মৎস্য চাষ বিষয়ক কিছু জরুরী তথ্য

KJ Staff
KJ Staff

পুকুর বা জলাশয়ে মৎস্য চাষ চলাকালীন অনেক সময় জলে পোকা, ব্যাঙাচি, শামুক দেখা যায়, আবার কখনও পুকুরের জলে অম্লত্ব – ক্ষারত্বের তারতম্য, উদ্ভিদকণার আধিক্য পরিলক্ষিত হয়। সহজ উপায়ে এই ধরণের সমস্যার সমাধান করবেন কী করে, তারই কিছু পন্থার হদিশ মিলবে এই প্রবন্ধে। মৎস্য চাষকালে ত পুকুরে অনেক মৎস্য চাষী সোডিয়াম ক্লোরাইড/ পটাশিয়াম ক্লোরাইড/ ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড-এর মতো রাসায়নিক প্রয়োগ করে থাকেন, এর ফলে মৎস্য সুরক্ষিত থাকবে তো? তাদের কোনরূপ ক্ষতির আশঙ্কা নেই তো? কিংবা জলাশয়ে উৎপাদন বাড়াতে কোন ধরণের মৎস্য সহায়তা করবে? আলোচ্য প্রবন্ধে রইল এই ধরণের বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান।

১) পুকুরে পোকা, ব্যাঙাচি, শামুক নিয়ন্ত্রনে কিছু সহজ উপায় আছে?

হাঁস পোকা, ফড়িং, কাঠি পোকা, গুবরে পোকা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের জন্যে অল্প কিছু ফলুই মাছ ছেড়ে রাখতে পারলে ভালো হয়। এছাড়া নিমখোল, তেঁতুল বীজের গুঁড়ো জলে গুলে প্রয়োগ করা গেলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। শামুক নিয়ন্ত্রণের জন্যে ডালসমেত কঞ্চি ফেলে রাখতে হবে ও মাঝে মাঝে তুলে শামুক ছাড়াতে হবে।

ব্যাঙাচি নিয়ন্ত্রণে পুকুরের ভিতরের দিকের পাড়ে সমানভাবে ছাই (কয়লা/ঘুঁটে) ছড়াতে হবে।

২) পুকুরের অম্লত্ব কমানোর জন্যে কিংবা ক্ষারত্ব কমানোর জন্যে কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে?

অম্লত্ব কমাতে চুন, কম দামী কাপড় কাচা সাবান কুচি কুচি করে কেটে চটের ব্যাগে ভরে বাঁশের খুঁটির সাথে পুকুরে ঝুলিয়ে রাখা যেতে পারে – এছাড়া কলাগাছের কাণ্ড কুচিয়ে পুকুরে ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা বস্তায় বেঁধে ঝুলিয়ে রাখলে ফল পাওয়া যায়।

ক্ষারত্ব কমাতে তেঁতুল পাতাসমেত ডাল, জিপসাম প্রয়োগ খুব উপযোগী।

৩) মাছ চাষ কে অন্যান্য উৎপাদনের সঙ্গে জুড়লে তাতে কী কী বাড়তি সুবিধে হবে?

প্রথম কথা এতে বর্জ্য পদার্থের পুনরাবর্তনের মাধ্যমে চাষের খরচ কমে ও সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

যেমন, পুকুরের পাড়ে/ওপরে হাঁসের ঘর রাখলে জৈব সার কিছুটাও তার বর্জ্য থেকে পাওয়া যাবে। এছাড়া হাঁস কিছুটা কীট দমন করে, পুকুরের জলে বাতাস সঞ্চালন করা ছাড়াও মাছগুলোকে সদা ব্যস্ত করে, তাতে পরস্পরের উপকার হয়, সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ে এবং কম খরচা হয়।

এছাড়া পুকুরের পাড়ে কিছু মরশুমি শাক সব্জীও চাষ করা যায়ই – ঘরের খাবার জোগান ছাড়া পুকুরের সুরক্ষাও বাড়ে।

৪) জলে শৈবাল আধিক্যের ফল কী হতে পারে?

