জৈব আবহ সৃষ্টির মাধ্যমে ফসলের সুরক্ষা

KJ Staff
KJ Staff

জীববৈচিত্র্য হল সমস্ত জীবের একটি সম্পূর্ণ রকমফের বা বলা ভালো, তাদের পরিবেশ বা নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রের জটিলতার সাথে নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য বিবিধ রকমের প্রচেষ্টা। উদ্ভিদের থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন ধরণের গন্ধের বৈচিত্র্য একটি বিভিন্ন-ফাসলিক বাস্তুতন্ত্রে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষতিকারক জীবদের পক্ষে একটি প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করছে।

বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবস্থায় ক্ষতিকারক জীব নিয়ন্ত্রণের যান্ত্রিক পদ্ধতিসমূহঃ

১। সম্পদ নিবিড়করণ নীতিঃ সঠিক সময়ে প্রধান উদ্ভিদসমূহের নিবিড়িকরণপূর্বক বা একফসলের চাষের পর কিছুটা সময় রাখা উচিত যাতে অন্তরবর্তিকালীন ফসলকে অন্তরবর্তীকালীন ফসল চাষের নীতির দ্বারা দ্রবীভূত করা যায়। যার ফলে ফসলের জমিতে আগাছাখাদক পতঙ্গ বা প্রাণীরা একত্রিত হতে পারে, অর্থাৎ চাষের মরশুমের আগে আগাছাকে খাদ্য হিসাবে ভক্ষণকারী প্রাণীর সংখ্যা বাড়তে পারে।

২।  প্রাকৃতিক শ্ত্রুবৃদ্ধি নীতিঃ এই নীতির মাধ্যমে পরিপূরক খাদ্য, শিকার ইত্যাদি বৃদ্ধির কারণে বহিরাগত প্রাকৃতিক আগাছাদমনকারী জীবগোষ্ঠী বিশেষ সাড়া প্রদান করে।

কোনো স্থানের উদ্ভিদের বৈচিত্র্য নীচের পদ্ধতি অনুযায়ী বাড়ানো যেতে পারেঃ

১। অন্তরবর্তীকালীন শস্য উৎপাদনঃ অন্তরবর্তীকালীন শস্য উৎপাদন ব্যবস্থাটি যে কোনো কৃষি বাস্তুতন্ত্রের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারে যা কিনা সেই অঞ্চলের শস্য-কীট ব্যবস্থাপনা নীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ এর মাধ্যমে আমরা ক্ষতিকারক প্রাকৃতিক শ্ত্রু, কীটশত্রুর বিনাশ বিনা কীটনাশকেই করতে পারি।

২। ফাঁদ শস্য চাষঃ ফাঁদ শস্য বলতে সেই সকল শস্যসমূহকে বোঝায় যারা ক্ষতিকারক পতঙ্গদের আকৃষ্ট করে খাদ্যশস্য সমূহের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। এইসব ফাঁদ শস্যসমূহ পতঙ্গদের খুব আকৃষ্ট করতে সক্ষম, কিন্তু খুবই কম স্থান দখল করে থাকে। এই সব ফাঁদশস্যসমূহকে চাষের সময়ের আগে বা পরে রোপণ করা হয়ে থাকে।

ফাঁদ শস্য আমাদের ফসলে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের জন্য কৃত অতিরিক্ত ব্য্যয় ভার লাঘব করে। এদের ক্ষতিকারক কীটশত্রুদের দমন করার ক্ষমতা সাধারণ কীটনাশক-এর তুলনায় অনেকটাই বেশী হয়ে থাকে। ফলে প্রধান শস্যে কীটনাশক কম ব্যবহার করলেও চলে। আসলে প্রাকৃতিক উপায়ে কীট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ কার্যকরীতা ভিত্তিক, পরিবেশ বান্ধব এমনকী কীট নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য কৃত্রিম ব্যবস্থার তুলনায় অনেকবেশী বিজ্ঞানসম্মত।

তবে এই ফাঁদশস্যসমূহকে যদি চাষের অনেক আগে রোপণ করা হয় তাহলে তা কীটশত্রুদের আঁতুড়ঘর বানিয়ে ফেলতে পারে, তাই এটি মনোফেগাস পেস্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর হবার সম্ভাবনা নেই। এই ধরণের ব্যবস্থা কীটশত্রুদের মধ্যে শক্তিশালী কীটনাশকের প্রতিরোধী ক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি করতে পারে, তেমনি আবার প্রকৃতিক কীটশত্রুদের সমূলে ধ্বংসও করে দিতে পারে।

৩। বাধাদানকারী শস্যঃ বাধা এমন একটি ভৌত পরিকাঠামো যা কোনো ক্ষতিকারক পতঙ্গকে উদ্ভিদ পর্যন্ত পৌঁছতে বাধা দান করতে পারে। এই সব উদ্ভিদরা পোকাকে গাছের থেকে দূরে সরিয়ে রাখে তবে, তাদের হত্যা করে না।

৪। পতঙ্গপরাগী ফুলের উদ্যানঃ জৈব উপায়ে কীট নিয়ন্ত্রণের একটি বড় উপায় হলো পতঙ্গপরাগী উদ্ভিদের উদ্যান স্থাপন করা, যা কিনা বর্তমানে কীট নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি নতুন পথ দেখিয়েছে। অনেক ধরণের ফুলের গাছ আছে যাদের বহিরাগত ক্ষতিকারক কীট ও পরজীবীদের ধ্বংস করতে সক্ষম। গাঁদা, পুদিনা, সূর্যমূখী, সূর্যশিশির, এছাড়াও কচুরীপানা, নিম, তুলসী হল পতঙ্গ আকর্ষনকারী উদ্ভিদ। ভ্রমরের লার্ভা যারা সবুজ মাছির লার্ভা খেয়ে বেঁচে থাকে, তারা গুল্ম ও সবজির ফুলের প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়ে থাকে। সবুজ মাছির লার্ভা গাজর, ধইঞ্চা, ডাল, শাকপাতা, ইত্যাদির ফুল দ্বারা আকৃষ্ট হয়। এই সমস্ত গাছের ফুলের রেণু ও মকরন্দ এই সব পতঙ্গের ডিমের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। বীটের ফুল কিছু বোলতা জাতীয় পতঙ্গের লার্ভা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে যারা আবার কিছু অন্য পতঙ্গের লার্ভা ও শুঁয়োপোকা খেয়ে বেঁচে থাকে।

অনুসিদ্ধান্তঃ

সুতরাং উপরের আলোচনা থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করেও কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের সুরক্ষা করতে সক্ষম, শুধু একটু বিজ্ঞান্সম্মত চিন্তাধারা আনলে আমরা কৃষিবিষ প্রয়োগ ছাড়াই কীটশত্রুর নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। তাই কৃষি বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণের মাধ্যমে আমরা ক্ষতিকারক কীটের বেঁচে থাকার অনুপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে তাদের প্রাকৃতিক শত্রুদের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে পারি।

- প্রদীপ পাল

Like this article?

Hey! I am KJ Staff. Did you liked this article and have suggestions to improve this article? Mail me your suggestions and feedback.

Share your comments

আমাদের নিউজলেটার অপশনটি সাবস্ক্রাইব করুন আর আপনার আগ্রহের বিষয়গুলি বেছে নিন। আমরা আপনার পছন্দ অনুসারে খবর এবং সর্বশেষ আপডেটগুলি প্রেরণ করব।

Subscribe Newsletters