ক্ষুদ্র চা চাষের এবং চা শিল্পের ভবিষ্যৎ

Friday, 13 April 2018 01:41 PM

সম্প্রতি পূর্ব আফ্রিকার কেনিয়ার নাইভাসাতে United Nation ভুক্ত Food & Agriculture Organisation (FAO) র ২২তম FAO – IGG (Inter Governmental Group ) র তিন দিন ব্যাপী চা শিল্পের উপর গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। মূলত চা শিল্পের ভবিষ্যৎ বিষয়ক এই সভায় মোট ৯২ জন প্রতিনিধি অংশ নেয়। চা উৎপাদনকারী দেশ গুলির মধ্যে অংশ নেয় চীন, ভারত , কেনিয়া , শ্রীলঙ্কা , জাপান , ইন্দোনেশিয়া , ভিয়েতনাম, তানজেনিয়া , মালয়, বাংলাদেশ, তার্কী এবং চা পানকারী দেশ গুলির মধ্যে ইংল্যান্ড, জর্মানী, কানাডা ও আমেরিকার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। পর্যবেক্ষক (Observer) রূপে International Standards Organization (ISO), আন্তর্জাতিক চা কমিটি (International Tea Committee) এবং Tea and Herbal Institution, Europe র প্রতিনিধিরাও উপস্থত ছিলেন। ক্ষুদ্র চা চাষীদের ভারতবর্ষের একমাত্র কেন্দ্রীয় সংগঠন Confederation of India Small Tea Growers Associations (CISTA) র সভাপতি হওয়ার সুবাদে আমি ১৪ জনের প্রতিনিধি দলে মনোনিত হয়েছিলাম। ভারতবর্ষের ১৪ জন প্রতিনিধি দলে চা পর্ষদ (Tea Board) এর অধ্যক্ষ, কেন্দ্রীয় বানিজ্য দপ্তরের ডিরেক্টর (প্লানটেশন), চা গবেষণা কেন্দ্র (Tea Research Association), UPASI র চা বিজ্ঞানী, উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বৃহৎ চা বাগিচা বনিক সভার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ১৯৪৫ সালে গঠিত FAO, UN অন্তর্ভুক্ত এমন একটি সংস্থা যা মূলত ক্ষুধা, অপুষ্টি দূর করে গ্রামীন অর্থনীতির মূলস্তম্ভ কৃষিকে এবং কৃষকদের (প্রাথমিক উৎপাদক) জীবিকাকে সুস্থায়ী (Sustainable) করে খাদ্য নিরাপত্তাকে (Food Security) সুদৃঢ় করতে সহায়তা করে।

FAO উৎপাদন , সরবরাহ, চাহিদা ভবিষ্যতের বাজার সম্বন্ধে বিভিন্ন চা উৎপাদনকারী ও চা পায়ী দেশগুলির চা বিজ্ঞানী, চা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা গঠিত Inter Governmental Group (IGG) এর সুপারিশ ক্রমে রূপরেখা তৈরী করে এবং মূলত উৎপাদক রাষ্ট্রগুলিকে তা অনুসরন করতে উপদেশ দেয়। চা যদিও ভারতবর্ষে বানিজ্য ও শিল্প দপ্তরের অধীনস্থ, কিন্তু অধিকাংশ চা উৎপাদনকারী দেশে এটি বাগিচা ফসল হিসাবে কৃষি দপ্তরের অধীনে। সারা পৃথিবীতে মোট উৎপাদিত চা-র ৬০% যেহেতু ক্ষুদ্র চা চাষীদের দ্বারা তৈরি হয় এবং চা-র মোট জমির ৭০% ক্ষুদ্র চা চাষীদের অধীনস্থ সেইজন্য FAO, IGG সভায় ক্ষুদ্র চা চাষীদের স্বার্থ রক্ষায় সবচেয়ে বেশী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। নীচে পৃথিবীর প্রথম ৫টি দেশের ২০১৫ সালের চা উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র চা চাষীদের পরিসংখ্যান দেওয়া হল –
FAO চা শিল্পের উন্নতির স্বার্থে – (১)চা চাষে ব্যবহৃত সর্বাধিক রাসায়নিক অবশেষের মাত্রা নির্ধারক ( Maximum Residue Level), (2) বানিজ্য এবং গুণগত মান (Trade and Quality) , (3) জৈব চা ( Organic Tea), (৪) আবহাওয়া পরিবর্তন (Climate Change), (৫) ক্ষুদ্র চা উৎপাদক ( Small Holders) দের উপর কার্য্যকারী গ্রুপ (Working Group) গঠন করেছে। কেনিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় ভবিষ্যৎ বাজার এবং পরিসংখ্যান (Projection and Statistics ) সম্বন্ধে টাস্ক ফোর্স গঠন করে চা-র ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেশ করা হয়। এই রিপোর্টে International Tea Committee, IMF, World Bank এবং Organisation for Economic Cooperation and Development (OECD) সাহায্য নেওয়া হয়েছে।

