লিচু চাষের সম্পূর্ণ দিকনির্দেশনা (Litchi Farming)

KJ Staff
KJ Staff
litchi cultivation (Image Credit - Google)
litchi cultivation (Image Credit - Google)

লিচু একটি অবউষ্ণ জলবায়ুর ফল। উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুতে গাছ ভালোভাবে বাড়লেও ফুল ধারণের জন্য মৃদু ঠাণ্ডার আবেশ দরকার। অউষ্ণমণ্ডলের যেখানে শীতকালে ঠাণ্ডা অথচ তুষারপাত হয় না এবং গ্রীষ্মকালে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া বিরাজমান সেখানে লিচু ভালো হয়। শীতকালে তুষারপাত ও গ্রীষ্মকালে উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়া লিচু চাষের প্রধান অন্তরায়।

বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১৫০ সেমি. ও বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭০-৮৫% লিচু চাষের জন্য উপযোগী। গাছে ফুল আসার সময় বৃষ্টিপাত হলে পরাগায়ন ব্যাহত হয়। গ্রীষ্মকালে পর্যায়ক্রমে শুষ্ক আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাত হলে ফল ফেটে যায় ও ঝরে পড়ে। পাকার সময় আবহাওয়া শুষ্ক হলেও ফল ফেটে যায়।

মাটি -

সব মাটিতে লিচু ভালো হয়। তবে প্রচুর জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ নিষ্কাশিত গভীর উর্বর দো-আঁশ মাটি লিচু চাষের জন্য সর্বোত্তম। যদিও জলাবদ্ধতা এর জন্য ৰতিকর কিন্তু লিচু স্যাঁতসেঁতে মাটি পছন্দ করে। অমৱ ও ৰার উভয় প্রকার মাটিতেই লিচু চাষ করা চলে কিন্তু অমৱমাটি অধিক উপযোগী। কেননা এ ধরনের মাটিতে জন্মানো গাছের শিকড়ে মাইক্রোরাইজা উৎপন্ন হয়। এ ছত্রাকগুলো মিথোজীবীতার মাধ্যমে গাছে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে থাকে। সাধারণত মাটির পিএইচমান ৬.৫-৬.৮ হলে লিচু চাষ উপযোগী হয়। তবে বেলেমাটি লিচু চাষের অনুপযুক্ত। নতুন চারার গোড়ায় পুরনো লিচু গাছের নিচের কিছু মাটি প্রয়োগ করে দ্রুত মাইকোরাইজা সৃষ্টি হয়।

জমি তৈরি -

লিচু চাষের জন্য নির্বাচিত জমি ভালো করে লাঙল, পাওয়ারটিলার, কিংবা ট্রাক্টর যে কোনোটির দ্বারা চাষ ও পরে মই দিয়ে জমি সমতল ও আগাছা মুক্ত করে নিতে হবে। জমি থেকে ইট, পাথর, অন্য কোনো গাছের গোড়া ইত্যাদি যদি থাকে তবে তা সরিয়ে ফেলতে হবে। জমি চাষের ফলে মাটিতে প্রচুর বায়ু চলাচল হয়। ফলে মাটিতে বিদ্যমান পুষ্টি গাছের জন্য সহজলভ্য হয়। তাছাড়া শিকড় বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।

রোপণ প্রণালী (Plantation) :

রোপণ প্রণালী হলো রোপিত চারার পারস্পরিক অবস্থান। প্রতি হেক্টর জমিতে কি পরিমাণ লিচুর চারা লাগানো সম্ভব তা নির্ভর করে রোপণ দূরত্ব, জমির আকৃতি ও রোপণ প্রণালীর ওপর। সমতল ভূমিতে বর্গাকার প্রণালীতে এবং পাহাড়ি ভূমিতে কন্টুর প্রণালীতে লিচু গাছের চারা লাগানো হয়।

চারা নির্বাচন :

লিচুর বংশবিস্তার করা হয় প্রধানত গুটি কলম করে। লিচু ফলের মওসুম শেষেই শুরু হয়ে যায় ফলগাছ রোপণ মওসুম। অন্যান্য ফলগাছের মতো লিচুর কলম কিন’ বর্ষার শুরুতেই রোপণ করা ঠিক নয়। এ জন্য একটু অপেক্ষা করতে হয়।

বর্ষার পর যখন মাটিতে রসের আধিক্য কমতে থাকে তখনই লিচুর কলম রোপণ করতে হয়। আসলে লিচুর গুটি কলম অন্যান্য ফলগাছের গুটি কলমের মতো নয় বলেই মাটিতে বেশি রস থাকলে রোপণ করা উচিত নয়। তবে যেসব জায়গা উঁচু, মাটি বেলে দো-আঁশ ধরনের, যে মাটিতে পানি দীর্ঘক্ষণ জমে থাকে না এবং সারা দিন রোদ পড়ে সেসব জায়গাই লিচুর কলম রোপণের জন্য উপযুক্ত। লিচুর বংশ বিস্তার দু’ভাবে করা যায়। সরাসরি বীজ থেকে এবং কলমের মাধ্যমে। বীজ থেকে চারা তৈরি করলে ফল ধরতে ৮-১০ বছর লেগে যায়। তাছাড়া জাতের গুণাগুণ লোপ পায়। লিচুর জন্য গুটি কলম বেশি উপযোগী। এতে মাতৃ গুণাগুণ বজায় থাকে। কাজেই এক বছর বয়স্ক সুস্থ ও সবল গুটি কলমের চারা বাছাই করে লাগাতে হবে।

