সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে কলম পদ্ধতিতে গোলাপ চাষ (Cultivation Of Roses)

Saturday, 13 February 2021 12:31 PM
Rose Tree (Image Credit - Google)

Rose Tree (Image Credit - Google)

গোলাপ ফুল  সৌন্দর্য্য ও লাবন্যের প্রতীক। তবে বর্তমানে এর চাহিদা ও সৌন্দর্য্যের কারণে সারা বছরই গোলাপ চাষ করা হচ্ছে। গোলাপ পাঁপড়ির গড়ন ও বিন্যাসে একরূপ নান্দনিকতা রয়েছে যা মানুষকে আকৃষ্ট করে।  অনেক বর্ণের গোলাপ জন্মে থাকে। যেমন গোলাপী, লাল, হলুদ, সাদা, সবুজ ইত্যাদি।  বিভিন্ন হাইব্রিড যেমন"গার্ডেন রোজ" নামে গোলাপেরও উৎপাদন করা হয়।পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি সারাবছর গোলাপের চাষ হয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে  বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জেলাতে গোলাপের চাষ করা হচ্ছে। গোলাপের চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় গোলাপ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

পদ্ধতিঃ

গোলাপ গাছ বীজ, কাটিং, গুটি কলম এবং চোখ কলমের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে থাকে। শুধুমাত্র প্রজনন বা ফসল উন্নয়ন কর্মসূচীর ক্ষেত্রে বীজের মাধ্যমে গোলাপের বংশবিস্তার হয়ে থাকে। তবে নতুন গাছ উৎপন্নের প্রধান পদ্ধতি হলো বাডিং বা চোখ কলম, যার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের উৎপাদন করা হয়ে থাকে। যে জাতটির বংশবৃদ্ধি করা হয় তার চোখ অপর একটি সুবিধামতো আদিজোড় বা রুটস্টক এর উপর স্থাপন করা হয়ে থাকে। আদিজোড় গাছের সজীবতা, উৎপাদনশীলতা, ফুলের গুনাবলী, ঝোপের স্থায়ীত্ব, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মাটি ও আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করে থাকে। আদিজোড়ের কাটিংসমূহ (পেন্সিল আকৃতি) গ্রীষ্মের শেষে তৈরি করা হয়ে থাকে এবং নার্সারিতে সারি করে ২৫ -৩০ সেমি দূরত্বে রোপন করা হয়। প্রায় ৬ মাস পর এইসব কাটিংসমূহ বাডিং এর জন্য উপযুক্ত আকৃতির কান্ড তৈরি করে থাকে। 

গোলাপের চাষ (Rose Cultivation) -

মাটি তৈরিঃ

এঁটেল মাটি গোলাপ চাষের জন্য উপযোগী নয়। টবের জন্য সার মাটি এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে মাটি বেশ ফাঁপা থাকে এবং পানি জমে না থাকে। ১ ভাগ দোআঁশ মাটি, ৩ ভাগ গোবর সার বা কম্পোষ্ট, ১ ভাগ পাতা পচা সার, আধা ভাগ বালি (নদীর সাদা বালি হলে ভাল হয়) দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করে তাতে এক মুঠো সরিষার খৈল ও এক চামচ চুন মিশিয়ে ১টি ২০ সেমি (৮ ইঞ্চি) টবে ১ মাস রেখে দিতে হবে। এই ১ মাস টবে পানি দিয়ে মাটি উল্টে পাল্টে দিতে হবে। এতে মাটির মিশ্রণ ভালো হবে।

চারা বসানোর সময়ঃ

বছরের যে কোন সময়ই টবে গোলাপের চারা বসানো যায়। তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস চারা লাগানোর উত্তম সময়। এ সময় চারা লাগালে বেশি দিন ধরে ফুল পাওয়া যাবে। এছাড়াও গাছের পরিচর্যা করতে সুবিধা হবে এবং গাছে রোগ ও পোকার আক্রমণ তুলনামুলকভাবে কম হয়ে থাকে।

চারা সংগ্রহঃ

চারা সংগ্রহের সময় সুস্থ ও ভালো চারা সংগ্রহ করা উচিত। চারা সংগ্রহের সময় এর গোড়ার মাটির গোল্লাটি অবিকল আছে কিনা তা ভালো করে দেখে নিতে হবে। মাটির গোল্লাসহ চারার গোড়ার শিকড় বেরিয়ে থাকা অবস্থার চারা গাছ না নেওয়াই ভালো। অভিজ্ঞ লোকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্বস্ত ও পরিচিত নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করা উত্তম।

চারা বসানোঃ

চারাগাছ বা কলমচারা মাটির গোল্লাসহ পলিথিন ব্যাগে অথবা ছোট মাটির টবে কিনতে পাওয়া যায়। চারাটি যদি টবের হয়, তাহলে টব থেকে পুরো মাটিসহ চারাটি এমনভাবে নিতে হবে যাতে ভেংগে না যায় বা শিকড়ের কোন ক্ষতি না হয়। ভেজা মাটির গোল্লাসহ চারা সংগ্রহ করলে তা একটু শুকিয়ে নিতে হবে। চারা বসাবার আগেই গাছের অপ্রয়োজনীয় পুরোনো বা মরা ডাল পালা হালকা ভাবে ছেঁটে দিতে হবে। এরপর চারাটি টবের মাঝখানে সোজা করে বসিয়ে টবের ওপরে কিছু কম্পোষ্ট সার দিয়ে গাছের গোড়ারমাটি হালকা চাপ দিয়ে বসিয়ে দিতে হবে। চারা এমনভাবে বসাতে হবে যাতে কুঁড়ি বের হবার গিট/ পর্ব টি মাটির ওপরেই থাকে।

