কীটনাশক ব্যবহারের ইতিবৃত্ত

Monday, 03 June 2019 11:27 AM

আজ থেকে ১০০০০ বৎসর পূর্বে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার মানুষেরা প্রথম কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন, আজ যে সমস্ত দেশগুলি পরস্পরবিরোধী শক্তি, যেমন-ইরাক, তুরস্ক, সিরিয়া, জর্ডন, ইজরায়েল অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের বিস্তির্ণ এলাকা প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত ছিলো। শুরুর দিকে এখানকার অধিবাসীরা বেশীরভাগই ছিলো শিকারী, অর্থাৎ খাদ্যের সংগ্রাহক। ধীরে ধীরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের অববাহিকা অঞ্চলে মেসোপটেমিয়ার মানুষেরা কৃষি উৎপাদন শুরু করে, প্রথমদিকে তাঁরা গম, বার্লি, মটর, ডালশস্য, মোরগদানা, মাসকলাই ইত্যাদি ফসলের উৎপাদন শুরু করে। জনসংখ্যার বৃদ্ধিই মানুষকে সংগ্রাহক থেকে উৎপাদকে পরিণত করেছিলো। ঐ একই সময়ে আফ্রিকা মহাদেশের সাহিল অঞ্চলে চিনাচাল, জোয়ার-বাজরা-রাগি (মিলেটস্‌) ইত্যাদি ফসলের উৎপাদন শুরু হয়। পূর্ব আফ্রিকার ইথিওপিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকার গিনি অঞ্চলের মানুষেরা স্থানীয়ভাবে কিছু ফসলের উৎপাদন শুরু করেছিলো, তেমনি আমেরিকার ঘরোয়া ফসল হয়ে উঠেছিলো ভুট্টা, স্কোয়াশ, আলু এবং সূর্যমুখী।

প্রচীন পৃথিবীতে যেমন ফসল উৎপাদন শুরু হলো তেমনি বাড়তে শুরু করে ফসলের হানিকারক কীটপতঙ্গদের উপদ্রব। পুরাতন সভ্যতার ইতিহাসগুলি ঘাটলে হয়তো দেখা যাবে ইতিহাসিক দুর্ভিক্ষগুলির জন্য যতটা না প্রাকৃতিক কারণগুলি দায়ী, তার থেকে বেশী দায়ী ছিলো কীটপোকার আক্রমণ। আজ যেমন প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও ফসলের উপর রোগপোকার আক্রমণ অবধারিত এবং এটাও সত্যি যে প্রতিবৎসর উৎপাদিত খাদ্য ও তন্তু ফসলের গড়ে ৩৫-৪০% ক্ষতিসাধন হয়ে থাকে। ফসলের এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাবার জন্য মেসোপটেমিয় এবং সুমেরিয় সভ্যতার মানুষেরাই আজ থেকে ৪৫০০ বৎসর পূর্বে প্রথম কীটনাশকের ব্যবহার শুরু করেছিলো। তাঁরা কিছু সালফারঘটিত যৌগকে ক্ষতিকারক কীটনিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহার করেছিলো। ৩২০০ বৎসর পূর্বে চিনারা শরীরের উকুন বা পরজীবীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহার করতো আর্সেনিক ও পারদ ঘটিত যৌগ। প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সাহিত্য, লোকগাথা, সঙ্গীতে প্রাচীন কৃষিতে যে শস্যসুরক্ষায় কীটনাশকের ব্যবহার ছিলো তার অনেক প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এইসব প্রাচীন সংস্কৃতি থেকেই বোঝা যায় যে দক্ষিণ ইউরোপে গড়ে ওঠা এই দুই প্রাচীন সভ্যতার মানুষেরা প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক ব্যবহার করতো কীটদমন, রোগদমন, আগাছা দমন, পেস্ট দমন, গৃহপালিত প্রাণীর শরীরের বহিঃপরজীবীদের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য। এইসব রাসায়নিক পদার্থ তাঁরা উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহ থেকে উৎপাদিত জৈব রাসায়নিক এবং সহজলভ্য খনিজ লবন থেকে আহরন করে কীট দমনের কাজে ব্যবহার করতো। প্রাচীন সভ্যতার মানুষেরা ফসলের ঝলসা ও ধ্বসা রোগ নিবারণের জন্য ধূম্র বা ধোঁয়াকে ব্যবহার করতো, এবং এই ধোঁয়া উৎপাদনের জন্য শুকনো খড়, বিচুলি, ঝোপঝাড়, কাঁকড়ার খোলস, শুকনো মাছ, শুকনো ঘুঁটেকে ব্যবহার করতো, এবং উৎপন্ন ধোঁয়াকে ফলের বাগান ও শস্যক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেবার জন্য ব্যবহার করতো ষাঁড় বা ঐ জাতীয় অন্যান্য প্রাণীদের শিং-কে, আসলে এই শিং দিয়ে পড়ন্ত আঁচে ছাইয়ের গোদায় ফুঁ  মারা হতো। এই ধোঁয়া ফসলকে ঝলসা বা ধ্বসা রোগের হাত থেকে রক্ষা করতো, তাছাড়া ধোঁয়া সাহায্যে ক্ষতিকারক কীটদেরও দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব হতো।

লতানে উদ্ভিদের শরীর থেকে যে তরুক্ষীর নির্গত হতো তাতে হামা দেওয়া পতঙ্গেরা আটকে পড়তো। আগাছা নিয়ন্ত্রণের জন্য মানুষ বেশীরভাগটাই কায়িক শ্রম ব্যবহার করতো। কীটনাশককে আগেকার মানুষ কথ্যভাষায় বলতো ‘নোনা জল বা সমুদ্রের জল’। দুই হাজার বৎসর পূর্বে ক্রিসান্থেমাম সিনেরারাইফোলিয়াম (পাইরেথ্‌রাম ডেইসি) ফুলের থেকে পাইরেথ্‌রাম নামক রাসায়নিক উৎপাদন করা হতো এবং সেটিকেই কীটনাশক রূপে ব্যবহার করা হতো। পারসিয়ানরা শস্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করতেন শুকনো ক্রিসান্থেমাম ফুলের পাউডার। আরবের সাথে ইউরোপীয়দের ক্রুসেড যুদ্ধের পর ইউরোপীয়রা এই তথ্য সমগ্র ইউরোপে চালান করে যে শুকনো ডেইসি ফুলের পাউডার মাখলে উকুনজাতীয় বহিঃপরজীবীদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সুতরাং, এইভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাস ঘাটলে প্রমাণ পাওয়া যাবে যে কীটনাশকের ব্যবহার ব্যবস্থাটি একেবারেই আধুনিক নয়, সেযুগেও অনেক জৈব ও খনিজ রাসায়নিককে কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। উদ্ভিদে ছত্রাকজাতীয় রোগের প্রতিরোধে কপার সালফেট ও চুনের মিশ্রণকে (বোর্দ মিক্সচার) ব্যবহার করা হতো।

লেখক: 

প্রদীপ পাল(pradip@krishijagran.com)

কীটনাশক ব্যবহারের ইতিহাস বিশদে জানতে পড়ুন কৃষি জাগরণ পত্রিকা

রুনা নাথ(runa@krishijagran.com)



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online

Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.