ঔষধি উদ্ভিদ তুলসীর চাষ

KJ Staff
KJ Staff

ভারতে বহু শতাব্দী ধরে তুলসী গাছের চাষ করা হয়। “লামিয়াসিয়া” পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই উদ্ভিদটির একাধিক ব্যবহারের জন্য অনেকেই এর চাষ করে থাকেন। লবঙ্গ তেলের তুলনায় তুলসীর তেলে ৭০ শতাংশ ইউজেনল রয়েছে। তুলসীর বেশ কয়েকটি ঔষধি গুণও রয়েছে।

তুলসীর চাষাবাদ -

কৃষকদের জন্য ফার্মাকোলজিকাল বা ঔষধি উদ্ভিদের চাষ খুব উপকারী। ভারতের অনেক রাজ্যের কৃষকরা  ঔষধি উদ্ভিদ চাষ করে ভাল উপার্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। তুলসীর মতো ঔষধি গাছের আবাদের সুবিধা হ'ল, এর চাষে স্বল্প সময় এবং কম খরচে ভাল লাভ করা যায়। মাত্র ৩ মাসে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা বিনিয়োগ করে আপনি ৩-৪ লক্ষ টাকা উপার্জন করতে পারবেন। সুতরাং, এটি অর্থ উপার্জনের একটি দুর্দান্ত উপায়।

বীজ রোপণের সময়কাল -

এই উদ্ভিদের ঔষধি বৈশিষ্ট্যগুলির কারণে, বাজারে এর যথেষ্টই চাহিদা রয়েছে। তুলসী এপ্রিল ও মে মাসে রোপণ করা হয়। বীজ বপনের জন্য এক হেক্টর (আড়াই একর) জমিতে প্রায় ১০ কেজি বীজ প্রয়োজন। এই উদ্ভিদে কোনও বড় ধরনের রোগের প্রকোপ দেখা যায় না।

ব্যয়ের পরিমাণ -

তুলসী চাষ শুরু করার জন্য আপনার বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে না। এক হেক্টরের জন্য প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন, তবে আগাছা, সেচ ইত্যাদির খরচ ভিন্ন।

আয়ের পরিমাণ -

তুলসীর উদ্ভিদ থেকে দু ধরণের পণ্য পাওয়া যায়, বীজ এবং পাতা। যদি তুলসীর বীজ সরাসরি বাজারে বিক্রি করা যায়, তবে বীজের দাম প্রতি কেজি প্রায় দেড়শ থেকে ২০০ টাকা এবং এর তেলের দাম প্রতি কেজি প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। সুতরাং, এই উদ্ভিদের চাষ করে সহজেই লক্ষাধিক আপনি উপার্জন করতে পারবেন।

মৃত্তিকা -

উন্নত অভ্যন্তরীণ নিকাশযুক্ত সমৃদ্ধ বেলে দোআঁশ মাটি এই উদ্ভিদের চাষের জন্য উপযুক্ত। উচ্চ ক্ষারীয়, লবণাক্ত এবং জলাবদ্ধ জমি একেবারেই এর জন্য অনুপযুক্ত। ভাল জৈব পদার্থযুক্ত মাটিতে এই উদ্ভিদের দ্রুত বৃদ্ধি হয়। মাটির পিএইচ ৫.৫-৭ এর বিকাশের জন্য আদর্শ।

তুলসীর প্রকার -

কৃষ্ণ তুলসী - ভারতের প্রায় সব অঞ্চলে পাওয়া যায়। এই জাতের তুলসীর পাতা বেগুনি বর্ণের হয়। কৃষ্ণ তুলসী ভিটামিন এ, ভিটামিন কে এবং বিটা ক্যারোটিন সমৃদ্ধ। এটি ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাসিয়াম এবং ভিটামিন সি এর মূল্যবান উত্স প্রদান করে। এই জাতের তুলসীর তেল, মশার প্রতিরোধক এবং ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

দ্রুদ্রিহা তুলসী: - মূলত বাংলা, নেপাল, চট্টগ্রাম এবং মহারাষ্ট্র অঞ্চলে দেখা যায়। এই জাতের তুলসী গলার সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। এছাড়া হাত ও পা ফোলা এবং বাতজনিত অসুখ নিরাময় করে।

রাম/ কালী তুলসী - চীন, ব্রাজিল, পূর্ব নেপালের পাশাপাশি বাংলা, বিহার,  চট্টগ্রাম এবং ভারতের দক্ষিণ রাজ্যে পাওয়া যায়। এই উদ্ভিদের কান্ড বেগুনি ও পাতা সবুজ বর্ণের এবং সুগন্ধযুক্ত হয়। এর ঔষধি বৈশিষ্ট্য উচ্চতর – এই জাতটি অ্যাডাপটোজেনিক, অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