চারা রোপণের দূরত্ব :

ঘন করে লিচুর চারা লাগানো হলে সেসব গাছে সূর্যের আলো পায় না। ফলে গাছে খাদ্য প্রস্তুত ভালোভাবে হয় না। গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাছাড়া রোগ-পোকামাকড়ের উপদ্রব বৃদ্ধি পায়। কিন্তু গাছের জন্য অনুমোদিত দূরত্ব অনুরসণ করলে উপরিউক্ত সমস্যা থাকে না। লিচুগাছ সাধারণত ১০-১২ মিটার (অর্থাৎ ৩০-৪০ ফুট) দূরত্বে লাগানো হয়।

চারা রোপণের সময় :

বর্ষাকাল চারা লাগানোর উপযুক্ত সময় অর্থাৎ জুন-জুলাই মাস। তবে চারা জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত লাগানো চলে। প্রখর রোদ ও হাওয়ায় চারা লাগানো যাবে না। বিকেলে চারা লাগানো উত্তম।

গর্ত তৈরি :

বর্ষার আগেই নির্ধারিত জায়গায় গর্ত করতে হবে। গর্তের দৈর্ঘ্য ১ মিটার, প্রস্থ ১ মিটার ও গভীরতা ১ মিটার রাখতে হবে। গর্ত তৈরির সময় গর্তের ওপরের মাটি এক পাশে ও নিচের অংশের মাটি অন্য এক পাশে রেখে ১০-১৫ দিন পর্যন্ত রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। ফলে মাটিতে কীট বা রোগের জীবাণু থাকলে রোদে তা মারা যাবে। গর্তের ওপরের অংশের মাটির সাথে ২০-২৫ কেজি গোবর সার, কিছুটা পুরনো লিচু বাগানের মাটি, টিএসপি ৬০০-৭০০ গ্রাম, এমপি ৩৫০-৪৫০ গ্রাম, জিপসাম ২০০ -৩০০ গ্রাম, জিঙ্ক সালফেট ৪০-৬০ গ্রাম মিশিয়ে দিতে হবে এবং ওপরের এই সার মিশ্রিত মাটি গর্তের নিচে এবং গর্তের নিজের মাটি গর্তের ওপরে দিয়ে পুরো গর্তটি ভরাট করতে হবে। প্রতি বছর সারের পরিমাণ কছুটা বাড়িয়ে দিতে হবে। গাছের বয়স ১০-১৫ বছর হলে সারের মাত্রা দ্বিগুণ করতে হবে।

চারা রোপণ পদ্ধতি :

গর্ত ভর্তি করার ১০-১৫ দিন পর চারাটি ঠিক গর্তের মাঝখানে রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের পর খুঁটি এবং প্রয়োজনে খাঁচা দিয়ে চারাকে রক্ষা করতে হবে। চারা লাগানোর পর পরই চারার গোড়ায় পানিসেচ দিতে হবে।

সারের পরিমাণ (Fertilizer) :

এক থেকে তিন বছর বয়সী গাছের জন্য গাছপ্রতি জৈবসার ১০-২০ কেজি, ইউরিয়া ৫০০ গ্রাম, টিএসপি ৪০০ গ্রাম, এমওপি ১৫০-২০০ গ্রাম।

চার-ছয় বছর বয়সী গাছের জন্য গাছপ্রতি জৈবসার ২০-৩০ কেজি, ইউরিয়া ৬০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমওপি ২৫০-৩০০ গ্রাম।

৭-১০ বছর বয়সী গাছের জন্য গাছপ্রতি জৈবসার ৩০-৪৫ কেজি, ইউরিয়া ৭৫০ গ্রাম, টিএসপি৭০০ গ্রাম, এমওপি ৫০০ গ্রাম।

১০ বছরের বেশি বয়সী গাছের জন্য গাছপ্রতি জৈবসার ৫০-৬০ কেজি, ইউরিয়া ১০০০ গ্রাম, টিএসপি ৭৫০ গ্রাম, এমওপি ৬০০ গ্রাম।

গাছে যদি জিঙ্কের অভাব দেখা দেয় অর্থাৎ পাতা যদি তামাটে রঙ ধারণ করে তবে প্রতি বছর ৫০০ লিটার পানির সাথে ২ কেজি চুন ও ৪ কেজি জিঙ্ক সালফেট গুলে বসন্তকালে গাছে ছিটাতে হবে। ফল ঝরা কমাতে এটা সাহায্য করবে। ফল ফেটে যাওয়া কমাতে প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০ গ্রাম বোরিক পাউডার গুলে ফলে স্প্রে করা যেতে পারে।

