যথাযথ খাদ্য অভ্যাস এবং চাষাবাদ অঞ্চল হ'ল মাছের স্বাদ বাড়ানোর মূল চাবিকাঠি

KJ Staff
KJ Staff

হরেক মাছের হরেক স্বাদ , স্বাদের সেই মাছের পরিচয়, তাই কোনো একটির স্বাদের সাথে অন্য মাছের কোনো তুলনাই চলে না। রুই, কাতলা, মৃগেলের যেমন একটা নিজস্ব স্বাদ রয়েছে, তেমনি মৌরলা , পুটি প্রভৃতি মাছের এক এক রকমের স্বাদ। নতুন মাছ আমুর বা পেংবারও তেমনি তার নিজস্ব স্বাদ রয়েছে।   

আবার বিভিন্ন মাছের স্বাদ ও গন্ধ সেই সব মাছের খাদ্যাভাসের ওপর নির্ভর করে। মাছের স্বাদ, রঙ এবং গন্ধ খাদ্য ও খাওয়ার অভ্যাসের উপর নির্ভর করে । আবার যেখানে মাছটি বসবাস করে, মাছের বাসস্থান প্রকৃতি মাছের স্বাদ এর ওপর প্রভাব বিস্তার করে । আবার চাষযোগ্য মাছ গুলোকে বাইরে থেকে দেওয়া খাবারের গুণমানের ওপর তাদের স্বাদ নির্ভর করে। তাই বেশী প্রাকৃতিক খাদ্যে উৎপন্ন মাছের স্বাদ বেশি হয়ে থাকে। যেমন, বিদেশে বহুল সমাদৃত মাছ হল সালমন মাছ।  অ্যামাক্স্থ্যানটিন নামক যৌগ জমা হওয়ার কারণে জৈবিক প্রাকৃতিক সালমনের তুলনায় কৃত্রিম খাবারে উৎপন্ন চাষের সালমন রঙিন নয় এবং তাই বাজারে কম দাম পায়। আবার আমাদের রুই, কাতলার মতো কার্প জাতীয় মাছ ছোট বদ্ধ জলাশয়ের তুলনায় বড় জলাশয়ের মাছ বেশী স্বাদ যুক্ত হয় ।মাছের শরীরে অবস্থিত যৌগ গুলির তারত্যমের ফলে এক একটি মাছে এক রকমের স্বাদ অনুভব হয়।   

মৎস্য বৈজ্ঞানিকরা মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া প্রভৃতি জলজ প্রাণীর স্বাদ পর্যালোচনা করেছিলেন এবং তাঁদের গবেষণা থেকে জানা যায় যে, মাছের গন্ধটি বিভিন্ন ধরণের স্বাদ যৌগগুলিতে বিতরণ করা হয়, যা প্রজাতি ও জৈবিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। মাছের স্বাদ এবং গন্ধের নিউক্লিয়াসটি সোডিয়াম এবং ক্লোরাইড আয়ন সহ গ্লুটামিক অ্যাসিড এবং নিউক্লিওটাইডের সিনার্জিস্টিক প্রভাব দ্বারা নির্মিত হয়। মূল স্বাদ অন্যান্য স্বাদ সক্রিয় অ্যামিনো-অ্যাসিড, প্রধানত টৌরিন এবং আরজিনিন, এবং নিউক্লিওটাইড এবং অজৈব আয়ন এর প্রভাবের ওপর নির্ভর করে থাকে। পেপাইডাইড, জৈব পদার্থ, জৈব অ্যাসিড এবং শর্করা কিছু মাছ প্রজাতির চরিত্রগত স্বাদের জন্যও দায়ী। গন্ধ ভলাটাইল, লিপিড, ফ্যাটি অ্যাসিড এবং গ্লাইকোজেন সামগ্রিক গন্ধ উত্পাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আটলান্টিক স্যালমনের পাঁচটি প্রজাতির বড় পরিমাণে আনসারাইন পাওয়া যায়, এটি একটি মহান স্বাদযুক্ত মাছ, এবং প্রস্তাবিত যে স্যালমনের পেশীতে উপস্থিত এনারারাইন তার স্বাদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

আবার বাঙ্গালীদের কাছে, ইলিশ মাছ অন্যতম স্বাদ যুক্ত মাছ।
ইলিশ তার স্বতন্ত্র নরম তৈলাক্ত টেক্সচার, আরো বিশেষ কিছু কারণে সবচেয়ে স্বাদযুক্ত মাছ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মাছটিকে বলা হয় মাছের রাজা। ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ার আগে বেশি স্বাদ যুক্ত হয় । আবার গবেষণায় এটাও দেখা গেছে, একই বয়সী পুরুষ ইলিশের চেয়ে স্ত্রী ইলিশ বেশী স্বাদ যুক্ত হয় এবং স্ত্রী ইলিশের বৃদ্ধিও বেশী হয় পুরুষ ইলিশের তুলনায় এবং ডিম ছাড়ার আগের মুহুর্তের সময়গুলোতে স্ত্রী ইলিশের শরীরে ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকে (১৬-২২% ফ্যাট)। 

