পেনে মাছ চাষের সুবিধা ও সতর্কতা

Thursday, 31 October 2019 12:56 PM

পেনে মাছ চাষ প্রথম কবে ও কোথায় শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে অনেক মতবিরোধ আছে। তবে মনে করা হয় যে, পেনে মাছ চাষ প্রথম ১৯২০ সালে জাপানের সমুদ্র-উপকূলে করা হয়েছিল। বর্তমানে পেনে মাছ চাষ  স্বাদু-জলে মাছ চাষের একটি বহুলপ্রচলিত পদ্ধতি নামে খ্যাত। এছাড়া বর্তমানে চিংড়ি ও মালেট চাষেও পেনের ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

পেনে মাছ চাষ প্রথম কবে ও কোথায় শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে অনেক মতবিরোধ আছে। তবে মনে করা হয় যে, পেনে মাছ চাষ প্রথম ১৯২০ সালে জাপানের সমুদ্র-উপকূলে করা হয়েছিল। বর্তমানে পেনে মাছ চাষ  স্বাদু-জলে মাছ চাষের একটি বহুলপ্রচলিত পদ্ধতি নামে খ্যাত। এছাড়া বর্তমানে চিংড়ি ও মালেট চাষেও পেনের ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে

পেন কাকে বলে?

বেড়া, জাল, বাঁশ বা অন্য কোনো উপকরণ দিয়ে যখন কোনো বদ্ধ বা মুক্ত জলাশয়ের চারিদিক ঘিরে, ভিতরে মাছ জমা করে চাষ করা হয়, তখন তাকে পেনে মাছ চাষ বলে

পেনে মাছ চাষের ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পেনের জন্য সঠিক স্থান নির্বাচন করা। তলদেশে অসমান বালিময়, দূষণের সম্ভবনাময়, প্রবল স্রোতযুক্ত এবং ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভবনাময় জলাশয় কখনোই পেনে মাছ চাষের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচিত হবে না। পেন কখনই জলাশয়ের গভীর অংশে নির্মাণ করা বাঞ্ছনীয় নয়। ১ থেকে ২ মিটার গভীরতাযুক্ত  ও অল্প ঢালু জলাশয় যেখানে তলদেশে বালি মিশ্রিত কাদা আছে, তা পেনের পক্ষে আদর্শ।

 

পেনে মাছ চাষের সুবিধাঃ

  • খুব সামান্য সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করে পেন তৈরী করে মাছ চাষ সম্ভব।
  • হাঁস বা মুরগীর সাথে পেনে সমন্বিতভাবে মাছ চাষ সম্ভবপর।
  • খুব অল্প সময়ে এবং সহজে পেন তৈরী করা যায়।
  • খুব সহজেই পেন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করা যায়।
  • এই প্রক্রিয়ায় মাছ চাষ খুবই কম শ্রমসাপেক্ষ।

পেনের আকারঃ জলাশয়ের আকার, জলাশয়ের মালিকানার সংখ্যা ইত্যাদি পেনের আকারকে নির্ধারণ করে। পেনের আয়তন সাধারণত ০.১ হেক্টর থেকে ১০ হেক্টর বা তার থেকেও বেশী হতে পারে। তবে আকারে ছোট পেনের ক্ষেত্রে মাছ চাষে বেশী সুবিধা হয়।

পেন তৈরির নির্মাণ সামগ্রীঃ পেন তৈরির জন্য ২ টি উপাদান অত্যাবশ্যকীয়।

  • বেড়াঃ যার মাধ্যমে পেনে মাছ আবদ্ধ রাখা হয়। বাঁশের তৈরী বানা, নাইলন জাল, সুতার জাল, টায়ার কর্ডের জাল, তারের জাল ইত্যাদি বেড়া হিসেবে সাধারণত ব্যাবহার করা হয়।
  • খুঁটিঃ যার মাধ্যমে বেড়া ধরে রাখা হয়। খুঁটির জন্য প্রধাণত বাঁশ, কাঠ, লোহা, সিমেন্ট ইত্যাদি ব্যাবহার করা হয়।

