পানিফল হল একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী জলজ ফসল। অনেকেই একে আবার জল সিঙ্গারা নামেও চেনেন। পশ্চিমবাংলার ঠিক দুর্গাপূজার শুরুর সময় থেকেই বাজারে পানিফল দেখতে পাওয়া যায়। লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে এর চাষ কৃষকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। পশ্চিমবঙ্গে এই ফসলের চাষের এলাকা ক্রমশ বাড়ছে। পানি ফলের বিজ্ঞানসম্মত নাম হল ট্রাপা ন্যাটানস। এটি হল জলজ ফসল। এর আদি নিবাস হল চীন। ভারতবর্ষের বিহার, ঝাড়খন্ড পশ্চিমবাংলা, উত্তর প্রদেশ এবং উড়িষ্যার মতো রাজ্যগুলিতে ব্যাপকভাবে পানিফলের চাষ করা হয়। মূলত জলাভূমিতে পানি ফলের চাষ করা হয়। এই রাজ্যের পুকুর, ডোবা, নয়নজলি, নালা এবং ঝিলের মধ্যে পানি ফলের চাষ দেখা যায়। বর্তমানে নীচু জলা জমিতে ধান চাষ না করে কৃষকেরা পানিফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: পানিফল এর পুষ্টি এবং ভেষজ গুণের জন্য বেশ জনপ্রিয়। ফসলে খোসার নিচে থাকা ত্রিকণাকার সাদা রংয়ের নাইটি হলো এর খাদ্য উপযোগী অংশ। এটি কাঁচা অবস্থায় যথেষ্ট জল পূর্ণ। ১০০ গ্রাম খাদ্য উপযোগী ফলের মধ্যে আছে ৮০-৮৫ গ্রাম জল, ২৪ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১.৪ গ্রাম প্রোটিন, ৩ গ্রাম ফাইবার, ৯৭ কিলো ক্যালরি শক্তি, ৫৮৫ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ১১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১৫ মিলিগ্রাম সোডিয়াম এবং ৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি। এতে কোন প্রকার ফ্যাট থাকে না। এর ফল কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যায়। এছাড়াও টুকরো স্যালাডের সাথে মিশেও খাওয়ার চলন রয়েছে। নরম ফল হালকা ভেজে অথবা সেদ্ধ করে নরম অবস্থায় খাওয়া যায়।
জাতঃ মোট চার প্রকারের পানি ফলের চাষ ভারতবর্ষে দেখতে পাওয়া যায়। এগুলি হল কাটাযুক্ত লাল ও সবুজ রংয়ের এবং কাটাবিহীন লাল ও সবুজ রঙের ফল বিশিষ্ট। উল্লেখযোগ্য জাত গুলি হল বিহার লরজ রেড, বালিয়া রেড, বালাসোর রেড, লক্ষ্ণৌ গ্রীন এবং কুনপুরি।
জলবায়ুঃ পানি ফলের গাছের সন্তোষজনক বৃদ্ধি ও পরিস্ফুরণের জন্য ২৫০-৩০° সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা প্রয়োজন। যদিও এর বীজের সফল অঙ্কুরোদগমের জন্য দরকার শীতল (১২০-১৫০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা) আবহাওয়া।
মাটিঃ বাণিজ্যিক চাষের জন্য জৈব পদার্থ যুক্ত উর্বর কাদামাটি হল আদর্শ। মাটির ক্ষারাভ্রামান (পিএইচ) হতে হবে নিরপেক্ষ থেকে কিছুটা ক্ষারীয়।
জলের গভীরতা: যেসব জলাশয়ে পানি ফলের চাষ করা করা হবে সেখানে এক থেকে দুই মিটার জলের গভীরতা পানিফলের সন্তোষজনক বৃদ্ধির জন্য দরকার। ফল তোলার আগে জলের গভীরতা কমিয়ে ফেলতে হবে।
বীজ বপন ও চারা তৈরিঃ প্রথমে যথেষ্ট পরিমাণ জৈব সার মিশিয়ে নার্সারির মাটি তৈরি করে নিতে হবে। প্রথমে পুষ্ট ও রোগ মুক্ত বীজ বা নাট গুলি নার্সারিতে সারি করে বপন করতে হবে। ঝাবি করে জল প্রয়োগের মাধ্যমে মাটি ভিজিয়ে দিতে হবে। এক বিঘা পরিমাণ নার্সারির জন্য ১০ থেকে ১২ কেজি বীজ লাগবে।
চারা রোপণ: মূল জমিতে চারা রোপনের আগে ফুল সার প্রয়োগ করতে হবে। আগাছা তুলে জমি পরিষ্কার করে নিতে হবে। চারাগুলি ১ মিটারের মতো লম্বা হলে তবেই রোপন করতে হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ২ মিটার এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব এক মিটার রাখতে হবে। রোপনের সময় যাতে চারা জলে ডুবে না যায় সেটা নজর রাখতে হবে।
