ভারতবর্ষের গৌরব, ভারতবাসীর ঐতিহ্য ত্রিবর্ণের পতাকা

Monday, 29 July 2019 02:52 PM

প্রত্যেক বর্ষে ২৬ শে জানুয়ারি আমাদের ত্রি-বর্ণের পতাকা উচ্চে উত্তোলিত হয় এবং প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি স্কুলে দেশপ্রেমের সঙ্গীত ধ্বনিত হয়। ‘ইয়ে শুভ দিন হ্যায় হাম সব কা, ল্যাহেরালো ত্রিরঙ্গা পেয়ারা’- যখন এই সঙ্গীতটি আমরা শুনি, তখন এই দেশাত্মবোধক সঙ্গীতটি শুনে চোখে জল আসে না, এরকম খুব কম মানুষই আছেন।

ভারতের এই ত্রিরঙ্গা জাতীয় পতাকা, যে কোন ভারতবাসীর জন্য সর্বাধিক মূল্যবান। ভারতের সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় পতাকা ভারতীয় জনগণের আশা ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করে’। এই পতাকার অধীনেই ভারতীয়রা স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সমাবেশ করেছিল এবং এই পতাকার সম্মান ও গৌরব রক্ষার জন্য হাজার হাজার সশস্ত্র বাহিনী এবং দেশপ্রেমিক তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

পতাকার কোড সংক্রান্ত তথ্য–

প্রজাতন্ত্র দিবস, স্বাধীনতা দিবস- এই বিশেষ দিনগুলিতে প্রতিটি ভারতীয়ই তাদের বাড়ি, বিদ্যালয় এবং কর্মক্ষেত্রে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত করতে চান। ২০০৪ সালে, সুপ্রিম কোর্ট  সংবিধানে ১৯ (১),(এ) অনুযায়ী রায় ঘোষণা করেছে যে, ‘জাতীয় পতাকা উত্তোলিত করা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, জাতীয় পতাকার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও অনুভূতি প্রকাশ জাতির জন্য গর্ব’।

সুতরাং, এই মৌলিক অধিকারটি প্রয়োগ করার আগে এর কোড সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। এর কোডের বিশেষত্ব হল, এটি পতাকা উত্তোলনের নিয়মকে সংজ্ঞায়িত করে এবং পতাকাটির মর্যাদা ও সম্মান বজায় রাখা কে নিশ্চিত করে।

ভারতের পতাকা কোড হল ভারতীয় মানদণ্ডের একটি বিন্যাস, যা বিভিন্ন প্রসঙ্গে ভারতীয় পতাকার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯৬৮ সালে এটি তৈরি করা হয়েছিল, পরে ২০০২ এবং ২০০৮ সালে এটির আধুনিকীকরণ করা হয়। ২০০২ সালে, ভারতের পতাকার কোডটি প্রতীক ও নামগুলির বিধান (অনুচিত ব্যবহারের প্রতিরোধ) আইন, ১৯৫০ এবং জাতীয় সম্মান (সংশোধন) আইন, ২০০৫-এর প্রতিরোধের সাথে সংমিশ্রিত করা হয়েছিল।

পতাকা কোডের প্রথম অংশ-

পতাকা কোডের প্রথম অংশটি পতাকার মানদণ্ড ও মাত্রার বর্ণনা করে।

  • ভারতের ত্রিবর্ণের পতাকাটি তিনটি সমান আয়তক্ষেত্রর সংযোজনের দ্বারা গঠিত।
  • উপরিভাগে গেরুয়া, মাঝখানে সাদা, এবং নিম্নে সবুজ বর্ণের এই পতাকার দৈর্ঘ্যে উচ্চতার অনুপাত ৩ : ২। মাঝে নীল বর্ণের গোলাকার অশোক চক্রে ২৪ টি স্পোক রয়েছে।
  • একটি ভালো মানের পতাকা তৈরি করতে রেশম বা খাদির প্রয়োজন হয়।

পতাকা কোডের দ্বিতীয় অংশ-

পতাকা কোডের দ্বিতীয় অংশটি পতাকা সংরক্ষণের জন্য এবং নির্দেশাবলীর বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

  • ভারতীয় জাতীয় পতাকা সর্বদা সম্মানের স্থান দখল করবে এবং যে কোন বিন্যাসে সুস্পষ্টভাবে এর স্থাপন করা উচিৎ।
  • সার্বজনীন ভবনের উপরে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হবে।
  • পতাকা সুতীব্রভাবে উত্তোলিত হবে, কিন্তু আনত করার সময় তা ধীরে ধীরে করতে হবে।
  • পতাকা উত্তোলনের সময় গেরুয়া বর্ণটি সবদ্যা শীর্ষে থাকবে। উল্টো অবস্থানে পতাকা উত্তোলন অপরাধ।
  • বিচ্ছুরিত পতাকা প্রদর্শন করা অপরাধ এবং কোন উপলক্ষ্যেই পতাকা কে নিমজ্জিত করা যাবে না।
  • ভারতের জাতীয় পতাকা কোন অনুষ্ঠানেই প্রসাধন রূপে ব্যবহার করা অনুচিত।
  • কোন শিলালিপির সাহায্যে পতাকা অঙ্কন করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
  • পতাকাকে কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করাও অপরাধের মধ্যে গণ্য করা হয়।

