মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন নবাবী আম ও তার গল্পগাথা

Wednesday, 03 April 2019 06:21 PM

 

নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদের আম বাগানে যে সব শ্রেষ্ঠ আম পাওয়া যেত, তারমধ্যে উৎকৃষ্ট ও সেরা আম ছিল কোহিতূর ও কালাপাহাড়। কোহিতূর আরবি শব্দ। যেহেতু কোহিতূরের বাংলা অর্থ ‘কালো পাহাড়’ তাই অনেক আম বিশেষজ্ঞ কোহিতূর ও কালাপাহাড় একই প্রজাতি বলে মনে করেন। আমের বিভিন্ন প্রজাতি নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা গেছে কোহিতূর ও কালাপাহাড় দুটি ভিন্ন প্রজাতির আম। কোহিতূরের জন্ম হেকিম আগা মোহাম্মদী বাগে আর কালাপাহাড় মুর্শিদাবাদের জাফরগঞ্জের নবাব ফৈয়াজ বাগের আম। কোহিতূর আমের গঠন গোলাকার, রং – গাঢ় সবুজ, ওজন ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম। এই আম পাকার সময় এর গায়ে ডুমো ডুমো আব হয়। পাকার সময় গায়ে হলুদ আভা লক্ষ্য করা যায়। আর কালাপাহাড় আম অনেকটা গোল লম্বাটে গায়ে মসৃন কালো বর্ণের, যার গায়ে কোন ডুমো বা আব থাকেনা এটাই মৌলিক পার্থক্য।

কোহিতূর আম খাওয়ার ও সংরক্ষণের পদ্ধতি –

গাছে কোহিতূর আম উপযুক্ত আকারের হলে এর রক্ষনাবেক্ষন আরম্ভ করে দিতে হয়। এই আমের ওজনের তুলনায় বোঁটা অনেকটা শরু ও লম্বা তাই অল্প ঝড় বাতাসে ফলটি ঝরে পড়ে। সেজন্য নবাবী আমলে প্রতিটি আমে জাল দিয়ে গাছের ডগার সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হতো যাতে আমটি ঝরে না পড়ে।

আম পাকার উপযুক্ত হলে ঠুসি লাগানো লগার সাহায্যে পেড়ে ঝুরিতে নরম আস্তরনের উপর রাখা হতো। অত:পর কাঠের পাটাতনের উপর খড় ও তুলো বিছিয়ে নরম গদি বানিয়ে তার উপর রাখা হতো এবং দিনে ২/৩ বার এপাস ওপাস করে দেওয়া হত যাতে আমটি টুসকে না যায়। আম খাওয়ার উপযুক্ত হলে, এক ঘন্টা আগে বোটা কেটে বরফ জলে ডুবিয়ে রাখা হতো। তারপর হাতির দাঁতের বাঁট লাগানো ধারালো ছুরি দিয়ে আস্তে আস্তে খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে নবাব, বেগম, আমীর, ওমরাহ অভ্যাগতদের পরিবেশন করা হতো। কখনো কখনো পাকা আমের রস নিংড়িয়ে খোয়া দুধের সাথে মিশিয়ে খাওয়া হত। নবাব পরিবার ও মাড়োয়াড়ি জৈন সম্প্রদায়ের নিকট এটি মূল্যবান উপাদেয় খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হত।

ইতিহাসবিদ পি সি মজুমদার তার ‘দি মসনদ অফ মুর্শিদাবাদ’ গ্রন্থে শ্রেষ্ঠ ২৫টি প্রজাতির মুর্শিদাবাদের আমের তালিকা প্রকাশ করেছেন।

