ধান পরবর্তী পতিত জমিতে ডাল শস্য চাষেই হবে কৃষকের অতিরিক্ত লাভ

Monday, 12 April 2021 07:39 PM
Profitable farming process (Image Credit - Google)

Profitable farming process (Image Credit - Google)

আমন ধান চাষের পর পরবর্তী মরশুমে কোন ফসল চাষ করতে না পারায় যে জমি পতিত অবস্থায় পড়ে থাকে, তাকে আমন ধানের পতিত জমি বলে (Rice fallow)। দক্ষিণ এশিয়ার ধানের মোট পতিত জমির (১৫ মিলিয়ন হেক্টর) মধ্যে ভারত বর্ষ ৭৯ শতাংশ অঞ্চল দখল করে আছে (১১.৬৫ মিলিয়ন হেক্টর)। ধান পরবর্তী পতিত জমি সাধারণত সবচেয়ে বেশি দেখা যায় অন্ধ্রপ্রদেশ, অসম, বিহার, ছত্রিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গে। ধানের এই সকল পতিত জমিতে স্বল্পমেয়াদী ডাল শস্য ও তৈলবীজ চাষের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেই সঙ্গে এই জমির উৎপাদনশীল ব্যবহার বেকারত্ব কমানো, শ্রম মাইগ্রেশন রোধ করা ও কম আয় যুক্ত এমন অঞ্চলের অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা দূরীভূত করতে সক্ষম। একই জমিতে বছরের পর বছর ধান চাষের ফলে জমির উর্বরতা তথা পুষ্টিগত মূল্য হ্রাস পায়, তাই এই সকল জমিতে ডাল শস্য প্রবর্তন করার ফলে জমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে একটি সুসংহত ব্যবস্থা গড়ে ওঠে যা জমির প্রয়োজনীয় পুষ্টিকে সুরক্ষা প্রদান করে।

আমরা সমস্ত পড়ে থাকা পতিত জমিতে আমন ধান পরবর্তী ‘পয়রা’ ফসল হিসাবে ডাল শস্য চাষ করতে পারি। পয়রা ফসল হিসাবে ডালশস্যের চাষে ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং এই পদ্ধতি খুবই লাভজনক।

ধান পরবর্তী পতিত জমিতে উৎপাদন ব্যবস্থা –

সাধারণত দুভাবে করা যায় –

১) রিলে চাষ এবং ২) পতিত জমিতে ভালো চাষ               

১) রিলে চাষ - পূর্ববর্তী ফসল কাটার ১০ থেকে ১৫ দিন আগে একই জমিতে পরবর্তী ফসলের বীজ ছিটিয়ে বোনার পদ্ধতিকে বলা হয় ‘রিলে চা’ষ।

যেমন, খারিফ মরশুমে আমন ধান কাটার দু'সপ্তাহ আগে একই জমিতে আমন ধানের মধ্যে পরবর্তী ফসল হিসাবে খেসারি অথবা মুসুরির বীজ ছিটিয়ে বোনা হয়। এই পদ্ধতি আবার ‘পয়রা’ বা ‘উটেরা’ চাষ নামেও পরিচিত। বর্তমানে রিলে পদ্ধতিতে ধানের পতিত জমিতে তৈলবীজ হিসাবে ‘টোরিয়া’ চাষও করা হচ্ছে।

‘রিলে’/পয়রা চাষের সুবিধা -

১) মাটিতে সঞ্চিত রস ও খাদ্য উপাদান কে কাজে লাগিয়ে বীজের অঙ্কুরোদগম ও প্রাথমিক বৃদ্ধি করা সম্ভব।

২) নতুন করে জমি তৈরি করতে হয় না।

৩) জমির সদ্ব্যবহার হয়ে থাকে।

৪) পয়রা ফসল তুলে পরবর্তী ফসল সহজেই চাষ করা যায়।

৫) পয়রা চাষ পদ্ধতি হলো সহজ-সরল ও লাভজনক।

ধানের পতিত জমিতে সম্ভাব্য ফসল -

১) ছোলা চাষ - 

  • স্বল্প দিনে পাকার উপযোগী এবং তাপমাত্রা সংবেদনশীল এমন জাতের নির্বাচন করা। যেমন JG ১৪, JG ১৬ JG ১৩০।

  • ধান-ছোলা এই শস্য পর্যায়ে নবি জাতের ধান অথবা সংকর ধান চাষ করা।

  • ভালো মানের বীজ ব্যবহার করা এবং প্রতি তিন বছর অন্তর বীজ পরিবর্তন করা উচিত।

  • রাইজোবিয়াম @১০ গ্রাম/কেজি বীজ হিসেবে ব্যবহার করা।

  • ধান কাটার অব্যবহিত পরেই মাটিতে থাকা সঞ্চিত রসের সঠিক কার্যকারিতা গ্রহণ করার জন্য জিরো টিলেজ মেশিনের ব্যবহার করা।

  • বীজের হার : ১২ থেকে ১৪ কেজি/বিঘা

মসুরি চাষ - 

  • আমন ধানের জমিতে পয়রা ফসল হিসেবে মসুরি খুব ভালোভাবে চাষ করা সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গে আমন ধান মুসুর (পয়রা ফসল) শস্য পর্যায় টি বহুল প্রচলিত ।

  • ছোট দানাযুক্ত এবং উইল ও রস্ট প্রতিরোধক জাত নির্বাচন করা যেমন kLS 218, HUL 57, NM 9, PANT L 639, PANT L 306.