জাতীয় পতাকার প্রতি ১৯৭১ সালের আইন ২০০৩ সালে সংশোধিত করে সেখানে বলা হয়, পতাকার প্রতি অসম্মান করা হলে প্রথম অপরাধের ক্ষেত্রে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা করা যাবে। পরবর্তী অপরাধগুলিতে কমপক্ষে এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে।

জাতীয় পতাকার প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার-

‘আমি জাতীয় পতাকা এবং সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করছি’।

ভারতীয় পতাকা কোডের তৃতীয় অংশ –

ভারতীয় পতাকা কোডের তৃতীয় অনুচ্ছেদটি প্রতিরক্ষার প্রেক্ষাপটে পতাকাটির সঠিক প্রদর্শনী এবং পরিচালনা নির্দেশিকা নিয়ে কাজ করে।

  • কেবল সশস্ত্র বাহিনীর কর্মী বা রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সামরিক বাহিনীর সদস্যের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ঘটলে তাদের কফিন কভার করতে পতাকাটি ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে ব্যক্তিকে সমাধিস্থ করার আগে অবশ্যই তা অপসারণ করতে হবে।
  • পতাকা উত্তোলনের সময় ও নামানোর সময় বা কুচকাওয়াজের সময় উপস্থিত সমস্ত লোককে পতাকার মুখোমুখি থাকতে হবে এবং ইউনিফর্ম পরিহিত লোকদের মনোযোগের সাথে সেলাম করতে হবে।
  • অন্যান্য দেশের পতাকার সাথে ভারতীয় পতাকা উত্তোলিত হলে জাতীয় পতাকা সারির ডানদিকে বা বৃত্তের শুরুতে প্রদর্শিত হবে।
  • রাষ্ট্রপতি, সহ-রাষ্ট্রপতি, গভর্নর, উপ-গভর্নর, উচ্চ আদালত, সচিবালয়, কমিশনার অফিস, কালেক্টরেট, জেল, পৌরসভা ও জেলা পরিষদের কার্যালয়ের মতো সরকারি ভবনের উপরে পতাকাটির অবস্থান হবে।
  • রাষ্ট্রপতি, সহ-রাষ্ট্রপতি, গভর্নর এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নর, প্রধানমন্ত্রী এবং পরিষদের মন্ত্রীরা, ভারতের প্রধান বিচারপতি- এরকম বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের অনুমতি পেয়ে থাকেন।

জাতীয় পতাকার অর্ধনমিত থাকার ক্ষেত্র-

  • রাষ্ট্রপতি, সহ-রাষ্ট্রপতি বা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় জাতীয় শোকের চিহ্ন হিসাবে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকে।
  • গভর্নর, উপ-গভর্নর, মুখ্যমন্ত্রীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকে।
  • বিদেশে ভারতীয় মিশনগুলির ক্ষেত্রে, মিশনে অবস্থিত রাষ্ট্রের প্রধানের মৃত্যু ঘটলে সেক্ষেত্রে ভারতের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকে।
  • জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করার আগে তা শীর্ষে উত্তোলিত করা হয়। এটি সবদ্যা ভারতবাসীর গর্ব এবং সর্বক্ষেত্রে সম্মানের সাথে একে স্থান দেওয়া হয়।

ভারতের জাতীয় পতাকা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-

  • পিনগালি ভেঙ্কাইয়া ছিলেন একজন ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধা, যিনি ভারতের ত্রিবর্ণের পতাকাটির একটি প্রাথমিক নকশা সংস্করণ করেছিলেন, যার উপর ভিত্তি করে বর্তমানে পতাকাটি তৈরি হয়েছে।
  • ২২ শে জুলাই, ১৯৪৭ সালে গণপরিষদ একটি সভায় ভারতীয় জাতীয় পতাকার বর্তমান রূপটি গ্রহণ করে।
  • ১৯৯৩ সালের ২৯ শে মে, প্রথমবার এডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নরগে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছিলেন এবং নেপাল ও জাতীয়সংঘের পতাকাসহ ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন।
  • ১৯৮৪ সালে উইং কমান্ডার রাকেশ শর্মা যখন প্রথম মহাকাশে গেছিলেন, তখন তিনি ভারতীয় পতাকা সেখানে প্রতিস্থাপন করেন।
  • ১৯৯৬ সালের ২১ শে এপ্রিল এলডিআর সঞ্জয় থাপা এমআই এইট হেলিকপ্টার থেকে উত্তর মেরুতে ১০০০০ ফুট উচ্চতায় ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
  • ২০১৪ সালের ৭ ই ডিসেম্বর ৫০০০০ জন মিলে একটি মানব (জাতীয়) পতাকা গঠন করেন। বিশ্বের বৃহত্তম মানব পতাকার জন্য গিনেস রেকর্ড স্থাপন হয়।
  • ২০১১ সালে ২৩ শে জানুয়ারি, ২৯৩ ফুট উচ্চতায় দীর্ঘতম ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। পতাকাটির পরিমাপ ছিল ৯৯*৬৬ ফুট।
  • ২০১৬ সালের ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, এমএইচআরডি ঘোষণা করে যে, ভারতের জাতীয় পতাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রাঙ্গণ থেকে ২০৭ ফুট উচ্চতায় অবস্থান করবে।

স্বপ্নম সেন (swapnam@krishijagran.com)



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online

Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.