আমের চয়োনত্তর পরিচর্য্যা

Tuesday, 22 May 2018 11:38 AM

 আমের চয়োনত্তর পরিচর্য্যা

ফল পাড়ার পর থেকে প্যাকিং অবধি পরিচর্য্যা -

ফসল ফলানো অবধি চাষীদের দায়িত্ব আর তারপরে ক্ষুদ্র, মাঝারী, বড় ব্যবসায়ী, আরকাঠি, ফড়ে, আড়তদার, দালাল এদের অধ্যায় শুরু এই ব্যবস্থাপনাই পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ চালচিত্র। আমপাড়ার পর তার পরিচর্য্যায় পশ্চিমবঙ্গে ন্যুনতম যত্ন না নেবার ফলে উৎকৃষ্ট গুনমানের উৎপাদন কোন দিনই পাওয়া যায় না ও আম রপ্তানী এক সুদূর স্বপ্ন হিসাবে রয়ে যায়। আমচাষী ভাই বোনেদের মনে রাখতে হবে যে আম এমন একটি ফল যা পাড়ার পরও শ্বাস প্রশ্বাস বজায় রাখে আর এই বৈশিষ্ট্যই এই ফলকে আরো তাড়াতাড়ি পাকা ও নষ্ট হবার উপযোগী করে তোলে। চয়নের পরই যে কোন ফলে “Field Heat” বলে বিশেষ তাপমাত্রা থাকে যাকে আবহাওয়ার সঙ্গে সহনশীল ভাবে কমিয়ে না এনে সঙ্গে সঙ্গে বস্তাবন্দি করলে বা পরিবহনের মাধ্যমে একসঙ্গে নিয়ে গেলে ফল তাড়াতাড়ি নষ্ট হয় ও গুনমানে খারাপ হয়।

আগেই ১ সেমি বোঁটা সমেত আম পাড়ার কথা বলেছি। এই আমগুলিকে পাড়ার পর বাগানের কোন ঠান্ডা ছায়াযুক্ত কিন্তু পরিষ্কার স্থানে বাঁশের মাচায় বোঁটা নিচের দিকে করে রাখলে বোঁটা থেকে আঠা / কষ নিচে ঝরে যায় ফলে আঠা / কষ আমের গায়ে না লাগায় আমগুলি নিদাগ ও উৎকৃষ্ট গুনমানের হয়। এই পদ্ধতিকে “Desapping” বলে ও আম রপ্তানীর ক্ষেত্রে প্যাক হাইসে এটি আরো উন্নত পদ্ধতিতে করা হয়। যার দেশীয় সংস্করণ অতি সহজেই বাঁশ দিয়ে করা সম্ভব। এর ফলে আমাদের দেশের মধ্যেই বিভিন্ন Retail Chain এর চাহিদা অনুযায়ী ভালো দাম পাওয়া যাবে।

আম পাড়ার পর কষ বা আঠা ঝরার ক্ষেত্রে রাখার সময় একটি বিশেষ পরিচর্য্যা হল বাছাইকরন (Sorting) ও শ্রেণীবিন্যাস (Grading)। বাঁশের মাচায় তোলার আগে যদি আমচাষীরা খারাপ, আঘাতপ্রাপ্ত আমগুলি প্রাথমিক পর্যায়ে বাছাইতে বাদ দেন তাহলে বাকী পুরো উৎপাদন উন্নত গুনমান সমৃদ্ধ হয়। এর সাথে সাথে সমান আকার রঙ ও পরিপূর্ণতার আমগুলিকে শ্রেণীবিন্যাস করলে যেমন বড়, মাঝারি, ছোট বা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সহজেই প্রতি শ্রেণীর আমকে অলাদাভাবে প্যাকিং করা সম্ভব ও ভালো শ্রেণীর জন্য বেশী দাম আশা করা যায়।

এখন বাজারে ধীরে ধীরে বিভিন্ন Retail Market Chain এর ব্যবসার প্রবেশ ঘটেছে ও কোন কোন ক্ষেত্রে সেই সমস্ত ব্যবসায়ীর প্রতিনিধিরা কোন একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে একত্রিত সর্বোৎকৃষ্ট শ্রেনীর আম নিজেদের পরিবহন মারফৎ নিয়ে যাচ্ছেন ভালো দামের বিনিময়ে। কিন্তু আমাদের আমকে তাদের গুনমানে নিয়ে যেতে হবে।

