আকর্ষণীয় গ্ল্যাডিওলাস ফুলের চাষ

Friday, 23 November 2018 10:56 AM

বিভিন্ন ফুলের মধ্যে ইদানিং গ্লাডিওলাস ফুলটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আকর্ষণীয় রঙ, গঠন এবং দীর্ঘ সময় এটি সজীব থাকায় আমাদের রাজ্যে স্টিক ফুল হিসাবে চাহিদায় এক নম্বরে। তাই এই ফুলের চাষ পদ্ধতির বর্ননা দেওয়া হল।

জমি নির্বাচনঃ জৈব সার সমৃদ্ধ, বেলে দো-আঁশ অথবা দো-আঁশ মাটি। উঁচু জমি, যে জমিতে বৃষ্টির জল জমে থাকে না। জমির পিএইচ  মান ৬.৫ থেকে ৭.৫ হওয়া দরকার, তবে এর চাইতে কম পিএইচ সমৃদ্ধ মাটিতেও এই ফুল চাষ করা যেতে পারে। অধিক কাদাযুক্ত এবং কালো মাটির জমিতে চাষ না করাই ভাল। হালকা মাটির ক্ষেত্রে জৈবসার মিশিয়ে মাটির গুণাগুন ভাল করতে হবে। একই জমিতে বারবার গ্লাডিওলাস চাষ করলে মাটি বাহিত রোগের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ফসলও চাষ করতে হবে।

আবহাওয়াঃ আর্দ্র, রৌদ্র উজ্জল, নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। দিনের তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রী সে. থাকলে উৎপাদন ভালো হবে। উপযুক্ত আর্দ্রতা থাকলে ৫০ ডিগ্রী সে. পর্যন্ত তাপমাত্রা গ্লাডিওলাস সহ্য করতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রায় গাছের জল ধরে রাখার ক্ষমতায় সমস্যা দেখা দেয়, তাছাড়া প্রথম বীজ বপন থেকে প্রথম পাতা বের হওয়া পর্যন্ত যদি উচ্চ তাপমাত্রা থাকে তবে গাছ সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ছোট দিন এবং আলোর তীব্রতা কম হলে ফুল উৎপাদন কমে যায়। পূর্ণ সূর্যালোক এই ফুল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী, ছায়ায় এই ফুল ভাল হয় না। গাছের বৃদ্ধির প্রতিটি ধাপে বিশেষ করে কর্ম (বড় গুঁড়িকন্দ) রোপণ এবং স্পাইক (যে দন্ডটি ফুল ও পাতা ধরে রাখে) বের হওয়ার আগ মুহুর্তে মাটিতে আর্দ্রতার ঘাটতি হলে ফলন কমে যাবে।

কর্ম (বড় গুঁড়িকন্দ)  ও কর্মেল (ছোট গুঁড়িকন্দ) লাগানোর উপযুক্ত সময়ঃ

কর্ম রোপণঃ অক্টোবর মাসে জমি তৈরির পর ৪.৫-৫.০ সেন্টিমিটার ব্যাসের রোগমুক্ত কর্ম মাটির ৬-৭ সেন্টিমিটার গভীরতায় রোপণ করতে হবে।

ভাল জাতের বৈশিষ্ট্যঃ

  • দেশীয় মাটি ও আবহাওয়ায় চাষ উপযোগী;
  • রোগ বালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন;
  • সহজে গাছ হেলে পড়ে না;উন্নত মানের কর্ম ও কর্মেল ব্যবহার;
  • স্টিকে ফুলের সংখ্যা বেশি থাকা;
  • ফুলের রং অধিকতর উজ্জ্বল হওয়া;
  • বেশি সময় ফুলদানীতে সতেজ থাকা।

জমি চাষ পদ্ধতিঃ গ্লাডিওলাস ফুলের জন্য জমিকে খুব ভালোভাবে চাষ করতে হয়, এর মূল বেশি গভীরে প্রবেশ করে না, তাই মাটি খুব গভীরভাবে চাষ করার প্রয়োজন নেই। ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি গভীরতায় জমি চাষ করতে হবে, তবে মাটির নীচে শক্ত কাদা মাটির সত্মর থাকলে মাটি আরো গভীরভাবে চাষ করতে হবে। এ সময়ে প্রতি একরে প্রায় এক টন গোবরসার, 40 থেকে 50 কেজি এসএসপি এবং 15 থেকে 20কেজি এমওপি সার জমিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

রোপণ পদ্ধতিঃ

কর্ম (মাটির নীচের বড় গুঁড়িকন্দ)-এর ক্ষেত্রেঃ

রোগমুক্ত বড় (প্রায় ৩০ গ্রাম) ও মাঝারি (প্রায় ২০ গ্রাম) ওজনের ১.৫  থেকে  ২ ইঞ্চি ব্যাস যুক্ত কর্ম ২.৫ থেকে ৩.৫ ইঞ্চি গভীরতায় রোপণ করতে হবে। কর্ম অবশ্যই সুপ্তাবস্থা (যে সময়টুকুতে অঙ্কুর গজাবে না তাকেই সুপ্তাবস্থা বলে) মুক্ত হতে হবে, অর্থাৎ জমির পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। করম লাগানোর পূর্বে অঙ্কুরিত করে ০.১% থেকে ০.৩% ব্যাভিষ্টিন দ্রবনে ৫ মিনিট ভিজিয়ে রেখে বাতাসে শুকিয়ে নিতে হবে, অপরপক্ষে কর্মেল লাগানোর ক্ষেত্রে ২৪ ঘন্টা জলে ভিজিয়ে নিতে হবে। উন্নত মানের ফুল পাওয়ার জন্য সারি থেকে সারির দূরত্ব ১২ ইঞ্চি এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১০ ইঞ্চি হতে হবে। তবে জমির অপচয় রোধ করার জন্য ‘‘১০ ইঞ্চি x ৬ ইঞ্চি’’ দূরত্বে রোপণ করা যেতে পারে।

