কন্দ পেঁয়াজের বদলে পেঁয়াজ বীজ চাষে বেশী লাভ

Tuesday, 07 May 2019 11:50 AM

রবিখন্দে পেঁয়াজের চাষ পশ্চিমবাংলার সবজি চাষিদের মধ্যে বহুল প্রচলিত হলেও চাহিদা ও যোগাযোগের অর্থনীতিতে প্রতি বছরই দাম বেশী থাকে না। চৈত্র- বৈশাখে পেঁয়াজ বাজারে ওঠা থেকে বর্ষার দিকে সময় যত এগোয় দাম উঠতে থাকে। পাইকারী দরে চাষির লাভের অঙ্ক কিন্তু অনেকটাই সঠিকভাবে পেঁয়াজ মজুত করে রাখার উপর নির্ভরশীল। আর বাকীটা দেশের তিনমরশুমী পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাজ্য মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক আর অন্ধ্রের খারাপ কৃষি আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার সঙ্গে রাজ্যের আভ্যন্তরীন উৎপাদনের অন্যান্য চাহিদার রাজ্য ও পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে বাজারীকরণের উপর দাঁড়িয়ে। বাজারে পাইকারী দাম চাঙ্গা থাকলে অর্থনীতির এই দাঁড়িপাল্লায় বড়জোড় চাষির লাভ বিঘাপ্রতি ৪০-৫০,০০০ টাকা।

বীজের চাহিদা ও বাজার – কিন্তু পেঁয়াজ চাষের পরিমন্ডল বিচার করলে দেখবেন আশ্বিন-কার্তিকে পেঁয়াজ মরশুম শুরুর সময় রাজ্যের সেরা জাত “সুখসাগরের” বীজের চাহিদা থাকে চড়া। ছোট, মাঝারী, বড় সব বীজ ব্যপারীরাই এই মওকায় ফাটকা খেলে মোটা মুনাফা কামায়। আর এসময় পাইকারী কন্দ পেঁয়াজের দাম বাড়লে তো কথাই নেই। জমি তৈরি করে বসে থাকা চাষিরা যে সব সময় ভালো বীজ পান তাও নয় – কেজি প্রতি ৩০০০ টাকার বীজে ৬০% অঙ্কুরোদগমেই বেশীরভাগ সময় সন্তুষ্ট থাকেন। বীজ ব্যবসায়ীরা মূলত হুগলী, বর্ধমানের বেশকিছু অঞ্চলের চাষিদের কাছ থেকে পাইকারী ১০০০-২০০০ টাকা কেজিতে এই বীজ কিনে প্যাকেট করে TL Seed হিসেবে বিক্রিতে মুনাফা কামান।

 পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলাতে বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের চাষিরাও সবজি চাষের জমিতে সঠিক বিজ্ঞান মেনে পেঁয়াজ বীজ তৈরী করলে ভালো লাভ পাবেন। স্থানীয় ফার্মার্স ক্লাব, চাষিগোষ্ঠি, সমবায় ও  সরকারী সহায়তায় উপযুক্ত দামে ভালো বীজ থেকে ভালো গুনমানের পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন করা সম্ভব। চাষি পাবে চাষ, পরিশ্রম ও বীজের মূল্য আর বদলে বাঁচবে চাষিই সঙ্গে চাঙ্গা হবে গুনমানের বাজার – বীজ ব্যবসার আঙ্গিক।

কিভাবে চাষ – সুখসাগর পেঁয়াজের ভালো বীজ নির্ভর করে সঠিক কন্দ বাছাই ও বীজ ধরলে শুকনো আবহাওয়ার উপর। প্রথাগতভাবে চাষিরা গত বছরের মজুত পেঁয়াজ থেকে কন্দ নির্বাচন  করে আশ্বিনের শেষ থেকে অঘ্রানে জমিতে বসান।