জলে উদ্ভিদকণার পরিমাণ এমনই থাকা উচিৎ, যাতে স্বচ্ছতা ২৫-৩০ সেমি. বজায় থাকে। কমে গেলে (অর্থাৎ উদ্ভিদকণার আধিক্য হলে) অক্সিজেনের ঘাটতি হবে। বিশেষত রাত্রি ও ভোরের দিকে – এক্ষেত্রে সারের প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে। উদ্ভিদ কণা ভোজী মাছ (যেমন, সিলভার কার্প, জাভা পুঁটি, তেলাপিয়া) ছাড়লে কিছুটা নিস্তারও হবেই। অপরদিকে স্বচ্ছতা বেশী হলে (বা উদ্ভিদকণা কম হয়ে গেলে) সামান্য ডলোমাইট ও ইউরিয়া দানা প্রয়োগ করা যেতে পারে – তবে সেই সাথে কদিন পরেই চুন প্রয়োগ করতে হবে।

৫) হঠাৎ বেশী বৃষ্টিপাত হলে পুকুরে কী কোন সমস্যা দেখা দিতে পারে?

আচমকা জোর বৃষ্টিতে জলের তাপমাত্রা হঠাৎ-ই নেমে যায় - ফলে উদ্ভিদকণা ও প্রাণীকণা মড়ক দেখা দিতে পারে। এছাড়া জলের পি এইচ একটু কমে যেতে পারে। রাস্তার তেয়ানি জল পুকুরে পড়তে পারে ও মাছের অস্বস্তির কারণ হয়। এই সকল সমস্যা নিরসনে জলে অক্সিজেন প্রয়োগ, চুন/ডলোমাইট প্রয়োগ, অ্যামোনিয়াম সালফেট খুব অল্প পরিমাণে পুকুরে ছড়ানো যেতে পারে।

৬) ভাসমান ও ডুবে যাওয়া খাবারের সুবিধা/অসুবিধার বিষয়ে দু-একটি কথা –

জলের গভীরতা পাঁচ ফুটের বেশী হলে ভাসমান খাবার দিলে নীচের মাছ, যেমন, কালবোস, মৃগেল, আমেরিকান রুই খাদ্য থেকে বঞ্চিত থাকবে। আবার ডুবে যাওয়া খাবারে কাতলা পুরোপুরি বঞ্চিত থাকে। খাবারের বস্তায় ভাসমান, ডুবে যাওয়া খাবার ও ধীরে ডুবে যায়, এমন খাবার মিশ্রিত করে রাখলে এবং তা থেকে দিতে পারলে খুব ভালো হয়।

৭) মাছ চাষের সামগ্রীর গুণমান কমছে মূলত ভেজালের কারণে - বাদাম খোল, সরষের খোল, তিল খোল বেশী দাম দিয়ে চাষী খারাপ জিনিস কিনছে? মহুয়া খোলের কার্যকারিতা বাড়ছেই না – কী করণীয়?

সকল উপকরণের নির্দিষ্ট মান বেঁধে দেওয়া ও তৎসহ প্রতিটি প্যাকেটে শংসা পত্র রাখার ব্যবস্থা করা গেলে রেহাই পাওয়া যেতে পারে।

৮) জৈব সার প্রয়োগে প্ল্যাঙ্কটন-ভিত্তিক মাছ চাষে জলের পি.এইচ, স্বচ্ছতা ও প্ল্যাঙ্কটন ঘনত্ব জলে বজায় রাখা দরকার। প্রয়োজনীয় মাত্রায় তা আছে কিনা, জানা যায় না- কী করা যেতে পারে এক্ষেত্রে?

সহায়ক নির্ণায়ক কয়েকটি সরঞ্জাম – যেমন, সেক্‌চি ডেস্ক, প্ল্যাঙ্কটন নেট, পি.এইচ পেপার, না পাওয়ার ফলে (বা জনপ্রিয় করা হয়নি বলে) মাছের স্ট্রেস ও অপুষ্টিতে ভোগে ও উৎপাদন কমে। মাছ চাষ চলাকালে বেশ কয়েকবার পরীক্ষা করা দরকার। জল-মাটির পরীক্ষিত কিট পাওয়া গেলে বা মিন মিত্র সহায়কদের মাধ্যমেও তা পাওয়া গেলে অনেক সুবিধে হয়।

৯) মাছ চাষে প্রায়ই বেশ কিছু রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হয়ে থাকে – এদের ব্যবহার কী সমস্যা বাড়িয়ে দেয় না?

