করমচার (Karamcha) বৈজ্ঞানিক নাম Carissa carandas। শহরকেন্দ্রিক মানুষ এখনও অনেকে করমচাকে চেনেন না। এটি টকজাতীয় জনপ্রিয় মজার ফল। বর্তমানে প্রকৃতি প্রেমিকদের দৃষ্টি পড়ায় করমচা এখন অনেক বাগানে ও ছাদে শোভা পাচ্ছে। ফলগুলো দেখতে ছোট কিন্তু কোয়েল পাখির (Quail Bird) ডিমের মতো পাশাপাশি লাল গোলাপি ফল, কাঁটাভর্তি ডালপালা, ঘন সবুজ পাতা। গাছটির ফুল দেখতে জুঁই ফুলের মতো সাদা, সুগন্ধি আছে এবং ফলের ভারে ভেঙে পড়ে ডালপালা। করমচা গাছের ফল অনুরূপ জাপানের চেরী ফলের মতো-ই।
এ ফলটি গ্রামে এক সময়ে হারিয়ে গেলেও সব জায়গায় বর্তমানে জনপ্রিয়। করমচা একটি বেশ ঔষধি গুণসম্পন্ন একটি ফল। ভারতবর্ষে আদি চিকিৎসাশাস্ত্রে এর চমৎকার ভূমিকা রয়েছে।
বৈশিষ্ট্য:
এ ফল গাছটি এক ধরনের শক্ত কাঁটাওয়ালা ঝোপঝাড় প্রকৃতির। চিরসবুজ এই উদ্ভিদটি প্রায় ২.৫-৩.০ মিটার লম্বা হয়। কাঁচা ফলের রঙ গাঢ় সবুজ, পাকলে লাল হয়। শেষে কালচে হয়ে যায়। বর্তমানে করমচার কিছু নতুন জাত মাঝে মাঝে চোখে পড়ে। এসব জাতের কোনোটার ফলের রঙ সাদা, কোনোটার ফলের রঙ সাদার মধ্যে গোলাপি আভা আবার কোনোটির রঙ টকটকে লাল। কোনো কোনো জাতের ফলের গায়ে খয়েরি দাগ থাকে। গাছে ডাল, পাতা বা ফল ছিঁড়লে সাদা দুধের মতো কষ বের হয়।
সাধারণত জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসের ফল। আবার বর্ষাকালেও ফল পাকে। করমচার ঔষধি গুণাগুণ আছে।
পুষ্টিগুণ (Nutrition) -
করমচা ফল হিসেবে বেশ অবহেলিত হলেও এর পুষ্টিগুণ কিন্তু মোটেও অবহেলা করার মতো না। প্রতি ১০০ গ্রাম করমচায় রয়েছে - এনার্জি-৬২ কিলোক্যালরি ,কার্বোহাইড্রেট -১৪ গ্রাম, প্রোটিন - ০.৫ গ্রাম, ভিটামিন এ - ৪০ আইইউ, ভিটামিন সি - ৩৮ মিলিগ্রাম, রিবোফ্লেভিন - ০.১ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন - ০.২ মিলিগ্রাম, আয়রন - ১.৩ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম - ১৬ মিলিগ্রাম ,পটাশিয়াম - ২৬০ মিলিগ্রাম, কপার-০.২ মিলিগ্রাম।
করমচার নানা গুণাবলি আমাদের স্বাস্থ্যরক্ষায় নানাভাবে সাহায্য করে থাকে। যেমন-
উপকারিতা (Health Benefits) -
১.করমচাতে কোনো ফ্যাট বা কোলেস্টেরল নেই। তাই ডায়াবেটিস ও হার্টের রোগীদের জন্য এ ফল খুব উপকারী।
২.করমচা ওজন কমাতেও সাহায্য করে।
৩.ভিটামিন সি-তে ভরপুর করমচা খাবারে রুচি বাড়ায়।
৪.মৌসুমী সর্দি-জ্বর নিরাময়ে সাহায্য করে। স্কাভি, দাঁত ও মাড়ি নানা রোগ প্রতিরোধে করমচা সাহায্য করে।
৫.করমচাতে উপস্থিত ভিটামিন বি গায়ের চুলকানিসহ ত্বকের নানা রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
৬.করমচা রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রেখে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। শরীরের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ কমাতেও করমচা সাহায্য করে।
৭.যকৃৎ ও কিডনির রোগ প্রতিরোধে করমচা সহায়তা করে। এর পটাশিয়াম শরীরের দূষণ বহিষ্কারকরণে সহায়তা করে।
৮. করমচা কৃমিনাশক হিসেবেও কাজ করে। এছাড়া পেটের নানা অসুখ নিরাময়েও করমচা উপকারী।
৯.রীরের ক্লান্তি ও বার বার হাই তোলা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য করমচার রস বেশ কাজে দেয়।
১০.বাতরোগ ও ব্যথাজনিত জ্বর নিরাময়ে করমচা খুব উপকারী।
১১.করমচাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, যা চোখের জন্য খুবই উপকারী।
১২. করমচার কার্বোহাইড্রেট কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
অন্যান্য অংশের উপকারিতা:
ফলের পাশাপাশি এর গাছের অন্যান্য অংশেরও রয়েছে নানা কার্যাবলি। যেমন- করমচা গাছের পাতা সিদ্ধ করে সেই পানি পান করলে কালাজ্বর দ্রুত নিরাময় সাধন করে। করমচা গাছের মূলে রয়েছে হৃদরোগ নিরাময়ে উপকারী ক্যারিসোন, বিটাস্টেরল, ট্রাইটারপিন, ক্যারিনডোনা ও লিগনাম। কাঁচা ফলের রস কৃমিনাশক হিসেবে কাজ করে।
আরও পড়ুন - জানুন হরীতকী গাছের বৈশিষ্ট্য ও তার বিশেষ উপকারীতা
গাছটি এক দিকে কমনীয় আরেক দিকে ঔষধি গুণ। ফলটি গ্রামাঞ্চলে বেশ জনপ্রিয় হলেও শহরে দেখা মিলে খুব কম। গ্রীষ্মের শেষ এবং বর্ষা শুরুর মুহূর্তে পথে-ঘাটে বিক্রেতার ঝুড়িতে দেখতে পাওয়া যায়। তবে এটা চাষও করা সম্ভব। ঝোপ-ঝাড়ের মতো বলে গ্রামাঞ্চলে এ গাছ বাড়ির সীমানা প্রাচীর বেড়া হিসেবে লাগানো হয়।
আরও পড়ুন - এই মরসুমে সুস্থ থাকতে খাবার পাতে রাখতেই হবে সজনে ফুল
Share your comments