১৮ তে ১২ মেলা দেখতে চটজলদি পাড়ি দিন দক্ষিণ ভারতে

Friday, 31 August 2018 12:10 PM

আপনি কখনো কল্পনা করতে পারেন! যে তামিলনাড়ুর পালিভান উপজাতির আদিবাসীরা তাদের বয়স নির্নয় করে একটি ফুলের ফোটার সময়কালের উপর ভিত্তি করে। খুব অদ্ভুত লাগলেও একথা সত্যি যে এই জাতের ফুলটি ১২ বৎসর অন্তর ফোটে। এটা আসলে যেমন তেমন কোনো ফুল নয়, এই প্রজাতির ৪৬ রকমের ফুলের দেখা পাওয়া যায় শুধুমাত্র ভারতেই এবং সারা বিশ্বে এই সংখ্যাটি হলো প্রায় ২৪০ ধরণের। ভারতে, প্রধানত শুধু মাত্র দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, তামিলনাড়ু ও কেরালাতে এই ফুলের দেখা মেলে। মান্নার উপসাগর ও উটি পার্বত্য পরিবেশে এই ফুলের গাছ সবচেয়ে বেশী জন্মায়। এখানকার মানুষের কাছে এই গাছ খুবই পরিচিত এবং যে বছর এখানে ফুল ধরে সমগ্র পার্বত্য অঞ্চল বেগুনী বর্ণ ধারণ করে।

আসলে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার নীলগিরি পর্বতের-এর নাম যে নীলপর্বত রাখা হয়েছে তাঁর প্রধান কারণই হল এই ফুল, দক্ষিণী ভাষায় এই ফুলকে ‘নীলাকুরিঞ্জি’ নামে ডাকা হয়।

২০০৬ সালে প্রচুর পুষ্প প্রস্ফুটিত হবার পর ২০১৪ সালে মান্নার উপসাগরের কাছে প্রচুর ফুল ফুটবে বলে আশা করা হয়েছিলো, আসলে এই পুষ্প প্রজাতির মধ্যেই এমন কিছু গাছ রয়েছে যাদের ফুল অন্যান্য গাছের তুলনায় ৪ বৎসর আগে ফোটে। যাইহোক, কেউ হলফ করে বলতে পারে না যে, এই গাছগুলোই আবার পরেরবার বেঁচে থাকবে কিনা, তবে আগামী বিপুল পরিমাণে পুষ্পের প্রস্ফুটন আশা করা যাচ্ছে ২০১৮ সালে এই একই স্থানে নীলগিরি-পালানিস-মান্নারে।২০০৮ সালের আগস্ট মাসে মান্নার থেকে প্রায় ৩৫ কিমি দূরে থালাক্কুলামে এক শ্রেণীর গাছ আছে যারা কোচি-মাদুরাই জাতীয় সড়কের ধারে পর্বতের উপর প্রচুর ফুল ফুটেছিলো। আগামী ২০২০ সালে এই অঞ্চলেই প্রচুর ফুল ফুটবে বলে আশা করা যাচ্ছে যদি না মানুষের কোনো কাজের জন্য এই অঞ্চলের চারাগাছগুলি ধ্বংস হয়ে যায়।

কুরিঞ্জির ফুল ধরার সময়কাল আসে প্রতি ১২ বৎসর অন্তর একটি পুষ্পপর্যায়ের শেষে। এই ১২ বৎসর অন্তর ফুল ফোটার অবশ্য একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে, সেটি হ’ল এই গাছগুলির মধ্যে একধরণের ‘ইনফ্লোরোসেন্স’ নামক হরমোন রয়েছে, যেটি প্রধানত এদের ফুল ফুটতে দেয় না, এই হরমোনের প্রভাব এতটাই বেশী যে এদের সামান্য নির্যাস বায়ুর মাধ্যমে অন্য ফুলগুলিতে ছড়িয়ে পড়লে সেই গাছেরও ফুল আসে না। ১২ বৎসর অন্তর এই হরমোনের প্রভাব কমে গেলেই এই জাতের উদ্ভিদরা পুষ্পবতী হয়ে ওঠে।

