একটি স্বেচ্ছাসেবীর গল্প

Thursday, 13 September 2018 05:11 PM

আপনি হয়তো তার সাথে না মিশলে বুঝতেই পারবেন না যে তার বয়স মাত্র ১৭ বৎসর। হ্যাঁ, যুবরাজ এমনই একটা চরিত্র যার কিনা সারা বিশ্বের কৃষি সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে, এবং যার মধ্যে আছে প্রবহমান জীবনের সংজ্ঞা বোঝার মতো অদ্ভুত এক ক্ষমতা। বিগত কয়েক বছর ধরে এই কিশোরটি কয়েকটি কৃষক সভার সাথে জোটবদ্ধ হয়ে সম্পূর্ণ স্বইচ্ছায় প্রবহমান কৃষিকে একটি সক্রিয় রূপদান করার অবিরাম চেষ্টা করে চলেছে।

যুবরাজের মধ্যে অদ্ভুত একটি পরিবর্তন আসে ২০১৬ সালের পর থেকে যখন সে গুজরাটে অনুষ্ঠিত একটি বাণিজ্য মেলায় অংশ নেয়, সেটি ছিলো তার জীবনে বড় কোনো মেলা দেখার অভিজ্ঞতা। তারপর থেকেই গ্রাম ও কৃষির প্রতি তার মধ্যে একটা আবেগ তৈরী হয়, এবং সেই অভিজ্ঞতার পর থেকে গ্রাম্য জীবনই তার অনুপ্রেরণা তার শক্তি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের ৭০ ভাগ মানুষ-ই বসবাস করে গ্রামে। ভারতীয় গ্রামের পরিকাঠামো মোটেই একটা মানুষের পক্ষে সুখপ্রদ নয় বা এখনও তারা জীবনধারণের সমস্ত উপযুক্ত সুবিধা পায় না, এমনভাবে আর যাই হোক কোনো মানুষ বছরের পর বছর কাটাতে পারে না। তাই সে শপথ গ্রহণ করেছে যে সে গ্রামের কোনো একজনকে বা কোনো ছোট ছোট কৃষকদের স্ব-ইচ্ছায় সাহায্য করবে। তারপর থেকেই সে ভারতের কেরালা, মহারাষ্ট্র এমনকি ভারতের বাইরে আফ্রিকার উগান্ডাতেও সে ঘুরে বেরিয়েছে শুধু মাত্র হতদরিদ্র কৃষকদের স্বেচ্ছা সাহায্য দেওয়ার জন্য।

যুবরাজ-এর যে কৃষির প্রতি প্রভূত আগ্রহ রয়েছে তা তার কৃষির প্রতি সংবেদনশীলতা দেখলেই বোঝা যায়, যদিও তার পরিবার বিগত কয়েক দশক ধরে কৃষিতে যুক্ত রয়েছে। সমস্ত বিষয়কে পর্যবেক্ষণ করে সে জানিয়েছে যে ভারতীয় চাষিদের যথেষ্ট সম্পদ দিয়ে সুসজ্জিত করতে হবে, তার এই দৃষ্টিভঙ্গী এসেছে বাণিজ্যমেলাতে অংশগ্রহণ করে। এই বাণিজ্য-মেলায় সংগঠকরা বিভিন্ন চাষি ও শ্রমিকদের সংগঠিত করতে পেরেছিলো যারা কিনা কোনোরূপ সুবিধা পেতে অক্ষম, তারা নিজেদেরকে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে নিজেদের মেলে ধরতে পেরেছেন, যাতে যোগদানকারী কৃষক ও শ্রমিকরা কিছু উপার্জন করে নিজেদের দারিদ্র ও নিত্য নৈমিত্তিক সমস্যার সাথে যুঝতে পারে, এবং নিজেদের অনেক বেশী শক্তিশালী করতে পারে ও নিজেদের জীবনকে সুনিয়ন্ত্রিত করতে পারে। তবে, যুবরাজ বলেছে যে কৃষকদের কর্মক্ষম করার পরিবর্তে তাদের যদি সঠিক পরিকাঠামো দিতে পারে তাহলে তা চাষিদের অনেক বেশী সক্ষম করতে পারে।

যুবরাজ বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে চাষিদের বিভিন্ন বিষয়গুলি, তাদের পরিবার, এবং তাদের আয় কীভাবে বাড়ানো যায় বা তাদের সুবিধা ও অসুবিধা সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে। এই বিষয়ে যুবরাজ বলেছে যে আমাদের দেশের কৃষকরা হলো একেকটি সম্পদ, এবং প্রতিটি কৃষকই তাদের এই সামান্য সম্পদ দিয়েই তারা অনেক বৃহত্তর কার্যসিদ্ধি করতে পারছে এবং তার জন্য তারা কোনোরকম কোনো অনুদান পাচ্ছে না। যুবরাজের মতে একটা দেশ তৈরী হয় কৃষিকে কেন্দ্র করে, এছাড়া কোনো কিছু থাকতেই পারে না, এর কারণ হলো যদি কৃষি ঠিক থাকে তাহলে আমাদের দেশ বাঁচতে পারবে। তাই কৃষির ক্ষেত্রে কোনো উন্নয়ন মানেই হল দেশের উন্নয়ন।     