বীজের চাষ উদ্যোগীদের আমি পরামর্শ দেবো –

(১) চৈত্র-বৈশাখে কন্দ তোলার আগে উন্নত গুণমান, সমতা ও রোগ-পোকার প্রকোপ কম এমন কন্দের মাঠ থেকে তোলার সময় সুখসাগরের যেটি চাহিদার আকার ও রঙ সেরকমটি জমির ভিতরের দিকের নিয়োগ কন্দ আলাদা বাছাই করে আলাদা মজুত করুন।

(২) মরশুমের শুরুতে জলনিকাশী দোঁয়াশ বা বেলে দোঁয়াশ জমিতে  বিঘায় যতটা পারুন শুকনো গোবর সার/ কেঁচোসারের সঙ্গে ট্রাইকোডারমা হার্জিয়ানাম ১ কেজি মিশিয়ে জমিতে দেবার আগে হিউমিক দানা ২ কেজি ও নিমদানা ২ কেজি দিয়ে ১৫ কেজি ইউরিয়া ১ কেজি নিমোরিয়া আগের দিনে মাখিয়ে + একবস্তা জিঙ্ক বোরন যুক্ত সিঙ্গল সুপার ফসফেট +৭-৮ কেজি পটাশ দিয়ে চাষ জমি তৈরী করুন।

(৩) কন্দ বসানোর আগে আরেকবার বাছাই করে কার্বেন্ডাজিম + ম্যানকোজেবের মিশ্র ছত্রাকনাশক ১.৫ গ্রাম + কার্বোসালফান ২ মিলি প্রতি লিটার জলের দ্রবনে ৫/৭ মিনিট চুবিয়ে জল শুকিয়ে বসান।

(৪) দেড়ফুটের সারি করে ১/২ ফুটের ব্যবধানে একটি করে পুষ্টকন্দ বসিয়ে পরে চাপানের সময় আলুচাষের মত ভেলী করে দিন।

(৫) প্রথম চাপানে (২০/২৫ দিনে) ১০ কেজি ইউরিয়ার সঙ্গে ৫ কেজি পটাশ ও সমুদ্র শৈবাল নির্যাসদানা (সাগরিকা) ১ কেজি মিশিয়ে মাটি টেনে দিন। পরে জলে গোলা জৈব তরল সার (প্রাইম প্যাক ১.৩:২.৬:২.৬ বা ন্যানো এন পি কে বা বায়ো এন পি কে) হিউমিক অ্যাসিড / সমুদ্র শৈবাল নির্যাসের সঙ্গে পাতায় আঠা দিয়ে স্প্রে করুন ২ বার ১০/১৫ দিন ব্যবধানে।

(৬) আশে পাশে মৌমাছি বাক্স রাখুন বা পালকদের রাখার সুবিধা করে দেবার সঙ্গে লক্ষ্য রাখুন একই সময়ে কাছাকাছি জমিতে যেন অন্য পেঁয়াজের জাত বা অনুন্নত একই জাত ফুলে আসে।

(৭) বীজ দানা পাকতে শুরুর মুখে ঝড় থেকে বাঁচতে ফুল সমেত ডাঁটা লাঠি দিয়ে ঠেকা দিন। চৈত্র বৈশাখে বীজ শক্ত হয়ে ঝড়ে যাবার আগে ফুলের থোকা দরকারে মসলিন /সুতি/নেট দিয়ে বেঁধে দিন।

বীজ শুকিয়ে মাড়াই করলে বিঘাতে ৭০-৯০ কেজিতে (গড় ৮০ কেজি) পাইকারী ১৫০০টাকা দর ধরলেও মোট আয় ১.২০.০০০ টাকা। এবার খরচ খরচা বাদ দিয়ে লাভের অঙ্ক নিজেই বিচার করুন।

লেখক : ড: শুভদীপ নাথ, সহ উদ্যানপালন অধিকর্তা, উত্তর ২৪ পরগণা

রুনা নাথ(runa@krishijagran.com)



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online

Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.