পেনের নির্মাণ-পদ্ধতিঃ

  • পেন তৈরির জন্য প্রথমে সঠিক স্থান নির্বাচন করতে হবে।
  • সেই স্থানের পরিমাপ নিতে হবে।
  • বানা , জাল বা বেড়া দিয়ে জায়গাটিকে ঘিরে নিতে হবে। এই জাল বা বেড়ার প্রস্থ যেন জলের গভীরতা থেকে যেন ২-৩ ফুট বেশী থাকে।
  • যেসকল অঞ্চলে জলের প্রবাহ অত্যন্ত বেশী, সেখানে বানার তলদেশের ১ - ২ ফুট মাটিতে পুঁতে দিতে হবে।
  • জালের ফাঁস নির্বাচন করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা বিশেষ সতর্কতা দাবী করে।
  • মুক্ত অঞ্চলে পেন নির্মাণের ক্ষেত্রে যদি জলের প্রবাহ ভালো থাকে, সেখানে ফাঁসের মাপ ১.৫ থেকে ২.০ সেন্টিমিটারের হওয়া উচিত, যা অনেক ক্ষেত্রেই মাছের চারা- পোনার মাপের ওপর নির্ভর করে, না হলে চারা-পোনা জাল থেকে বেরিয়ে আসার অনেক সম্ভবনা থেকে যায়।
  • পেনের রাক্ষুসে ও অবাঞ্ছিত মাছের দমনঃ পেনে মাছ চাষের ক্ষেত্রে রাক্ষুসে মাছ বাঞ্ছনীয় নয়, কারণ তা পোনা মাছগুলিকে খেয়ে ফেলে, এবং তা প্রাকৃতিক খাদ্য খেয়ে নেয়। এর ফলস্বরূপ পেনে মজুদ করা মাছের বৃদ্ধি ও উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মহুয়া-খোল ব্যাবহার করে সবসময় ভালো ফল পাওয়া যায় না, বিশেষত যেখানে পেনের সহিত পেনের বাইরের জলের সংযোগ থাকে। এসকল ক্ষেত্রে ছোট ফাঁসের জাল পর পর কয়েকবার টানলে ভালো উপকার পাওয়া যেতে পারে। পেনে মাছ ছাড়ার পূর্বে জলজ-আগাছা দূরীকরণ একটি অত্যাবশ্যকীয় কাজ। এই ধরণের জলাশয়ের ক্ষেত্রে চুন ও সার একসাথে প্রয়োগের পরিবর্তে শুধুমাত্র সার প্রয়োগে বেশী ভালো ফলাফল পাওয়া যায়, কারণ এই ধরণের জলাশয়ের ক্ষেত্রে জলের প্রবাহ বিদ্যমান থাকে। পেনের কাছে বা পাড়ে হাঁস, মুরগীর ঘর থাকলে ভাল, কারণ এটি জৈব সারের উৎস হিসেবে কাজ করে পেনের উর্বরতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। যে সমস্ত পেনে জলের প্রবাহ থাকে না, মানে জল আবদ্ধ অবস্থায় থাকে, সেখানে প্রথাগত পদ্ধতিতে সার ও চুন মিশিয়ে ব্যাবহার করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।

    অধিক ফলনের জন্য পালনীয় কর্তব্যঃ

    • পোনা মাছ গুলো যেন সুস্থ্ ও সবল হয়।
    • মাছগুলির আকার যেন কখনই ৩-৪ ইঞ্চির কম না হয়, কারণ তা বেড়ার ফাঁকা দিয়ে বেড়িয়ে যেতে পারে।
    • তাছাড়া অতিরিক্ত ছোট মাছগুলিকে সহজেই রাক্ষুসে মাছ গ্রাস করতে পারে।

    পেনে মাছের খাদ্য-সরবরাহ প্রক্রিয়াঃ

    পেনে মাছ মজুদের ঘনত্ব বেশী হলে প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশাপাশি পরিপূরক খাদ্যের সরবরাহ অত্যাবশ্যকীয়।

পেনে মাছের উৎপাদন কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

  • মাছ চাষের পরিবেশ-গত অবস্থা।
  • মাছের মজুদ-ঘনত্ব।
  • মাছ চাষের জন্য সঠিক প্রজাতি-নির্ধারণ।
  • মাছের বেঁচে থাকার হার।
  • মাছ চাষের সঠিক-পদ্ধতি।

    পেনে মাছ চাষের সতর্কতা -

  • মুক্ত জায়গায় পেন তৈরী করা উচিৎ নয়, এতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হবার সম্ভবনা বেশী থাকে।
  • প্রবল স্রোত ও ঢেউ যুক্ত নদী বা খালে পেন তৈরী করলে ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভবনা বেশী থাকে।
  • পেন থেকে মাছ চুরি হবার সম্ভবনা খুব বেশী থাকে, তাই অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়াবার জন্য সবসময় পেনের চারিদিকে পাহাড়ার ব্যাবস্থা করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, পেনে মাছ চাষ বর্তমানে অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও, অনেক অসুবিধাও লক্ষ্য করা গেছে। প্রচুর পরিমাণে দূষণের সম্ভবনা ও বাইরের খাবারের ওপর প্রচুর পরিমাণে নির্ভরশীলতা এই পদ্ধতিটির প্রসারকে অনেক অংশে কমিয়ে দিয়েছে। তাই এই সমস্যা গুলিকে কাটিয়ে ওঠার বিভিন্ন পদ্ধতি সন্ধান করা হচ্ছে। এই চেষ্টা সফল না হলে পেনে মাছ চাষের মত এমন সম্ভবনাময় পদ্ধতি অবলুপ্তও হয়ে যেতে পারে অথবা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার কিছু মুষ্টিমেয় দেশের মধ্যে।

তথ্যসূত্র - শতরূপা ঘোষ

অনুবাদ - স্বপ্নম সেন (swapnam@krishijagran.com)

English Summary: Advantages -and -precautions- of- cultivating -fish- in- pen

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.