়েক প্রজাতির পাইন। খর্বাকৃতির গাছ তৈরির অনেক গোপন ও অদ্ভুত অনেক কৌশলই ছিল তাদের, যা ধীরে ধীরে তারা প্রকাশ করে। ছোট একটি চারাগাছকে একদম শুরু থেকেই নির্দিষ্ট পাত্র বা ট্রে তে নিয়ে তার পরিচর্যা শুরু হয়। বনসাই গাছের সর্পিল আকৃতি ধারণ করানোর জন্য এর শেকড়, কান্ড আর ডালপালাকে মুচড়ে দেওয়া হয়, ফলে আস্তে আস্তে সেটি বাঁকানো আকৃতিতে চলে আসে। আবার মাঝে মাঝে ডালপালা আর শেকড়কে দড়ি ও বাঁশের সাহায্যে মাটির সাথে বেঁধে দেওয়া হয়, ফলে গাছটি ওভাবেই বেড়ে ওঠে। মাঝে মাঝে ইচ্ছেমত শাখা-প্রশাখা তৈরি করতে গাছের এখানে সেখানে কলম করা হয়।

আরেকটি খুব অদ্ভুত পদ্ধতি জাপানি বনসাই শিল্পীরা ব্যবহার করতো, আর তা হলো উইপোকা। গাছ নরম থাকতে তারা সেখানে উইপোকা ছেড়ে দিত। পোকার সংখ্যা কয়েকদিনেই বেড়ে গেলে তারা গাছের উপরে বিভিন্ন জায়গায় সুবিধামত মিষ্টি জাতীয় তরলের আস্তরন লাগিয়ে দিত। মিষ্টির লোভে পোকারা তখন গাছের অংশটুকুও খেয়ে ফেলত, ফলে গাছের বিভিন্ন জায়গায় গর্ত তৈরি হত। নিজেদের পছন্দমতো গর্ত ও ফাঁপা স্থান তৈরি হয়ে গেলে শিল্পীরা পোকাগুলোকে গাছ থেকে বের করে ফেলতেন। এরপর আস্তে আস্তে নিজে থেকেই গাছটির ক্ষত সেরে যেত। গাছটির নতুন চেহারা আর ছালবাকলগুলো সহ দেখতে তখন একে একদম বয়স্ক একটি গাছের মতোই লাগতো। 

বনসাই গাছের উৎপত্তি চীনে হলেও জাপানিরা এই শিল্পকে অনেকখানি আপন করে নিয়েছে। ছোট আকৃতির এই গাছগুলো তাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্ববাহী। নতুন বছরের শুরুতে একে অপরকে এটি দিয়ে তারা স্বাগত জানায়, এই গাছ তাদের পবিত্রতার প্রতীক। বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশেই বনসাইকে শোভাবর্ধনকারী হিসেবে ঘরে রাখা হয়। এমনকি আমাদের দেশেও বর্তমানে বনসাই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। 

- রুনা নাথ

Share your comments



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online


Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.