বর্তমান চা-র বাজার এবং পরবর্তী সময় কী হতে পারে সে সম্বন্ধে FAO র রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতি বছর কালো চা ( Black Tea) উৎপাদন ৩.৭ হারে বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পাওয়া ধরে নিয়ে ২০২৪ তে উৎপাদন
হতে পারে ৪.২৯ মিলিয়ন টন যা মূলত বৃদ্ধি পাবে চীন, ভারত, কেনিয়া ও শ্রীলঙ্কার দৌলতে । বিশ্বজুড়ে সবুজ চা (Green Tea) র বৃদ্ধি হতে পারে ৩.২২ মিলিয়ন টন যা ২০১৪ তে হয়েছে ১.৩৮ মিলিয়ন টন। চীনের নতুন করে চা উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে এই বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রবল। পাশাপাশি এটাও সতর্কীকরণ করা হয়েছে যে বিশ্বজুড়ে বর্তমানে উৎপাদনের বৃদ্ধির গড় হার যদি ৩.৭ % থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫% হয় তবে
২০২৪ গিয়ে চা-র দাম নাটকীয় ভাবে গড়ে USD ১.৭৮ প্রতি কেজিতে নেমে যেতে পারে (২০০৪ সালের চা-র দাম)। আবার যদি ২০২৪ এই উৎপাদন ৫% হ্রাস পায় তবে চা-র দাম USD 3.44 প্রতি কেজিতে বৃদ্ধি পেতে পারে।
সমস্ত উৎপাদনকারী দেশগুলিকে বিশুদ্ধতা পরিমাপক ISO 3720 শংসাপত্র গ্রহনের ( যা খাদ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় ) সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া FAO কাউন্সিলে বিশ্বজুড়ে চা বিক্রি এবং চা পায়ীদের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ দিনে আন্তর্জাতিক চা দিবস ঘোষনার জন্য United Nation এর কাছে স্বীকৃতি জানানো হবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। চা-র বিক্রি বৃদ্ধির জন্য Promotional Campaign এর মাধ্যমে ৪০০ গ্রাম প্রতি ব্যাক্তি চা পায়ী সংখ্যা ধরে সুপরিকল্পিত ভাবে বাজারজাত করার পরিকল্পনা গ্রহনের সুপারিশ করা হয়েছে।