ইলিশ মাছের স্বাভাবিক স্বভাব হচ্ছে, এরা  সমুদ্রের নোনা জলে থাকে, কিন্তু প্রজননের সময় ডিম পাড়ার জন্য নদীর মিষ্টি জলে আসে। দেখা গেছে সমুদ্রের নোনাজলের ইলিশের তুলনায় নদীর মিষ্টি জলের ইলিশ বেশি স্বাদযুক্ত। আবার পদ্মার ইলিশের স্বাদ সব থেকে বেশী।  বেশ কিছু গবেষক দাবি করেছেন যে, ইলিশের একটি উপ-স্টক পদ্মা নদীতে বিদ্যমান, যদিও অনেক গবেষক ইলিশকে বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমার এই অঞ্চলে একক স্টক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইলিশ মূলত ভারত, বাংলাদেশ ও মায়ানমারে পাওয়া যায় । কিছু বিজ্ঞানী ইলিশের (টেনুয়ালোসা ইলিশার ) মধ্যে খুব স্বতন্ত্র জেনেটিক পার্থক্য পাওয়া যায় বলে দাবী করে থাকেন।

সমুদ্রে থাকার সময়কালে ইলিশ ছোট, পাতলা এবং কম স্বাদযুক্ত থাকে, তবে তা নদী-সমুদ্রের মোহনা অঞ্চল -এর ঈষৎ নোনা জলে প্রবেশ করলে তার স্বাদ ও ওজন বৃদ্ধি পায়। ইলিশ প্রধানত প্রাকৃতিক খাদ্যকণা প্ল্যাঙ্কটন খায়।  প্রধানত নীল- সবুজ শেত্তলাগুলি, ডায়োটমস কপোপড, ক্লাদোকেরা, রোটিফার, জৈব ডাইট্রাইটাস, কাদা, বালি, ইত্যাদি হল ইলিশের প্রধান খাদ্য । কিন্তু পরবর্তী উর্ধ্বগামী স্থানান্তরের সময় সব সময়ে অর্থাৎ নদীর ধারে চলতে থাকলে ইলিশের খাদ্য গ্রহণ অনেকটাই কমতে থাকে বলে বিজ্ঞানীরা বলেন । ইলিশের মাইগ্রেশন সময় এটি তার শরীরের জমা চর্বি দ্বারা প্রয়োজনীয় শক্তি নিয়ে থাকে। অতএব, সমুদ্রে ইলিশ থেকে ঈষদ নোনা জলের ইলিশ থেকে নদী বরাবর চলতে চলতে চর্বিযুক্ত বস্তুটি হ্রাস পায় । তাই  সামুদ্রিক পরিবেশে সমৃদ্ধির তুলনায় নদীতে তুলনামূলকভাবে কম ফ্যাটগুলি ইলিশের মাংসকে আরও নরম এবং নমনীয় করে তোলে।

মাছের ফ্যাটের এই অংশগুলোই  পেশীগুলিতে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং সুস্বাদু গন্ধের বিকাশ ঘটায়। এবং মাছের পেটের অংশটি বেশী স্বাদের হয়। অতএব, মিষ্টি জলের ইলিশের স্বাদ নিয়ন্ত্রণে বহু-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডে সংশ্লেষিত এবং মনো অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডের রূপান্তরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে বলে মনে করা হয় ।

স্বাদের বিচারে আমরা বাঙালীরা ইলিশ কে মাছের রাজা বলে থাকি যেমন, তেমনি বিভিন্ন মাছের স্বাদে আমরাই বিভিন্ন স্বাদই খুঁজে থাকি। তাই পেংবা হোক পাবদা কিংবা পুঁটি বা মৌরলা বিভিন্ন মাছের স্বাদের তার পরিচয় খাদ্য রসিক বাঙালীরা। তাই একটি মাছের স্বাদের সাথে অন্য মাছের স্বাদ না খোঁজাই শ্রেয়।

তথ্যসূত্র - ড. সুমন কুমার সাহু

অনুবাদ - স্বপ্নম সেন (swapnam@krishijagran.com)

Like this article?

Hey! I am KJ Staff. Did you liked this article and have suggestions to improve this article? Mail me your suggestions and feedback.

Share your comments

আমাদের নিউজলেটার অপশনটি সাবস্ক্রাইব করুন আর আপনার আগ্রহের বিষয়গুলি বেছে নিন। আমরা আপনার পছন্দ অনুসারে খবর এবং সর্বশেষ আপডেটগুলি প্রেরণ করব।

Subscribe Newsletters