প্লাগ ট্রে বা পোর ট্রেতে চারা তৈরির আধুনিক প্রযুক্তি

Wednesday, 25 April 2018 01:23 PM

প্লাগ ট্রে বা পোর ট্রেতে চারা তৈরির আধুনিক প্রযুক্তি

বর্তমান যুগের উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন নতুন সবজির উৎকৃষ্ট গুনমানের হাইব্রিড তৈরি হয়েছে ও অসময়ে সবজি চাষের প্রচলন বেড়েছে। অধিক লাভের সবজি গুলির চারা তৈরির জন্য আজকের দিনে প্লাগ ট্রে বা পোর ট্রে বহুল ব্যবহার হচ্ছে। পূর্ব ও উত্তর ভারতের কিছু রাজ্য ছাড়া, অন্যান্য রাজ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সবজি চারা উৎপাদনে এই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার চালু হয়েছে। এই প্রযুক্তির প্রধান উপাদান হল চারা তৈরি করার প্লাস্টিকের ট্রে যাতে ছোট টবের আকৃতির খোপ থাকে। এতে মাটি না দিয়ে বিশেষ গ্রোথ মিডিয়াম দিয়ে প্রতি খোপে একটি করে বীজ দিয়ে চারা বড় করা হয়। এই খোপগুলিকে প্লাগ বা পোর বলে ও প্রতিটি প্লাগের তলায় টবের মতই অতিরিক্ত জল নির্গমনের জন্য দুটি বা একটি ছিদ্র থাকে। সবজি ফসলের জন্য সাধারনভাবে যে ট্রে ব্যবহার হয় তাতে ৯৮ টি বা ১০৪ টি খোপ বা প্লাগ থাকে। তবে বর্তমানে সবরকম সবজি যেমন কুমড়ো গোত্রের সবজিগুলি ও পেঁপে, সজনে ইত্যাদিরও প্লাগ ট্রেতে চারা করা হয় যার জন্য অপেক্ষাকৃত বড় আকারের খোপ বিশিষ্ট প্লাগ ট্রে তৈরি করা হয়।

প্লাগ ট্রেতে মাটি ব্যবহার করলে, জলসেচে মাটি ভারি হয়ে জমে জাবার ফলে অঙ্কুরোদ্গম ও চারা বৃদ্ধি ভালো হয় না। তাই হালকা ও জলনিকাশী ক্ষমতা সম্পন্ন কোকোপিট ব্যবহার করা হয়। এই প্রযুক্তি এক ধরনের হাইড্রোপনিকস্ বা কৃত্রিম গ্রোয়িং মিডিয়ামে চারার পরিচর্যা। বাঁশের মাচায় বা চাষিদের বাড়ির ছাদে (যাদের পাকা বাড়ি আছে) বা মাটির তৈরি উঁচু বেডের ওপর কালো পলিথিন পেতে তার উপর , একজন চাষির পক্ষে ১০০-৫০০ প্লাগ ট্রে খুব সহজেই রক্ষনাবেক্ষন করে, অতি উন্নত, নিরোগ ও পুষ্ট সবজি চারা তৈরি করা সম্ভব। গ্রীষ্মে বোরোধান উঠে যাবার পর বর্ষাকাল ও তার পরবর্তীতে ধানের তুষ সহজে পাওয়া সম্ভব ও প্রয়োজনে কেঁচোসারের সঙ্গে পরিমান মত (১৫-২০ কেজিতে ৫০ গ্রাম ট্রাইকোডার্মা) ট্রাইকোডার্মা জৈব রোগনাশক মিশানো যেতে পারে। তবে, ধানের তুষ না পেলে ও পর্যাপ্ততার অভাবে মাঝারি বালি ও কেঁচোসার ১:১ অনুপাতে মিশিয়ে প্লাগ ট্রের গ্রোথ মিডিয়াম তৈরি করা যাবে। ব্যবসায়িক উদ্যোগের জন্য, স্বল্প খরচে, বাঁশের তৈরি পরিকাঠামোর উপরে পলিশীট ও পাশে কীট প্রতিরোধী নেট লাগিয়ে, তার তলায় উঁচু বেড করে কালো পলিথিন পেতে, তার উপর প্লাগ ট্রে রেখে সহজেই চারা তৈরি সম্ভব ও ভালো আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্লাগ ট্রেতে চারা তৈরির সুবিধা:

  • প্রতিটি বীজ একই সময় ও ভালোভাবে অঙ্কুরোদ্গম হয়।
  • প্রতিটি চারা সমান জায়গা পেয়ে একই অনুপাতে বাড়ে।
  • নির্দিষ্ট সংখ্যায় চারা পাওয়া যায়।
  • প্রতিটি চারার পুষ্ট ও ভালো শিকড় হয়।
  • বহনযোগ্য ও প্রয়োজনে স্থানান্তর করা যায়।
  • মাটিতে বীজতলার থেকে অনেক তাড়াতাড়ি চারা পাওয়া যায়।
  • নতুন সবজির হাইব্রিড বীজের ক্ষেত্রে সর্বাধিক চারা পাওয়া সম্ভব।
  • বাড়ির কাছে, ছাদে, অল্প খরচের পরিকাঠামো ও শেড হাউসে সহজে রক্ষনাবেক্ষন করা যায়। চারার ডাঁটি মোটা হয় ও রোয়ার পর মৃত্যু প্রায় হয় না।
  • মূল জমি তৈরি না হলে বেশীদিন চারা রেখেও দেওয়া যায়।
  • রোগপোকা কম লাগে ও সহজে সুসংহত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
  • অসময়ের সবজি চাষে চারা তৈরিতে ও অতিবর্ষাতে উপযোগী প্রযুক্তি।
  • ব্যবসায়িক উদ্যোগে চারা তৈরির জন্য একেবারে আদর্শ।
  • উচ্চ আয়ের সবজি চায়ের জন্য উপযুক্ত।
  • প্লাগ ট্রে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য।

প্লাগ ট্রেতে সবজি চারা তৈরির পদ্ধতি:

  • পরিস্কার জলে প্লাগ ট্রে ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে।
  • গ্রোথ মিডিয়াম প্লাগ ট্রেতে ভর্তি করে হাতের সাহায্যে খুব শক্তও না আবার খুব হাল্কাও না এভাবে রাখতে হবে।
  • পরিষ্কার কাঠির সাহায্যে প্রতিটি প্লাগ বা খোপের গ্রোয়িং মিডিয়ামে ১ সেমি গর্ত করে একটি করে বীজ দিতে হবে।
  • অল্প গ্রোথ মিডিয়াম বা মিশ্রন দিয়ে বীজ ঢেকে দিতে হবে।
  • হালকা জলসেচ দিয়ে ৩-৪ টি প্লাগ ট্রে উপর নিচে বসিয়ে পলিশীট জড়িয়ে ২-৩ দিন ঢেকে রাখতে হবে।
  • অঙ্কুরোদগম হলে প্লাস্টিক খুলে ট্রে গুলি আলাদা ভাবে পাশাপাশি রেখে পরিচর্যা নিতে হবে।
  • চারা কিছুটা জলাভাবে ঢলে পড়লে তবেই হালকা করে ঝলসেচ দিতে হবে।
  • চারা এক সপ্তাহের হলে একবার কপার অক্সিক্লোরাইড ১ গ্রাম / লি. জলে স্প্রে করতে হবে।
  • চারার বৃদ্ধির সাথে জলসেচের জলে ১৯:১৯:১৯ রাসায়নিক মিশ্র সার ৫-৭ দিনের ব্যবধানে ৩ গ্রাম / লি গুলে ঝরি দিয়ে দিতে হবে।
  • প্লাগ-ট্রে গুলির পরিচর্যা, শেড নেট হাউস বা পূর্বের মত বলা পলিশীট ও নেট সমন্বিত পরিকাঠামোতে বা বাড়ির ছাদে বা বাড়ির পার্শ্ববর্তী বাঁশের মাচায় (উপরে ছাউনি সমেত) বা বীজতলার উপর রেখে করতে হবে।
  • প্রয়োজন মত পূর্ববর্নিত নিমতেল একবার স্প্রে করতে হবে বা ব্যবসায়িক উদ্যোগের জন্য ১৫ দিনের চারাতে ডাইক্লোরভস্ ১ মিলি / লি. স্প্রে করতে হবে।
  • ২০-২৫ দিনের চারা রোয়া বা বিক্রির উপযুক্ত হবে। লিক, সেলেরির ক্ষেত্রে কিছুটা বেশীদিন (দেড় মাস ) সময় লাগতে পারে।
  • মূল জমি তৈরি না হলে , প্রয়োজন অনুসারে জল দেওয়া নিয়ন্ত্রণ করে চারা ৪৫-৬০ দিন অবধি ভালো অবস্থায় রাখা যাবে।

প্লাগ ট্রেতে চারা তৈরি করে নিতে পারলে , চারা বিক্রিও করা যাবে। খুব ভালো ভাবে আর নতুন শাক সবজি গুলির ক্ষেত্রে

চারা বিক্রি করে ব্যবসাও করা যাবে। নতুন ধরনের শাক সবজিগুলির বীজের দাম বেশী আর অনেক ক্ষেত্রে সকল চাষিদের কাছে উপলব্ধতাও সম্ভব হয়ে ওঠে না। এরকম পরিস্থিতিতে, আমাদের রাজ্যে বেকার যুবক / যুবতী বা কুশলী চাষিরা নানারকম সবজির সঙ্গে আচ্ছাদনের মধ্যে প্লাগ ট্রেতে নতুন শাক সবজির চারা তৈরি করে, নিজের লাগানোর সঙ্গে ব্যবসায়িক উদ্যোগে বিক্রিও করতে পারবেন। এই ধরনের বিকল্প কর্মসংস্থানে অল্প টাকা মূলধন লাগিয়ে তিন থেকে চারগুন লাভ একবছরের মধ্যেই পাওয়া সম্ভব।

ড: শুভদীপ নাথ।


CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.