সার প্রয়োগ: বাণিজ্যিক চাষের জন্য মূল জমিতে জৈব সার বিঘা প্রতি ১০ কুইন্টাল হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়াও চারারোপণের সময় বিঘা প্রতি ৪ থেকে ৫ কেজি ইউরিয়া মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়াও বিঘা প্রতি ২-২.৫ কেজি ইউরিয়া চারা রোপনের ২৫ থেকে ৩০ দিন পরে প্রয়োগ করা দরকার।
যত্ন ও পরিচর্যা: পানিফলের গাছ যাতে ঠিকমতো বেড়ে উঠতে পারে তার জন্য নিয়মিত জলজ আগাছা যেমন জলকলমি, কচুরিপানা, হাইড্রিলা ও বড় পানা তুলে ফেলে পরিস্কার রাখতে হবে।
ফসল তোলা ও কলন: কাঁটাবিহীন লাল জাতের পানি ফলের গাছে ফুল ফোটা শুরু হয় আগস্ট মাসের মাঝামাঝি থেকে তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে এবং চলে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। আবার কাঁটাবিহীন সবুজ জাতের বেলায় পানিফল গাছে ফুল ফুটার সময়কাল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি অর্থাৎ আগস্ট মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত। পানিফল পরিপক্ক হলে জলাশয় টিনের অথবা কাঠের তৈরি ছোট শৌকা বা ডোঙ্গায় করে জলের মধ্যে ভাসমান গাছের কাছে পৌঁছে বাঁহাতে করে প্রত্যেকটি গাছ তুলে নেওয়ার পর, ডানহাতে ফল বা নাট গুলি সংগ্রহ করে মাটি বাটিতে বা হাঁড়িতে রাখতে হবে। জলাশয় অগভীর হলে জলাশয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে ফল তোলার পর হাঁড়িতে রাখতে হবে। গাছে পাতাগুলি জলের উপবিভাগে ভাসে কিন্তু ফলগুলি থাকে পাতার নীচে এবং জলের মধ্যে উপর থেকে ফলগুলিকে যেহেতু দেখা যায় না তাই প্রত্যেকটি গাছ তুলে তার নীচ থেকে ফল সংগ্রহ করতে হয়। বাজারে নিয়ে যাওয়ার আগে সংগৃহীত ফলগুলিকে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। স্থানীয় লোকাল জাতের পানিফলের বিঘা প্রতি ফলন হল ৩৫০-৪০০ কেজি। আবার উন্নত বাণিজ্যিক জাত বিহার লার্জরেতের ফলন অনেক বেশি অর্থাৎ ৫০০-৭০০ কেজি।
রোগ ও পোকার সমস্যা: বিটল পোকা গাছের পাতা ও ফুলের পাপড়ি কেটে ক্ষতি করে। আক্রান্ত গাছের পাতা গুলি ফুটো হয়ে যায়। এই প্রকার উপদ্রব কমাতে ৭-১০ দিন অন্তর দুবার কার্বারিল ৮৫ ডব্লিউ, পি. বিঘাপ্রতি ২০০ গ্রাম হিসেবে ৮০-১০০ লিটার জলে গুলে স্প্রে করতে হবে। রোগের মধ্যে ছত্রাক ঘটিত ধসা ও পাতার দাগ দেখা যায়। আক্রান্ত গাছকে বাঁচাতে হলে কাবেন্ডাজিম পাউডার প্রতি লিটার জলে ১ গ্রাম অথবা ম্যানজেব (৬৩%) ও কাবেন্ডাজিম (১২%) মিশ্রণ ছত্রাকনাশক প্রতি লিটারে ২ গ্রাম হিসাবে গুলে নেওয়ার পর আক্রান্ত গাছের সাত দিন অন্তর দুবার স্প্রে করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গে কৃষকদের জীবিকা নির্বাহে পানিফলের চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কৃষক পরিবারের লোকেরা এই অর্থকরী ফসলের চাষ এবং বিক্রির কাজ করে তাদের রুজি রোজগার করতে পারছেন। পানি ফলের চাষ অনেক সহজ ও তুলনামূলকভাবে কম খরচ সাপেক্ষ। দুর্গাপূজার সময় উৎপাদন কম থাকার কারণে বাজারে বেশি দামে কিনতে হয়। এরপর থেকে উৎপাদন বেশি হওয়ার কারণে এর বাজার দাম কমে যায়। কালী পূজার পরবর্তীকালে বাজারে বিক্রির দাম দাঁড়ায় ৬০-৭০ টাকা প্রতি কেজি। এক বিঘা জমিতে চাষের খরচ বাদ দিয়ে বিঘা প্রতি লাভের পরিমাণ দাঁড়ায় সারা বছরে প্রায় ৩০-৪০ হাজার টাকা।
লেখক- সৌমেন্দ্র নাথ দাস