প্যাকিং এর সময় পরিচর্য্যা -

পশ্চিমবঙ্গে সাধারণতঃ বাঁশের ঝুরিতে ৫০-১০০ কেজি অবধি আম একসঙ্গে প্যাক করা হয়। ফলে একেবারে নিচের সারীর আমগুলি গুনমানে নিকৃষ্ট ও এর মধ্যে কোন একটি আম যদি আগে থেকে সামান্য আঘাত প্রাপ্ত থাকে তবে পরিবহনের সময়ই তা পচে যায় ও আমের স্বভাব বৈশিষ্ট্যের ও সেই সময়কার আবহাওয়ায় আশেপাশের ফলগুলিকেও পচিয়ে ফেলে। এভাবেই প্রতি ধাপে কিছু কিছু করে আম যেমন কমতে থাকে তেমনই শেষ ক্রেতা অবধি পৌঁছানো আম আর তার “ফলের রাজার” উপযোগী দাম পায় না।

বর্তমানে উৎকৃষ্ট গুনমানের আমের ক্রেতার (Retail outlet / Exporters) সংখ্যা বাড়ছে ফলে নিজেদের আমকে তাদের গুনমানে নিয়ে যাওয়া ও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বেশী দামে উন্নত উৎপাদন বিক্রি আর চাষীদের অধরা থাকবে না। বেশী দাম পেতে হলে আমকে উন্নত পদ্ধতিতে প্যাকিং করতে হবে যাতে গুনমান সেরা হয়। উন্নত প্যাকিং এর নিম্নলিখিত  গুনাবলী থাকা দরকার  -

  • দৃঢ় হবে যাতে না থেঁতলে পরিবহনের ধকল সইতে পারে।
  • তাপ ও আর্দ্রতা সহনক্ষম হওয়া দরকার।
  • পুনঃ ব্যবহার যোগ্য আধার ও ভেতরের সামগ্রী সম্পর্কে সম্যক ধারনা দেবার বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার।
  • সমস্ত খরচ হিসাব রেখে লাভজনক হওয়া চাই।

আম চাষীরা যদি প্লাস্টিকের ক্রেট কিনে নেন অথবা আম প্যাকিং এর ঢেউখেলানো ফাইবার বোর্ডের / পিচবোর্ডের বাক্স ব্যবহার করেন তাহলে আমের উৎকৃষ্ট গুনমান সর্বশেষ ক্রেতা অবধি বজায় থাকবে। সাধারণতঃ ঢেউ খেলানো বাক্সগুলি ১৬” x ১২” x ৮” মাপের হয় ও প্রতি বাক্সে ৮-২০ টি অবধি ফল রাখা যায়। বাক্সের ভিতর হাওয়া চলাচলের জন্য উপর নিচে ৬টি করে ও দুই পাশে দুটি করে মোট ২০ টি ছিদ্র থাকা দরকার ও প্রতি ছিদ্রের ব্যস হবে ১ ইঞ্চি। এ ধরনের বাক্স রপ্তানীর জন্য ব্যবহার হয় ও প্যাকেটের গায়ে আম সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য থাকে।

তবে সাধারণ চাষীরা আমকে ভালো প্যাকিং করতে হলে ৫০-১০০ টি আম ধরে, হাওয়া চলাচল করে এমন প্লাস্টিকের ক্রেট ব্যবহার করলে ভালো গুনমাণ পাওয়া সম্ভব। ক্রেট গুলি যাতে একটির উপর একটি বসতে পারে তাহলে পরিবহনের ধকলে আম নষ্ট করার সম্ভানা ন্যুনতম হয়। ঘষা না লাগার জন্য খবরের কাগজ দিয়ে মোড়া বা কাগজের কুচি ও খড় ব্যবহার করা যেতে পারে।

রুনা নাথ,

তথ্য সহায়তায় - ড: শুভদীপ নাথ।

 

 

Share your comments



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online


Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.