বাবি তুলসী: পাঞ্জাব থেকে ত্রিভান্দ্রমে এবং বাংলা ও বিহারেও পাওয়া যায়। গাছের উচ্চতা ১-২ ফুট লম্বা, পাতা ১-২ ইঞ্চি লম্বা, ডিম্বাকৃতি এবং সূচাগ্র। এর স্বাদ লবঙ্গের মতো, এটি শাকসবজিতে স্বাদ আনতে ব্যবহৃত হয়।

টুকাশ্মিয়া তুলসী: ভারত এবং পারস্যের পশ্চিমাঞ্চলগুলিতে পাওয়া যায়। এটি গলার ব্যাধি, অ্যাসিডিটি এবং কুষ্ঠরোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়।

অমৃতা তুলসী: - সমগ্র ভারতে পাওয়া যায়। ঘন গুল্মযুক্ত এই জাতের তুলসীর পাতা গাঢ় বেগুনি বর্ণের হয়। এটি ক্যান্সার, হৃদরোগ, বাত, ডায়াবেটিস এবং স্মৃতিভ্রংশ ইত্যাদি চিকিত্সায় ব্যবহৃত হয়।

বন তুলসী - ভারতের হিমালয় ও সমভূমিতে পাওয়া যায়। গাছের উচ্চতা অন্যান্য জাতের চেয়ে লম্বা। এটির স্বাস্থ্য উপকারিতা অনেক, স্ট্রেস উপশম করে, ইমিউন সিস্টেমকে উদ্দীপিত করে এবং পেটের আলসার প্রতিরোধে সহায়তা করে। পাতাগুলি সুগন্ধযুক্ত, এর ঘ্রাণ এবং স্বাদ লবঙ্গের মতো।

কাপুর তুলসী - মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মায়, তবে প্রাচীন কাল থেকেই ভারতেও এর চাষ হয়। এটি মূলত নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুতে জন্মায়। এর শুকনো পাতা চা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

চাষের জমি প্রস্তুতি –

তুলসীর আবাদ করার জন্য, শুকানো মাটি প্রয়োজন। জমিতে ভালো করে লাঙল দিয়ে কর্ষণের পরে এফওয়াইএম ভালভাবে মাটিতে মেশাতে হবে। তুলসীর প্রতিস্থাপন সূক্ষ্ম বীজতলায় করা হয়।

বপনের সময় –

ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে নার্সারি বেড প্রস্তুত করতে হবে।

বীজ বপন - এর বৃদ্ধির জন্যে ৪.৫ x ১.০ x ০.২ মিটার আকারের বীজতলা তৈরি করুন। ২ সেমি গভীরতায় এবং ৬০ সেমি. দূরত্বে বীজ বপন করতে হবে। বীজ বপনের ৬-৭ সপ্তাহ পরে জমিতে ফসল রোপণ করা হয়। তুলসী আবাদে একর প্রতি ১২০ গ্রাম হারে বীজ ব্যবহার করুন। বীজ বপন করার আগে মাটিবাহিত রোগ ও পোকার হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য মানকোজেব ৫ গ্রাম/কেজি প্রয়োগ করতে হবে।

নার্সারি ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপ্ল্যান্টিং -

বপনের আগে ভাল ফলনের জন্য মাটিতে ১৫ টন এফওয়াইএম মিশিয়ে নিন। সুবিধাজনক জায়গা সহ প্রস্তুত বেডে তুলসী বীজ বপন করুন। বর্ষার  8 সপ্তাহ আগে বেডে বীজ বপন করা হয়। বীজগুলি ২ সেমি গভীরতায় বপনের পরে, এফওয়াইএম এবং শুকনো মাটির স্তর বীজের উপরে ছড়িয়ে দিন। স্প্রিঙ্কলার সেচ প্রদান করতে হবে।

চারা রোপণের ১৫-২০ দিন আগে প্রতিস্থাপনের জন্য ২% ইউরিয়া দ্রবণ প্রয়োগ করলে স্বাস্থ্যকর চারা উৎপন্ন হবে। রোপণ এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে করা হয় যখন চারাগুলি ৬ সপ্তাহের হয় এবং চারাগুলিতে ৪-৫ টি পাতা থাকে।

সারের প্রয়োজনীয়তা (কেজি/একর) -

ইউরিয়া

এসএসপি

মিউরেট অফ পটাশ

১০৪

১৫০

৪০

 

পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা (কেজি/একর) -

নাইট্রোজেন

ফসফরাস

পটাশ

৪৮

২৪

২৪

জমি প্রস্তুতির সময়, এফওয়াইএম অর্থাৎ ফার্মমিয়ার সার মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে প্রয়োগ করুন এবং ইউরিয়া ১০৪ কেজি, মি.অ.প ৪০ কেজি এবং এসএসপি  1 কেজি / একর হারে নাইট্রোজেন ৪৮ কেজি এবং পটাশ ২৪ কেজি এবং ফসফরাস ২৪ কেজি / একর হারে প্রয়োগ করতে হবে। নাইট্রোজেনের অর্ধেক ডোজ এবং ফসফেট পেন্টক্সাইডের সম্পূর্ণ ডোজ প্রতিস্থাপনের সময় প্রয়োগ করুন। নাইট্রোজেনের অবশিষ্ট ডোজ বিভক্তভাবে ২ টি ভাগে প্রয়োগ করা হয়।