  • ৮ কেজি/বিঘা এই বীজের হার মুসুরের প্রয়োজনীয় ফলন দিতে সক্ষম, ধান মুসুর এই শস্য পর্যায়ে (Relay cropping-এ)।

খেসারি চাষ :

  • খেসারির দানাতে বিটা এন অক্সালিন অ্যামিনো অ্যালপিন (ODAP) অথবা বিটা এন এল আলফা বিটা ডাই অ্যামিনো প্রোপিওনিক অ্যাসিড নামক একটি পুষ্টি বিরোধী উপাদান থাকায় ভারতবর্ষে এর চাষে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন জাতে ODAP-এর পরিমাণ থাকে = .%-.%।

  • খেসারি খরা সহনকারী ফসল এবং বিভিন্ন জলধারণকারী মাটিতে চাষ করা যায়।

  • পয়রা ফসল হিসাবে খেসারির চাষ খুবই উপযুক্ত এবং বহুল প্রচলিত। ছোট দানাযুক্ত জাতগুলি ১২-১৫ কেজি/বিঘা পয়রা ফসল হিসাবে চাষ করা হয়

  • খেসারি ভারতবর্ষে প্রধানত পয়রা ফসল হিসাবেই চাষ করা হয় এবং একক ফসল হিসাবে খুবই কম চাষ করা হয়।

  • উচ্চ ফলনশীল এবং কম ODAP যুক্ত জাতগুলি হল –

    BIO L ২১২ (রতন), প্রতীক, নির্মল, মহাতেওড়া।

আরও পড়ুন - সার্টিফায়েড সীড কি? কীভাবে চিনবেন কৃষকবন্ধুরা সার্টিফায়েড সীড, রইল বিস্তারিত

অন্যান্য ফসল চাষ –

  • উপকূলবর্তী এলাকাগুলির জন্য ‘পাউডারি মিলডিউ’ প্রতিরোধী কলাইয়ের জাত যেমন LBG ১৭, LBG ৬০২, LBG ৬২৩ এবং মুগের জাত যেমন, পুশা ৯০৭২, NARM ১/২/১৮ –কে নির্বাচিত করা করা।

  • অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা ও উত্তর পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চলে ধানের পতিত জমিতে বাদামের কিছু জাত নির্বাচন করা হয়েছে, যেমন কাদিরি ৪, কাদিরি ৬, TAG ২৪, গ্রিশমা, রোহিণী, ত্রিপুরা, নারায়িনী।

  • বর্তমানে কিছু তৈলবীজ যেমন রেপসিড-সরিষা, ধানের পতিত জমিতে চাষ করা হচ্ছে জিরো টিলেজ পদ্ধতিতে।

ধানের পতিত জমিতে উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা -

১) উন্নত মানের ও উন্নত জাতের বীজের অভাবের দরুন প্রস্তাবিত উচ্চফলনশীল জাতের পরিবর্তে চাষীভাইয়েরা কম ফলনশীল স্থানীয় জাতের চাষ করতে বাধ্য হচ্ছে।
২) দেরিতে বীজ বোনার জন্য ফলন কম হয়।
৩) রোগ - পোকা দমনের ব্যবস্থা না করা।
৪) সঠিকভাবে আগাছা দমন সার ও জলসেচ প্রভৃতির পরিচর্যা না হওয়া।
৫) সঠিক শস্যপর্যায় অবলম্বন না করা।
৬) পতিত জমিতে চাষ এ কৃষক বন্ধুদের অনীহা।

ফলন -

ধানের পতিত জমিতে 'পয়রা' চাষে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ডালশস্যে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। হেক্টরপ্রতি প্রায় ১৫-১৬ কুইন্টাল ফলন পাওয়া যায়।

ধানের পতিত জমিতে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা -

আমন ধানের পরবর্তী 'পয়রা' ফসল হিসেবে ডালশস্যের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব উন্নতমানের জাতের বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি ও ভালো পরিচর্যা ব্যবহার করার মাধ্যমে 'পয়রা' ফসল হিসাবে ডালশস্যের চাষ করলে এর এলাকা বাড়বে। বাড়বে ডালশস্যের যোগানের পরিমাণ। রাজ্যে ডাল শস্যের ঘাটতি মিটবে। পশ্চিমবঙ্গ ডালশস্য উৎপাদনে স্বনির্ভর হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন - চাষের জমিতে পেঁয়াজ চাষের মৌপালনের মাধ্যমে কৃষক বন্ধুরা করুন দ্বিগুণ আয়

English Summary: The additional benefit of the farmer will be the cultivation of pulses in the fallow land after paddy

আপনার সমর্থন প্রদর্শন করুন

প্রিয় অনুগ্রাহক, আমাদের পাঠক হওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার মতো পাঠকরা আমাদের কৃষি সাংবাদিকতা অগ্রগমনের অনুপ্রেরণা। গ্রামীণ ভারতের প্রতিটি কোণে কৃষক এবং অন্যান্য সকলের কাছে মানসম্পন্ন কৃষি সংবাদ বিতরণের জন্যে আমাদের আপনার সমর্থন দরকার। আপনার প্রতিটি অবদান আমাদের ভবিষ্যতের জন্য মূল্যবান।

এখনই অবদান রাখুন (Contribute Now)

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.