  1. কহিতুর
  2. কালাপাহাড়
  3. মিছরী কান্দ
  4. মিজ্জা পসন্দ
  5. নবাব পসন্দ
  6. নাজিম পসন্দ
  7. রাণী পসন্দ
  8. রোগনী
  9. শাহ দোল্লা
  10. বড়া শাহী
  11. বড়া সিঁদুরিয়া
  12. সবজা
  13. আনারস
  14. অনুপম
  15. বাঙ্গাজল
  16. বেগম পসন্দ
  17. ভবানী চৌরস
  18. বিমলী
  19. সাবদার পসন্দ (বিড়া)
  20. দাউদ ভোগ
  21. দিল পসন্দ
  22. দুধিয়া
  23. ফাউকুল বয়ান
  24. গৌরজীৎ
  25. ইলসাপেটী

ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদের আমের পরিচিতি –

ঐতিহাসিক লেখক পি সি মজুমদার তার ‘দি মসনদ অফ  গ্রন্থে মুর্শিদাবাদের ভাল জাতের আমগুলিকে কায়েক ভাগে ভাগ করেছেন। যথা :

(১) ছিলকা পাতলা (খোসা পাতলা) আম যেমন – কোহিনূর, চম্পা , রাণী পসন্দ, হজুর পসন্দ, লজ্জাতবক্স, সারেঙ্গা প্রভৃতি।

(২) সেরাদার (রসালো) আম: উদাহরণ: কালাপাহাড়, কোহিতূর, সেরাদার।

(৩) গুটলি ছোট (আটি ছোট) আম: রাণী পসন্দ, চম্পা, সারেঙ্গা।

(৪) তুলসী (অম্লমধুর মিষ্টি জাত) আম – যেমন আনারস।

(৫) মোম-মোলায়েম (ঘন শাশযুক্ত রসালো ও তৃপ্তকর) আম: যেমন – মোলাম জাম, কোহিতূর, অনুপম, বেগম পসন্দ, নবাব পসন্দ।

(৬) বারিশা (ছোবর বিহীন) আম : যেমন – শাহদোল্লা, মোম্বাই, ল্যাংড়া।

(৭) দাড়িমা ( ছোবড় যুক্ত) আম: যেমন – দাড়িমা, দুখিয়া।

(৮) সুগন্ধযুক্ত (মন-মোজ) আম: যেমন চম্পা, গোলাপখাস, আনারস, চন্দন কোষা, জাফরালী, কিষানভোগ, বেলা, রামতেনুখাস ইত্যাদি।

অপরদিকে আমের আকার, রঙ, স্বাদ-গন্ধ দেখে আমের কয়েকটি ভাগ করা হয়ে থাকে :-

(ক) গাঢ় লাল আভাযুক্ত আম – গোলাপ খাস, বড় সিঁদুরিয়া, ধোবানী, চন্দনকোষা, মৌরী।

(খ) হলুদ আভা যুক্ত আম – সুবেদার পসন্দ, রানী পসন্দ, ভবানী, দাউদ পসন্দ।

(গ) কালো সবুজ রং মিশ্রিত আম – কালা পাহাড়, কোহিনুর, সুরমা ফজলি।

(ঘ) সাদা ও ঘিয়ে রং মিশ্রিত আম – সাহেব পসন্দ, সেরাদার ।

আম পাকার সময় অনুযায়ী আমকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয় -

(১) জলদি জাত – মে-জুন মাসে পাকে, যেমন –সুবেদার পসন্দ, পাঞ্জা পসন্দ, গোলাপ খাস, সারেঙ্গা, চন্দনকোষা, বৈশাখী।

(২) মাঝারি জাত – জুন মাসে পাকে, যেমন – হিমসাগর, ল্যাঙরা, রোহিনী, রুগনী।

(৩) নাবি জাতের আম – সাধারনত জুলাই মাসে পাকে, যেমন – ফজলি, কিষান ভোগ,দাউদ ভোগ, মোলাম জাম, ধোবানী, সুরমাফজলী ইত্যাদি।

 

তথ্য:মুহম্মদ ওয়াসাদ আলী

রুনা নাথ(runa@krishijagran.com)



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online

Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.