যুবরাজ প্রায়ই তার উদ্যোগের সমস্তটাই চাষিদের দলে দিয়ে চলেছে এবং তাদের প্রয়োজন অনুসারে। সমগ্র গ্রামের আয়সীমাকে পর্যবেক্ষণ করে সে কৃষকদের চাহিদাগুলি বুঝেছে। কৃষকদের উন্নতির জন্য সে তার উদ্যোগে কোনোরূপ খামতি রাখে নি। যুবরাজ সবসময়ই চেষ্টা করে কৃষকদের দলে ভিড়ে তাদের পরিবারের সাথে মিশে তাদের চাহিদাগুলি বোঝা ও তাদের যতখানি সম্ভব সাহায্য করা। এই বিষয়ে সে সবসময়ই কৃষকদের মধ্যে শিক্ষার গুরুত্বের কথা প্রচার করেছে, তার মতে শিক্ষার বিকল্প কিছু থাকতে পারে না কারণ কৃষকদের মধ্যে যতদিন না পর্যন্ত কোনো শিক্ষা প্রসারিত হচ্ছে ততদিন কোনোভাবেই কৃষির গুরুত্ব বাড়তে পারে না, শুধুমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই একমাত্র মানুষ একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আশা করতে পারে। সে লক্ষ্য করেছে যে গুজরাটে যে বৃত্তি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে তা শুধুমাত্র মেয়েদের প্রদান করা হয়, এ বিষয়ে তার বক্তব্য হলো- কেন শুধুই মেয়ে? এবিষয়ে সে তার দলের লোকেদের জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। তার ব্যাখ্যানুসারে এদেশে মেয়েদের পড়াশুনা ছাড়ার সংখ্যা বা শতকরা পরিমাণ অনেকটাই বেশী। অধিকাংশক্ষেত্রে দেখা যায় যদিওবা মেয়েরা উচ্চশিক্ষার যোগ্য তাদের বাবা-মা তাদেরকে পয়সা খরচ করে বাইরে পড়তে পাঠাচ্ছে না কারণ এই ব্যাপারটা তারা বিবেচনাযোগ্য বলে মনেই করে না। ২০১৬ সাল পর্যন্ত আমার কোনো ধারণাই ছিলো না, কিন্তু কী আশ্চর্য! আমি দেখলাম যে এই বৃত্তি শুরু করার পর থেকেই অবিশ্বাস্যভাবে ছাত্রীদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৃত্তির মাধ্যমে তারা তাদের যাতায়াত ও পড়াশুনার খরচ যাতে ভালোভাবে চালাতে পারে সেই দিকটা বেশী করে নজর দেওয়া হচ্ছে। আগে এই বৃত্তি নবম শ্রেণী পর্যন্ত প্রদান করা হত। কিন্তু এখন তা স্নাতক পর্যন্ত প্রদান করা হচ্ছে এবং এই পরিকল্পনা যে অনেকটাই সফল হয়েছে তা ছাত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধির চিত্রতেই সুস্পষ্ট ভাবে প্রতিভাত হয়েছে। যুবরাজ এখন Need Assessments এর দলের সাথে গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষকদের অভাব-অভিযোগ গুলি সংগ্রহ করেছে। তার বক্তব্য হলো এই এসেস্মেন্ট-এর মাধ্যমে কৃষকদের অভাব গুলিকে একসাথে করা যায়, এবং এতে তাদের সমস্যার সমাধান গুলিকে বাছতে সুবিধা হয় এবং সংগঠনের তরফ থেকে যতদূর সম্ভব মেটানোর একটা প্রচেষ্টা করা হয়। এই Need Assessment দলে যে কোনো স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারে কারণ এই দলটি একটি সংগঠিত সামাজিক দায়িত্ব বহন করে থাকে। যুবরাজের মতে কোনো মানুষকে তার সমস্যাগুলিকে ধরিয়ে দিলেই হলো না তাঁকে সেই সমস্যাকে জয় করে ওঠার ক্ষমতা প্রদানের জন্য যথেষ্ট সহযোগীতা করতে হবে এবং এটাই আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একমাত্র অস্ত্র।