আগাছা নিয়ন্ত্রণ -

জমিকে আগাছা থেকে মুক্ত রাখতে হবে, আগাছা যদি অনিয়ন্ত্রিত থাকে তবে তা ফসলের বৃদ্ধি হ্রাস করবে। প্রথমদিকে প্রথম চার সপ্তাহ পরে অর্থাৎ রোপণের এক মাস পরে আগাছা নিড়াতে হবে। পরে দুই মাস পর নিড়াতে হবে।

সেচ-

গ্রীষ্মে, প্রতি মাসে ৩ বার সেচ প্রয়োগ করুন এবং বর্ষাকালে কোনও সেচের প্রয়োজন হয় না। এক বছরে ১২-১৫ সেচ দিতে হবে। চারা রোপণের পরে প্রথম সেচ এবং তারপরে চারা স্থাপনের সময় দ্বিতীয় সেচ দেওয়া উচিত। এরপরে ঋতু নির্ভর করে সেচ দিতে হবে।

চারা গাছের সুরক্ষা

কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ -

লিফ রোলার: - শুঁয়োপোকা পাতা, কুঁড়ি আক্রমণ করে। তারা পাতার পৃষ্ঠকে রোল করে দেয়। লিফ রোলার নিয়ন্ত্রণ করতে, প্রতি একরে ১৫০ লিটার জলে ৩০০ মিলি কুইনালফোস দিয়ে স্প্রে করুন।

তুলসী লেস উইং: - এই কীট পাতা ভক্ষণ করে। প্রাথমিক পর্যায়ে পাতাগুলি কুঁকড়ে যায় এবং তারপরে পুরো গাছটি শুকিয়ে যায়। এর নিয়ন্ত্রণে, আজাদিরচটিন ১০,০০০ পিপিএম ৫ এমএল / লিটার জল- এ মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

রোগ নিয়ন্ত্রণ -

পাউডারি মিলডিউ: - ছত্রাকের সংক্রমণে পাতায় সাদা গুঁড়া দাগ দেখা যায় এবং এটি উদ্ভিদের বিস্তৃত অংশকে প্রভাবিত করে। এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে ম্যানকোজেব গ্রা /লি. জলের সাথে স্প্রে করুন

সিডলিং ব্লাইট - এটি একটি ছত্রাকের সংক্রমণ, যাতে বীজ বা চারা মারা যায়। এর নিয়ন্ত্রণ করতে, ফাইটো-স্যানিটারি পদ্ধতিটি পরিচালনা করুন।

রুট পচা: নিকাশী ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে গাছের শিকড় পচে যায়। এটি পরিচালিত ফাইটোস্যান্টারি পদ্ধতি দ্বারাও প্রতিরোধ পেতে পারে। সিভিডিং ব্লাইট এবং রুট পচা উভয়ই বাভিস্টিন ১% দিয়ে নার্সারি বেড ভিজিয়ে প্রতিরোধ করা হয়।

ফসল সংগ্রহ -

চারা রোপণের ৩ মাস পরে ফলন শুরু হয়। ফুল ফোটার সময়কালে ফসল সংগ্রহ করা হয়। শাখাগুলির  পুনর্জন্মের জন্য গাছটি মাটির উপরে কমপক্ষে ১৫ সেমি উপরে থাকতে হবে। সংগ্রহের পর সতেজ পাতাগুলি ব্যবহার করা হয় বা এটি ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য শুকনো হয়।

ফসল সংগ্রহ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা -

ফসল কাটার পরে পাতা শুকানো হয়। তারপরে তুলসী তেল পাওয়ার জন্য বাষ্প পাতন করা হয়। পরিবহণের জন্য এটি এয়ারটাইট ব্যাগে প্যাক করা হয়। পাতা শুকনো জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে। এর থেকে পঞ্চ তুলসী তেল, তুলসী আদা, তুলসী গুঁড়ো, তুলসী চা এবং তুলসী ক্যাপসুলগুলি প্রক্রিয়াজাতকরণের পরে তৈরি করা হয়।

স্বপ্নম সেন (swapnam@krishijagran.com)

Like this article?

Hey! I am KJ Staff. Did you liked this article and have suggestions to improve this article? Mail me your suggestions and feedback.

Share your comments

আমাদের নিউজলেটার অপশনটি সাবস্ক্রাইব করুন আর আপনার আগ্রহের বিষয়গুলি বেছে নিন। আমরা আপনার পছন্দ অনুসারে খবর এবং সর্বশেষ আপডেটগুলি প্রেরণ করব।

Subscribe Newsletters