কর্মেল (মাটির নীচের বড় গুঁড়িকন্দ)-এর ক্ষেত্রেঃ

কর্ম এর চারদিকে গুচ্ছাকারে ছোট ছোট কর্মেল পাওয়া যায়, কর্মেলের চারদিকে বাদামী রঙের শক্ত খোসা থাকে যার কারণে অঙ্কুরোদগম হতে দেরী হয়, তাই কর্মেল লাগানোর আগে সাবধানতার সাথে খোসা ছাড়িয়ে ২৪ ঘন্টা জলে ভিজিয়ে নিলে অঙ্কুরোদগম তাড়াতাড়ি হবে। কর্মেল লাগানোর ক্ষেত্রে মাটি খুব ঝুরঝুর করে তৈরি করতে হবে এবং কর্ম-এর চেয়ে বেশি পরিমাণে সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিটি কর্মেল খুব ছোট হওয়ায় রোপণদূরত্ব কমিয়ে ৪ ইঞ্চি x ২ ইঞ্চি দূরত্বে এবং অল্প গভীরতায় (প্রায় ১ থেকে ১.৫ ইঞ্চি) রোপণ করতে হবে।

সার প্রয়োগঃ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে ভালভাবে চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করতে হয়। শেষ চাষ দেয়ার সময় প্রতি বর্গমিটারে 5-6 কেজি গোবর সার, 60 গ্রাম এসএসপি এবং 30 গ্রাম এমওপি সার মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। গ্লাডিওলাসে বেশি ইউরিয়া সার দেয়া উচিত নয়। কারণ এতে পুষ্পদন্ড বেশি লম্বা ও দূর্বল হয়ে যায়। প্রতি বর্গমিটারে 10 গ্রাম ইউরিয়া এর অর্ধেক রোপণের 20-25 দিন পর এবং বাকি অর্ধেক পুষ্পদন্ড বের হওয়ার সময় উপরিপ্রয়োগ করা উচিত।

চাষের সময়ে পরিচর্যা

(ক) সেচ-  ভাল ফুল পাবার জন্য মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রস থাকতে হবে। কর্ম মাটিতে লাগানোর পর জমিতে হালকা সেচ দিতে হবে, যাতে কর্মগুলি মাটিতে লেগে যেতে পারে। পরবর্তীতে আবহাওয়ার অবস্থা বুঝে 10 থেকে 15 দিন পরপর সেচ দিতে হবে। সেচের  পরিমাণ কম থাকলে গাছের বৃদ্ধি কমে যাবে। জমিতে পানির পরিমাণ বেশি হলে কর্ম পচে যেতে পারে।

(খ) আগাছা দমনঃ গ্লাডিওলাস ফুলের উৎপাদনে নিয়মিতভাবে গভীর শিকড় যুক্ত আগাছা দমন খুবই জরুরী। আগাছানাশক হিসাবে অনুমোদিত আগাছানাশক 1.8 কেজি/একর স্প্রে করতে হবে। আগাছানাশক ব্যবহারের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন কর্ম ও কর্মেল ক্ষতিগ্রস্থ না হয়।

(গ) মালচিং ও মাটি উঠানোঃ গ্লাডিওলাস ফুল চাষের একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিচর্যা হচ্ছে গোড়ায় মাটি উঠানো। অঙ্কুরোদগমের পর প্রতি 15 থেকে 39 দিন পর পর উপরের মাটি খুপরী বা ’’হো’’ দিয়ে মালচিং করে নিতে হবে। গাছে 3 থেকে 5 টি পাতা বের হওয়ার পর একবার এবং স্পাইক (7 টি পাতা বের হওয়ার পর) বের হওয়ার সময় গাছের গোড়ায় দুই পাশ থেকে মাটি উঠিয়ে দিতে হবে। সেচ দেওয়ার পর বা কোন কারনে কর্ম বা কর্মেল মাটির উপরে উঠে এলে পাশ থেকে মাটি নিয়ে ঢেকে দিতে হবে। মাটি উঠিয়ে দিলে মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকে এবং বাতাসে গাছ পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

(ঘ) স্টেকিং (কাঠি দিয়ে কান্ডকে দাঁড় করিয়ে রাখা): প্রতি সারিতে 6.5 ফুট দূরে দূরে বাঁশের/কাঠের কাঠি পুঁতে 6 ইঞ্চি উপরে একটি এবং স্পাইক বের হওয়ার স্থানে একটি তার বা নাইলনের রশি টানাতে হবে। প্রতি গাছে আলাদা করে ছোট ছোট খুঁটি লাগানো যেতে পারে। গাছ ঘন করে লাগালে স্টেকিং না করলেও চলে। স্টেকিং দেওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন কান্ডে বা মাটির নীচে কর্ম বা কর্মেলে আঘাত না লাগে।

উন্নত জাত - সাদা -থম্বালিনা, হোয়াইট প্রস্পারিটি।

লাল - অস্কার, সুপ্রিম,ফ্রেন্ডশিপ।

হলুদ - অ্যঞ্জালিনা, জেস্টার, ইয়েলো স্টোন, সান সাইন।

- রুনা নাথ

Share your comments



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online


Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.