দক্ষিন এশিয়ায় এগ্রি-হর্টি সমাবেশে জমজমাট তিনদিনের এগ্রিটেকনিকা

Monday, 01 January 0001 12:00 AM

বিগত ২২ থেকে ২৪ শে আগস্ট থাইল্যান্ডে তিন দিন ব্যাপী এগ্রিটেকনিকা এশিয়া এবং হর্টি এশিয়াতে কৃষকদের কৃষিতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার ও এর প্রয়োগ প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রবহমান  কৃষিতে পরিবর্তন নিয়ে আসা, এবং এই উদ্দেশ্যটাই বার বার সমস্ত যোগদানকারী প্রতিনিধিদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রতিভাত হয়েছে। এই তিনদিন সমগ্র এশিয় ও ইউরোপীয় কৃষিযন্ত্র বিপণন সংস্থার প্রতিনিধিরা ব্যাংকক এসে জমায়েত হয়েছিলো দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি-অগ্রগতিকে অনেকটা ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে। নতুন নতুন কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন, মানুষ ও প্রযুক্তির সম্পর্ক সম্বন্ধে এই দুই বাণিজ্য মেলা ও একটি বৃহৎ আলোচনা সভা একটাই লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অগ্রসর হয়েছে যে আগামীদিনে মুক্ত-জমিতে অথবা বাগিচা জমিতে কীভাবে ফসল চাষ করা হবে, যাতে মানুষ অনেক স্বল্প শ্রমের খরচে অনেক বেশী উৎপাদন পায়। পরিবেশের পদক্ষেপণকে মাথায় রেখে, তার ক্ষতি না করে, কীভাবে শস্য সুরক্ষা করা যায় সেই বিষয়ে ইউনাইটেড নেশন্সের তরফ থেকে বেশ কয়েকটি বক্তব্য পেশ করা হয়, যার মাধ্যমে শিল্পের ব্যপকতা ও বিশ্ব-পরিবেশের ক্ষতির ব্যাপারটিকে বার বার প্রতিফলিত করা হয়েছে।

২২শে আগস্ট থেকে শুরু করে তিনদিন ব্যাপী সাফল্যের শিখরে আরোহণ করে ২৪শে আগস্ট এই বানিজ্যমেলার পরিসমাপ্তি ঘটে। ব্যাংকক্‌ শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত BITEC Centre এ এই মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়।

যখন হর্টি এশিয়া প্রাঙ্গণে স্মার্ট হর্টিকালচার সম্বন্ধে বিভিন্ন উৎপাদকদের বোঝানো হয়, সেখানে এগ্রিটেকনিকা এশিয়াতে কৃষক, উৎপাদক ও কৃষিজগতের সাথে সম্পর্কীত ব্যক্তিবর্গকে বোঝানো হচ্ছিলো উদ্ভাবনী কৃষি-যন্ত্রের মাধ্যমে কীভাবে এই নগরায়নের যুগে যন্ত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন ক্ষমতা ও কৃষির প্রবহমানতা সুষ্ঠুভাবে বজায় রাখা সম্ভব। বিশ্বের ২৯ টি দেশের প্রায় ৩০০ টি অগ্রগণ্য কোম্পানি এর সাথে চিন, ফিনল্যান্ড, জার্মানী, জাপান, সাউথ কোরিয়া, তাইওয়ান, নেদারল্যান্ডের মতো উন্নত দেশের প্যাভিলিয়ন নিয়ে প্রায় ১১০০০ বর্গমিটার স্থান জুড়ে তৈরী হয় এই বিশাল মেলাপ্রাঙ্গণ। বিভিন্ন দেশের প্রায় ১০,০০০-এরও বেশী কৃষি উদ্ভাবক, সমালোচক, ও কৃষি উন্নয়ন দার্শনিকরা এই মেলায় তাদের প্রত্যক্ষ মতামত প্রদানের জন্য আমন্ত্রিত হয়েছিলেন যারা নিজের দেশের সাথে সাথে অন্যান্য দেশের কৃষি উন্নয়নের বিষয়ের মেলবন্ধন ঘটিয়ে  এই দেশের কৃষি উন্নয়নের উপদেশ দেন। তারা নিজের দেশের কৃষি উন্নয়নের বিষয়কে মেলে ধরে উদাহরণস্বরূপ অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলিকে কৃষি উন্নয়নের অনুপ্রেরণা যোগান। VNU-এশিয়া প্যাসিফিক কোম্পানি এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর মিঃ টন ওটেন এর মতে এই দুই বাণিজ্য মেলাই ভবিষ্যৎ প্রবহমান কৃষির ক্ষেত্রে যথেষ্ট উৎসর্গীকরণ ও অবদান রেখেছে এবং দুই ক্ষেত্রেই তারা এই বার্তাই দিয়েছে যে তাদের কৃষি ও শিল্পের সাথে সংযোগ রেখেই এমন কঠিন বাস্তবের সাথে লড়াই করে জিততে হবে। এর কারণ, তিনি বুঝতে পেরেছেন দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর খাদ্যের ঝুড়ি হতে পারে যদি পরিকল্পনামাফিক কাজ করা সম্ভব হয়।