আবার অনেকের মতে এটা সঠিক ধারণা নয়, আসল ব্যাপারটা হয়তো অনেকেরই অজানা, তবে এই ১২ বৎসর অন্তর একবার ফুল ফোটার পেছনে আরেকটি ব্যাখ্যা আছে। কুরিঞ্জি ফুলের সম্বন্ধে যে সব কাহিনী রয়েছে সেই সব কাহিনীতে এই ফুলের পুষ্প পর্যায় লেখা আছে ১৮০ বৎসর। এরপর বোম্বের ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি ১৯৩৬ সালে তাদের ৩৮ নম্বর গবেষণা পত্রে ১৮২৬ থেকে ১৯৩৪ পর্যন্ত গৃহীত দশটি পুষ্পপর্যায়ের গবেষণার দ্বারা প্রাপ্ত ফলাফল লিপিবদ্ধ করে। তামিল ‘সঙ্ঘম’ সাহিত্যে কুরিঞ্জিকে শতবর্ষের ফুল হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এই সাহিত্য ২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৩০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়।

প্লিয়েটিসিয়ালস্‌, স্টরবিল্যান্থস, কুন্থিয়ানুস্‌ এই সমস্ত দীর্ঘসূত্রী ফুল সমূহের উদাহরণ হিসাবে কুরিঞ্জির সমগোত্রীয় বলা যেতে পারে। তবে এদের মধ্যে কুরিঞ্জিই একমাত্র সঠিক ১২ বৎসর অন্তর পুষ্পবতী হয়ে ওঠে। ২০০০ বৎসর আগে রচিত তামিল সাহিত্য ও কবিতায়ও কুরিঞ্জিকে ‘কুরাঙ্গল কুরিঞ্জি’ হিসেবে অভিহিত ও প্রশংসিত করা হয়েছিলো। এই ফুলের পবিত্র ও সুমিষ্ট মকরন্দ সংগ্রহ করতে ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতি ও মৌমাছির আনাগোনা চলতো এমনও উল্লেখ ওই সব কবিতায় পাওয়া যায়। হিন্দু পুরাণে ভগবান মুরুগান একটি স্থানীয় মেয়েকে বিবাহ করার সময় কুরুঞ্জি ফুলের মালা পরিধান করেছেন এমন উল্লেখও পাওয়া যায়। এই অদ্ভুদ ফুল দর্শনের জন্য দলে দলে পর্যটক উটিতে আসে প্রতি ১২ বৎসর অন্তর।

কুরিঞ্জি প্রধানত জন্মায় সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ১৩০০ থেকে ২৪০০ মিটার উঁচুতে। সাধারণত এই গাছের উচ্চতা হয় ৩০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার। যদি অনুকূল পরিবেশ থাকে তবে এই গাছ ১৮০ সেমি পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এই গাছের বেশির ভাগ জাত-ই অদ্ভুদ ধরণের পুষ্পচক্র থাকে। কোনো গাছের বার্ষিক ফুল ফোটে, আবার কোনো জাতের ১২ বছরে একবার বা ১৬ বছরে একবার পুষ্প বিকশিত হয়।

প্রধানত দীর্ঘসূত্রী পুষ্প পর্যায় দেখা যায় স্টবিলেন্থিস কুন্থিয়ানাস (Stobilanthes Kunthianus), যা অ্যাস্প্লিটেসিয়ালস নামে বেশী পরিচিত। এই জাতটির পুষ্পপ্রদায়ী ক্ষমতা সবথেকে বেশী হয়। এই উদ্ভিদে ১৬ বছরে একবার ফুল ধরে তাই এরা ষড়দশবর্ষজীবি সপুষ্পক উদ্ভিদ।

নীলাকুরিঞ্জি জাতটিরও পুষ্পপ্রদায়ি ক্ষমতা অনেক, এদের ১২ বৎসরে একবার ফুল ধরে। এদের পুষ্পবিকাশের সময়কাল জুলাই থেকে ডিসেম্বর। এর মধ্যে সবথেকে বেশী ফুল ফুটতে দেখা যায় আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসে। তবে এই জাতটি তামিলনাড়ুর কোদাইকানাল অঞ্চলে একটু আগে প্রস্ফুটিত হয়। তবে আগে বা পরে যাই হোক এদের সব গাছেরই পুষ্প বিকাশের সময়কাল মোটামুটি একই রকমের হয়ে থাকে, স্থানীয় আবহাওয়ার উপড় এদের পুষ্পবিকাশকাল অনেকটা নির্ভরশীল।

এই অদ্ভুদ পুষ্পপর্যায় সমন্বিত ফুলের বাহার দেখার জন্য আপনাকে যেতে হবে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু ও কেরালার নীলগিরি অঞ্চল। একবারটি দেখেই আসুন না গিয়ে ১৮ তে ১২ এর খেলা।

- প্রদীপ পাল

Share your comments



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online


Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.