যুবরাজ আগে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলিতে কাজ করতো বর্তমানে সে fair Trade Certified farmer Organisations-এর সাথে যুক্ত আছে, সে সমস্ত চাষিদের এই দলটি একাত্ম করে  একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়ন করতে চাইছে ও ফেয়ার ট্রেড প্রিমিয়ামের সুবিধাকে ব্যবহার করে কৃষকদের উন্নয়নে কাজে লাগাতে চাইছে।

কালো মরিচের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অনেকটা খরচের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, এবং চাষীরা ঠিক করেছে ফেয়ার-ট্রেড প্রিমিয়ামের সুবিধা লাভ করে এই বিষয়টিকে একটি সুবিধাজনক অবস্থায় নিয়ে আসতে। পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসারে সদস্য চাষিদের মধ্যে নতুন করে কালো মরিচের চারা বিতরণ করা হয়েছে। কেরালার ইদুক্কিতেও এই চারা বিতরণ করা হয়েছে। যুবরাজ এই দলে অংশগ্রহণ করেছে এবং চারা বণ্টনের কাজে হাত লাগিয়েছে, তাছাড়া মাটিতে চারা বসানোর কাজেও চাষিদের মদত করেছে। সে বলেছে, চাষিদের চাষের কাজে সুবিধা দেওয়ার জন্য ছোট ছোট কিছু যন্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে এবং তাদের ফসল রাখবার জন্য কিছু বাক্সও প্রদান করা হয়েছে, এছাড়া ফসল ঝাড়াই মারাই ও শুকোনোর কাজে ব্যবহার করার জন্যও একটা বড় কাপড়ের ক্যানভাস প্রদান করা হয়েছে। ইদুক্কিতে পরিদর্শনকালে সে একটি পুকুর কাটিয়ে দিয়ে আসে যাতে প্রায় আড়াই লক্ষ থেকে তিন লক্ষ লিটার জল ধরে, যাতে সেচ কার্যের জন্য বৃষ্টির জল ধরে রাখা যায়। যুবরাজ সেখানে দেখতে পায় যে কৃষকরা সেখানে খুব সুন্দরভাবে একটা দলবদ্ধ পরিকল্পনা করে রাখছে জল সংরক্ষণ-এর জন্য। সে সেখানকার কৃষকদের এটা বিশ্বাস করতে দেখেছে যে রাসায়নিক মুক্ত চাষবাস কৃষির স্থায়িত্ব বহুগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে।

এই বিশাল অভিজ্ঞতা থেকে যুবরাজ বুঝতে পারে যে ফেয়ার-ট্রেড কীভাবে একটা কৃষকের জীবনকে ও কাজ করার উদ্যমকে জাগরিত করতে পারে। সে তাই প্রতিনিয়ত কেরালা ও গুজরাটে কর্মরত দলগুলির সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছে। সে কৃষকদের জৈব ও স্থায়ী চাষবাসের ক্ষেত্রে কৃষকদের উৎসাহিত করে চলেছে এবং কৃষিজ বর্জ্য দিয়ে কীকরে সার উৎপাদন  ও ব্যবহার করা যায় সেই নিয়েও যথেষ্ট উদ্যোগের সাথে কৃষকদের বুঝিয়ে চলেছে।

যুবরাজ ফেয়ার ট্রেড-এর কার্যকারিতার সাথে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়েছে, এবং কৃষির স্থায়িত্ব ও উন্নয়নের সাথে নিজেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত করেছে। সে আরও এমন কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী দল গঠনের ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছে। বিভিন্ন NGO গুলিকে সে ধীরে ধীরে নিজের আওতায় আনার চেষ্টা করছে যারা কৃষি সমস্যা ও সমাধান মিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। সে সরকারি বেসরকারি সমস্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে একজোটে কাজ করতে চাইছে যাতে সামাজিক থেকে প্রান্তীয় চাষের ধারণাকে উৎখাত করে দলবদ্ধ শ্রেণীর সৃষ্টি হয়।

যুবরাজ ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করে যে স্বেচ্ছাসেবায় মানুষের উপকার ও নিজের অভিজ্ঞতা দুটিই একসাথে বৃদ্ধি করা যায়, যার সাহায্যে সে তার উদ্যোগকে দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত করতে পারে। সে চায় প্রতিটি শহুরে কিশোরদের মধ্যে কৃষিকাজের উপর উৎসাহ তৈরী হোক যাতে তাদের স্বেচ্ছাশ্রমে একজন কৃষক ও তার পরিবারের উন্নতি হোক। তার মতে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমগুলির মাধ্যমে আমাদের ছড়িয়ে পড়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং এর সাহায্যেই আমাদের বাস্তবকে খুঁজে নিতে হবে, আমরা ভবিষ্যতের তাই পাবো যা আমরা আজকে তৈরী করতে পারব।    

- প্রদীপ পাল       

Share your comments



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online


Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.