এগ্রিটেকনিকা এশিয়া ও হর্টি-এশিয়া এর সহ-উদ্যোক্তা হিসেবে থাইল্যান্ডের এগ্রিকালচার ও কো-অপারেটিভ মন্ত্রকের এর স্থায়ী সম্পাদক, দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ কৃষি ও উদ্যানপালন সংক্রান্ত এই মুক্ত মেলার আয়োজন করেছেন। থাইল্যান্ডের এগ্রিকালচার ও কো-অপারেটিভ দের অন্তর্গত বিভিন্ন সরকারি এজেন্সি যেমন-ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন (DOAE), ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার (DOA), এবং কো-অপারেটিভস প্রোমোশন ডিপার্টমেন্ট (CPD) ইত্যাদি আরও বিভিন্ন সংস্থা সাহায্যে এই মেলা সম্পাদন সম্ভব হয়েছে। তারা এই ব্যাপারে দৃঢ প্রতিজ্ঞ যে এই উদ্যোগ তাদের থাইল্যান্ডের কৃষিকে অনেক বেশী অনুপ্রাণিত করবে। তাদের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে সাউথ এশিয়াতে একটি এগ্রিকালচারাল হাব গড়তে হবে এবং সমস্ত পৃথিবীতে গুণগতমানের কৃষি পণ্য সরবরাহ করতে হলে তাদের এই হাব গড়তেই হত, আজ তারা এই বিষয়ে কিছুটা এগিয়ে গেল। এই সুযোগ থাইল্যান্ডের সমস্ত কৃষক ও উৎপাদকদের মধ্যে যথেষ্ট আলোড়ণ সৃষ্টি করতে পেরেছে। চাষীরা সারা বিশ্বের তথ্য ও প্রযুক্তির বিষয়ে অনেক কিছুই জানতে পেরেছে এবং এই সব বিষয়ে তারা অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের মাধ্যমে তারা তাদের দক্ষতা ও উৎপাদন দুই বৃদ্ধি করতে পারবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

থাইল্যান্ডের এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশনের ডিরেক্টর জেনারেল মিঃ সোমচাই কার্নারংকুল এর মতে এগ্রিটেকনিকা এশিয়া ও হর্টি এশিয়া হল এমন একটি মঞ্চ যেখানে সারা বিশ্বের উন্নত কৃষিপ্রযুক্তির ও উন্নত জ্ঞানের আদান প্রদান হয়েছে। তাঁর মতে সাধারণ কৃষকরা আধুনিক কৃষকে পরিণত হতে পারছে নতুন নতুন উদ্ভাবনী ও উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগের ফলে, যেখানে অনেক শ্রমিকের অভাব রয়েছে। এই দুইটি উদ্যোগ কৃষির উন্নতিতে সাহায্য করবে এটা বলাই বাহুল্য, এই কারণেই এই মেলার সহ-উদ্যোগে তারা খুবই গর্ব অনুভব করছে।

এই প্রথম থাই সরকারের সহযোগী বিভিন্ন সংস্থা ও এজেন্সির উদ্যোগে এই দুই বৃহৎ উদ্যোগ গ্রহণে সক্ষম হয়েছে।  থাইল্যান্ডের এক্সিবিশন ডিপার্টমেন্ট, থাইল্যান্ড কনভেনশন এন্ড এক্সিবিশন ব্যুরো এর ডিরেক্টর মিঃ কানকপর্ন দামর্ঙ্কুল মন্তব্য করেছেন হর্টি এশিয়া ও এগ্রিটেকনিসিয়ার ক্ষেত্রে TCEB-এর সমর্থন, ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন এবং বাজারজাতকরণ ইত্যাদি এই তিন মুখ্য লক্ষ্য পূরণ করতে হবে, তবেই এই সম্মেলন দক্ষিণ এশিয়ার ব্যবসা বাণিজ্য এমনকি কৃষি বিপণনের ক্ষেত্রে দারুণভাবে সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হবে এবং আগামিদিনে এই মেলা আরও অনেক বড় সাফল্য লাভ করবে বলে তার বিশ্বাস।  