সেচঃ

টবে বসানোর পর অন্তত ২-৩ বার পানি সেচ দিতে হবে। চারা অবস্থায় গাছ যাতে প্রখর রোদ বা বৃষ্টির ঝাপ্টা থেকে রক্ষা পায় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রথম অবস্থায় ৩/৪ ঘণ্টা  এবং ধীরে ধীরে বাড়াতে বাড়াতে ৬-৭ ঘণ্টা রোদ পাওয়ার ব্যবস্থা করলে গোলাপের ফলন ভালো হবে। পানি সেচের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে গাছের গোড়ায় পানি দাঁড়িয়ে না থাকে। কচি পাতা ও কুঁড়ি ছাড়ার সময় পানি বেশি প্রয়োজন হয়ে থাকে। এ সময় সকাল সন্ধ্যা সেচ দেওয়া উচিত। ঝাঁঝরি দিয়ে ডালপালাসহ সমস্ত গাছটিই পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে।

সার প্রয়োগঃ

টব বসাবার ১ মাস পর থেকে ১৫-৩০ দিন অন্তর অন্তর সার দিতে হবে। শীতের ঠিক পরেই অর্থাৎ মার্চের শেষে বা এপ্রিলের প্রথম দিকে টবের উপরের ৮/১০ সেমি মাটির স্তর তুলে দিয়ে খালি জায়গায় পচা গোবর সার ও নতুন ফাঁপা মাটি দিয়ে ভরে দিতে হবে। এর পর খড় বা পাতা দিয়ে ঢেকে গ্রীষ্মের প্রখর রোদ থেকে গাছের শিকড়কে রক্ষা করতে হবে। শীতকালে গাছ ছাটার পর, প্রতি টবে ৩ মুঠা গুঁড়া গোবর সার ও ১ মুঠা স্টিমড হাড়ের গুঁড়া বা স্টেরামিল প্রয়োগ করিতে হইবে। পরবর্তীতে পুরো শীতকালে ১ মাস পর পর ১ মুঠা করে স্টিমড্ বোন মিল বা স্টেরামিল প্রয়োগ করতে হবে।গোলাপ গাছে বেশি ফুল উৎপাদনের জন্য পাতার সার ও ফলিয়ার স্প্রেজনপ্রিয়। 

চুন-পানি প্রয়োগঃ

প্রতি লিটার পানিতে ১ চামচ গুড়ো চুন পরিস্কার পানিতে ভালোভাবে গুলে পাতলা ন্যাকড়ায় ছেঁকে প্রতি ৩ মাস পর পর দিতে হয়। চুন-পানি দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে অন্য কোন সার না দিয়ে শুধু পানি দিতে হবে।

রোগ-পোকা দমনঃ

শুঁয়ো পোকা বা অনিষ্টকারী অন্য যে কোন পোকা দেখা মাত্র ধরে মেরে ফেলতে হবে। লাল মাকড়সার আক্রমণ ও ডাইব্যাক রোগই বেশ মারাত্মক। গোলাপ গাছের নানা অংশ কালো হয়ে মরে যাওয়া। এ রোগটিকেই ডাইব্যাক বলে। গাছের রোগাক্রান্ত অংশটি কেটে ফেলে ডাইথেন এম-৪৫ ২ গ্রাম/ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

পরিচর্যাঃ

মৃত ও রোগআক্রান্ত ডাল অপসারনের জন্য, গাছের উপযুক্ত আকৃতি প্রদানের জন্য, প্রতিটি ডালে ফুল আসার জন্য এবং প্রয়োজনীয় রোদ্র পাওয়ার জন্য নিয়মিত গাছ ছাটাই করতে হয়। গোলাপ হলো প্রচুর শাখা বিস্তারকারী গুল্ম জাতীয় গাছ। গাছের ফুল দেওয়া শেষ হলেই গাছ ছেঁটে দিতে হবে। নিয়মিত গাছ ছাঁটাই করলে বেশি ও বড় আকারের ফুল পাওয়া যায়। 

গাছ ছাঁটাইয়ের পর ডাইব্যাক রোগের আক্রমণ হতে পারে। সুতরাং গাছ ছাঁটাইয়ের আগে ও পরে কীটনাশক ও ছত্রাক নাশক দুটোই প্রয়োগ করতে হবে।

আরও পড়ুন - জানুন কলমি শাকের উপকারিতা ও চাষ পদ্ধতি (Water Spinach Cultivation)

English Summary: Cultivation of roses in pen method through proper care

আপনার সমর্থন প্রদর্শন করুন

প্রিয় অনুগ্রাহক, আমাদের পাঠক হওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার মতো পাঠকরা আমাদের কৃষি সাংবাদিকতা অগ্রগমনের অনুপ্রেরণা। গ্রামীণ ভারতের প্রতিটি কোণে কৃষক এবং অন্যান্য সকলের কাছে মানসম্পন্ন কৃষি সংবাদ বিতরণের জন্যে আমাদের আপনার সমর্থন দরকার। আপনার প্রতিটি অবদান আমাদের ভবিষ্যতের জন্য মূল্যবান।

এখনই অবদান রাখুন (Contribute Now)

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.