Climate Change বা আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং চা চাষে এর প্রভাব নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে এই সভায়। বিশ্ব জুড়ে আবহাওয়ার পরিবর্তনে উষ্ণতা বৃদ্ধি, ক্ষরার প্রকোপ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, জলবদ্ধতা নতুন নতুন কীটের আগমন ক্রমশ চা চাষকে প্রভাবিত করেছে এবং ফলনে ব্যাপক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে উৎপাদন খরচা বৃদ্ধি করছে। Working Group এই ধারনা প্রকাশ করেছে যে , যে ভাবে আবহাওয়া পরিবর্তন হচ্ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে আসামের বহু জায়গাতেই চা চাষ অনুপযুক্ত ( Vulnerable Region) এলাকা হিসাবে চিহ্নিত হতে পারে । এই সংকটের হাত থেকে বাঁচবার জন্য ক্ষরা প্রতিরোধকারী চা গাছ লাগানো , রাসায়নিক ব্যবহার ক্রমান্বয়ে হ্রাস, জৈব কৃষির প্রচলন, গোবর বা তেল কেকের ব্যবহার, ছায়া গাছের ব্যবহার, চা বর্জ্যর ব্যবহার, সবুজ সার, কেঁচো সার, Integrated Pest Management, জলসেচ, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ এবং ফসলের বৈচিত্রকরণের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এছাড়াও জৈব চা-এর সংশাপত্র (Certification) –র দ্বারা গুণগত মান এবং বিশুদ্ধতা উৎপাদনকারী এবং আমদানীকৃত দেশগুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় সাধনের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জৈব চা উৎপাদনকারী দেশগুলির মধ্যে যুক্তভাবে গবেষণা, উন্নয়ন (Research and Development) এবং তথ্য আদান প্রদানের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ক্ষুদ্র চা উৎপাদকদের বিষয়ে সব দেশের ক্ষেত্রেই কাঁচা চা পাতার দামের স্থিরতা (Stability) নিয়ে আলোচনা করা হয়। ক্ষুদ্র চা উৎপাদক নির্ভর সমস্ত দেশেই বর্তমানে পাতার দামের স্থিরতা একটি সমস্যা। শ্রীলঙ্কা, কেনিয়ার উৎপাদন যেহেতু রপ্তানী নির্ভর তাই এই দেশগুলিতে রপ্তানীর দামের অঙ্ক হ্রাস পেলেই সরাসরি প্রভাব এসে পড়ছে ক্ষুদ্র চা উৎপাদকদের উপর। গত ২ বছরে কাঁচা তেলের দাম ব্যপকভাবে কমে যাওয়ায় শ্রীলঙ্কাতে চা রপ্তানী ব্যাপক ভাবে হ্রাস পায় এবং ক্ষুদ্র চা উৎপাদকরা উৎপাদন খরচের নীচে পাতা বিক্রী করতে বাধ্য হয়। যদিও শ্রীলঙ্কা সরকার পরবর্তী সময়ে কিছুটা Price Subsidy দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায়। কেনিয়ার Keneya Tea Development Authority (KTDA) -র অন্তর্গত ৩৫ টি চা ফ্যাক্টরীর সাথে যুক্ত চা উৎপাদকদের গত দু বছর থেকে Tea Bonus পূর্বের তুলনায় অনেক কম নিতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ শ্রীলঙ্কা এবং কেনিয়া মূলত তেল উৎপাদনকরী দেশগুলিতে চা রপ্তানী করে এবং গত দু বছর ধরে ব্যাপক ভাবে কাঁচা তেলের দাম কমে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব চায়ের দামের উপরে পরেছে। ভারতবর্ষে, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম , বাংলাদেশেও এই কাঁচা চা পাতার দামের সমস্যা প্রকট। ভারতবর্ষের চা পর্ষদ (Price Sharing Formula, Minimum Benchmark Price) ঘোষনা করেও ক্ষুদ্র চা চাষিরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। FAO সুপারিশ ক্রমে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়া রাষ্ট্রগুলিতে Common Fund For Commodities (CFC) থেকে আর্থিক সাহায্য দ্বারা ক্ষুদ্র চা উৎপাদকদের Capacity Building বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই সভায় পাতার দামের সুস্থিরতা (Sustainability) ক্ষুদ্র চা চাষীদের জন্য আলাদা চা-র ব্র্যান্ড , বিভিন্ন উপায়ে ক্ষুদ্র চা চাষিদের আর্থিক স্বাবলম্বী করার জন্য Confederation of International Tea Small Holders (CITS) গঠনের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে এই CITS গঠন করে , আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতা নিযুক্ত করে, বিশ্ব ব্যাঙ্ক , আন্তর্জাতিক চা কমিটি সমন্বয় গঠন করে এর উদ্দেশ্য, কার্য্যাবলী এবং তৃনমূল স্তরে এর বিস্তার লাভের উপর দ্রুত আরোপ করা হয়েছে। আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে যেভাবে উৎপাদন খরচের নীচে পাতা বিক্রি করাতে বাধ্য হওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র চা উৎপাদক রাষ্ট্রগুলিকে খাদ্য সুরক্ষা সহ বিভিন্নভাবে মিশ্র প্রভাব পড়তে বাধ্য। ক্ষুদ্র চা উৎপাদক রাষ্ট্রগুলিকে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। আজ এটি প্রমানিত যে বিশ্বের প্রথম
৫টি চা উৎপাদক দেশগুলি মূলত ক্ষুদ্র চা উৎপাদকদের ফলনের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষুদ্র চা উৎপাদকদের জীবন জীবিকার সুস্থিরতার নিরাপত্তা না থাকলে অদূর ভবিষ্যতে চা শিল্প এক সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়তে পারে বলে FAO র রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অবিলম্বে সমস্ত ক্ষুদ্র চা উৎপাদক অধ্যুষিত দেশগুলিকে প্রয়োজনীয় সুদৃঢ় পদক্ষেপ এবং পর্যবেক্ষনের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

- বিজয় গোপাল চক্রবর্তী ( সভাপতি - কনফেডারেশন অফ্‌ স্মল টী গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (সিসটা))

Share your comments



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online


Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.