জার্মান এগ্রিকালচারাল সোসাইটির সুপারভাইসরি বোর্ডের চেয়ারম্যান মিঃ পিটার গ্রোথিউস এই দুই মেলার উদ্দেশ্য নিয়ে যথেষ্ট ইতিবাচক মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন এই বছরই এগ্রিটেকনিকা এশিয়া প্রথম অনুষ্ঠিত হলো এবং এটা আর মেলা নয়, একটা গোটা আঞ্চলিক গন-সম্মেলনের আকার ধারণ করেছে। এই মঞ্চ বিভিন্ন দেশের কৃষি উদ্ভাবক,ও প্রযুক্তিবিদ্‌দের এক ছাতার তলায় একত্রিত করতে পেরেছে বলে তাঁর ভালো লাগছে। এখানে প্রতিটি দেশ তাদের স্বকীয় প্রযুক্তি, কৃষি উদ্ভাবন, কৃষি উৎপাদনের ভবিষ্যৎ, বিভিন্ন কৃষি-উন্নয়ন ও পরিবেশ উন্নয়ন মতবাদের উপস্থাপন করতে পেরেছে এবং তাও অনেকটাই স্বাধীনভাবে, এবং সবথেকে বড় প্রাপ্তি হলো এই বিশাল অঞ্চলের মানুষ এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে যেটা এই অনুষ্ঠানের সাফল্যের পেছনে একটি বড় প্রাপ্তি। এই অঞ্চলের অনেক মানুষ আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যাপারে অনেকবেশী অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পেরেছে।

এগ্রিটেকনিকা এশিয়া ও হর্টি এশিয়ার যুগ্ম সংগঠক হল জার্মান এগ্রিকালচারাল সোসাইটি এবং VNUএক্সিবিশন্স এশিয়া প্যাসিফিক কোম্পানি লিমিটেড, সহ-উদ্যোক্তা হিসেবে ছিলেন থাই কৃষি ও সমবায় মন্ত্রক, তাছাড়া থাই সরকারের অধীনে দ্য ডিপার্টমেন্ট অব্‌ এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন (DOAE) এবং দ্য ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার (DOA). এই বাণিজ্য মেলার সমর্থক ছিলেন দ্য ফেডারেল মিনিস্ট্রি অফ ফুড এন্ড এগ্রিকালচার এন্ড দ্য থাইল্যান্ড কনভেনশন এন্ড এক্সিবিশন ব্যুরো (TCEB)।

 

এই উদ্যোগের কতকগুলি বৈশিষ্ট্যঃ

১। ২৯ টি বিভিন্ন দেশের মধ্যে কৃষি প্রযুক্তির বিনিময়

২। চিন, ফিনল্যান্ড, জার্মানী, জাপান, সাউথ কোরিয়া, তাইওয়ান, ও নেদারল্যান্ডস্‌

৩। ২০টি দেশের ৫২ টি সংগঠনের ১৩৮ জন বক্তা

৪। এগ্রিফিউচার ফোরাম ও DLG ফোরামঃ কৃষি ও উদ্যানপালনের ক্ষেত্রে সর্বোৎকৃষ্ট অনুশীলন

৫। ইন্টারন্যাশানাল রাইস রিসার্চ সেন্টারের দ্বারা পরিচালিত ধানের প্রিসিশন ফার্মিং এর জন্য অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা।

৬। ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর হর্টিকালচারাল সায়েন্সের দ্বারা পরিচালিত বিশ্বমানের হর্টিকালচারের আলোচনা সভা।

৭। রিজিওনাল কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচারাল মেশিনারি এসোসিয়েশন ইন এশিয়া এন্ড দ্য প্যাসিফিক দ্বারা পরিচালিত রিজিওনাল ট্রেড এন্ড ইনভেস্টমেন্ট অব্‌ এগ্রিকালচারাল মেশিনারির আলোচনা সভা।

৮। ইনডোর কালটিভেশন এর ক্ষেত্রে গ্রীণহাউস ও আর্বান ফার্মিং এর আলোচনা সভা

৯। কৃষি যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে গৃহীত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থা সম্পর্কিত আলোচনা সভা।     

 

তথ্য সুত্র - মনিকা মন্ডল

- প্রদীপ পাল



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online

Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.