রাসায়নিক পদার্থ মানেই খারাপ, তা কিন্তু নয়, এটা মনে রাখতে হবে। যেমন, সোডিয়াম ক্লোরাইড/ পটাশিয়াম ক্লোরাইড/ ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড/ খাদ্য লবণ ইত্যাদির বিশেষ গুরুত্ব আছে। সোডিয়াম ক্লোরাইড ত জীবনদায়ী রাসায়নিক – এর বহুবিধ ব্যবহার আছে। চুন এরকম আরেকটি রাসায়নিক পদার্থ, এছাড়াও আছে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, কোবাল্ট ক্লোরাইড, কোলিন ক্লোরাইড, মনো, ডাই ও ট্রাই ক্যালসিয়াম ফসফেট, জিওলাইট, ডলোমাইট – এরকম আরও অনেক রাসায়নিক আছে, যা খাদ্য নয়, সারও নয় – কিন্তু অ-সার এই পদার্থগুলি নানা সমস্যা নিরসনে, মাছের বাড় বৃদ্ধির সহায়ক হিসাবে, জলের গুণমান ঠিক রাখতে খুবই কার্যকরী। এক জৈব রাসায়নিক পদার্থ আছে – ‘অ্যাক্রিফ্লেভিন’, যার দ্রবণ ব্যবহারে জীবাণুমুক্ত করা যায়। হ্যাচারী ও মাছের রোগবালাই সারাতে প্রাথমিক পর্যায়ে খুব কার্যকরী। এদের নিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ খুবই কার্যকরী এবং তাই সমস্যা বাড়িয়ে দেওয়ার কথা উঠছে না।

১০) জলাশয়ে উৎপাদন বাড়াতে পোনা ব্যতীত কয়েকটি অন্য মাছের উল্লেখ -

এক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হয়, গিফট তিলাপিয়া, আমুর কার্প, সরপুঁটি মাছ, মুক্তোগাছা, পাবদা, বাটা, বাচা, মণিপুরের পুঁটি – পেংবা, ভিয়েতনাম-কই ইত্যাদির উল্লেখ করা যেতে পারে। এছাড়া দেশী মাগুর, শিঙ্গি এবং ট্যাংরা ত আছেই।

ভালো জাতের দেশী ও বিদেশী এই সব মাছ নিকটবর্তী কোন সরকারি হ্যাচারী, সি.এ.ডি.সি হ্যাচারী, এমনকি বেসরকারি হ্যাচারী থেকেও সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে আগে মৎস্য উন্নয়ন আধিকারিক কিংবা জেলার এ.ডি.এফ অফিসেও যোগাযোগ করে জেনে নেওয়া যেতে পারে। কারণ তাঁদের পরিচর্যার পদ্ধতি, ছাড়ার পর কী জাতীয় খাবার, কী পরিমাণে ও কীভাবে দিতে হবে - ইত্যাদি বিষয়ে তাঁরা সহজেই আলোকপাত করতে পারেন। ঠিকমতো প্রযুক্তির প্রয়োগে লাভের পরিমাণ যথেষ্টই ভালো মিলতে পারে।

তথ্য সূত্র - ড. প্রতাপ কুমার মুখোপাধ্যায় 

স্বপ্নম সেন (swapnam@krishijagran.com)

Like this article?

Hey! I am KJ Staff. Did you liked this article and have suggestions to improve this article? Mail me your suggestions and feedback.

Share your comments

আমাদের নিউজলেটার অপশনটি সাবস্ক্রাইব করুন আর আপনার আগ্রহের বিষয়গুলি বেছে নিন। আমরা আপনার পছন্দ অনুসারে খবর এবং সর্বশেষ আপডেটগুলি প্রেরণ করব।

Subscribe Newsletters