গাছের যত্ন :

সময়মতো মাঝে মধ্যে মরা ডাল পরিষ্কার করা দরকার। সাধারণত লিচুতে অঙ্গছাঁটাই প্রয়োজন নেই তবে গাছের আকৃতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ছাঁটাই করা যেতে পারে। লিচুতে প্রশাখার অগ্রভাগসহ ফল সংগ্রহ করা হয়, এ পরোক্ষ ছাঁটাই গাছের জন্য উপকারী বলেই মনে হয়।

সেচ প্রয়োগ :

গাছের প্রধানত শীত ও গ্রীষ্মের দিনগুলোতে পানির প্রয়োজন হয় বেশি। চারা গাছের বৃদ্ধির জন্য ঘন ঘন সেচ দিতে হবে। যদি পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হয় তবে ফলন্ত গাছের বেলায় পূর্ণ ফুল ফোটা অবস্থায় একবার এবং ফল মটর দানার আকৃতি ধারণ পর্যায়ে আর একবার সেচ দিতে হবে। ফল আসার পর সেচ না দিলে ফল পড়ে যায় ও ফল ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। শীতকালে বিকেলের দিকে সেচ দিলে ঠাণ্ডায় গাছের ৰতি হয় না। গাছের গোড়ায় বেশি বা কম রস গাছের বৃদ্ধির পক্ষে ক্ষতিকর। তাই পরিমাণ মতো পানি সেচের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

রোগ :

লিচুর তেমন কোনো মারাত্মক রোগ দেখা য়ায় না। তবে আর্দ্র ও কুয়াশাযুক্ত আবহাওয়ায় পুষ্পমঞ্জুরি পাউডারি মিলডিউ ও অ্যানথ্রাকনোজ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তা ছাড়া অনেক সময় ছত্রাকজনিত রোগের কারণে ফল পচে যায়। প্রতিকার হিসেবে বর্দো মিশ্রণ ও ডাইথেন এম-৪৫ ছিটানো যেতে পারে।

লিচুর মাইট বা মাকড় :

মাকড়সা জাতীয় এ পোকা আকারে খুবই ছোট এবং এরা পাতায় আক্রমণ করে। আক্রান্ত পাতায় মখমলের মতো লালচে বাদামি দাগ সৃষ্টি হয়। ফলে গাছ বাড়ে না ও ফলন কম হয়। প্রতিকার হিসেবে আক্রান্ত ডালপালা বা ডগা ছাঁটাই এবং ধ্বংস করতে হবে। প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম থিয়োভিট মিশিয়ে সেপ্র করতে হবে। তা ছাড়া মাইট যাতে গাছে উঠতে না পারে সে জন্য কাণ্ডের বা গোড়ার চারপাশে আলকাতরা লাগানো যেতে পারে।

লিচুর ফল ছিদ্রকারী পোকা :

ফল পাকার সময় পোকা ফলের বোঁটার কাছে ছিদ্র করে ভেতরে ঢুকে এবং বীজকে আক্রমণ করে। ফল পাকার সময় বৃষ্টি হলে এ পোকা বেশি দেখা যায়। এরা ছিদ্রের মুখে বাদামি রঙের এক প্রকার করাতের গুঁড়ার মতো মিহি গুঁড়া উৎপন্ন করে। এতে ফল নষ্ট হয় ও ফলের বাজার মূল্য কমে যায়। ফলের গুটি ধরার পর ১৫ দিন পর পর দু’বার সিমবুশ ১ মিলি হারে প্রতি লিটার পানির সাথে মিশিয়ে সেপ্র করতে হবে। রোগ ছাড়াও লিচুর আর একটি আপদ হলো বাদুড়। রাতে ও দিনে টিন পিটিয়ে যথাক্রমে বাদুড়ের এবং পাখি (যেমন কাক ও অন্যান্য পাখি ইত্যাদির উপদ্রব কমানো যায়। তা ছাড়া জাল দিয়েও লিচু রক্ষা করা যায়।

ফল সংগ্রহ :

ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে লিচু গাছে ফুল আসে ও মে-জুন মাসে লিচুর পাকা ফল সংগ্রহ করা হয়। এ সময় ফলের খোসা লালচে রঙ ধারণ করে ও কাঁটাগুলো চ্যাপটা হয়ে খোসা প্রায় মসৃণ হয়ে যায়। কিছু পাতাসহ গোছা ধরে লিচু সংগ্রহ করা হয়, এতে ফল বেশি দিন ধরে ঘরে রাখা যায়। বৃষ্টি হলে তার পর পরই কখনো লিচু সংগ্রহ করা ঠিক নয়।

ফলন :

লিচু পুষ্ট হলে ফলের কাঁটা ছাড়বে ও রঙ উজ্জ্বল হবে। পুষ্ট ফল শাখা ও পাতাসহ পাড়া হয়। ২০-৩০ বছর বয়স পর্যন্ত লিচুগাছে ফলন বাড়তে থাকে। সাধারণত প্রতিটি গাছ থেকে বছরে ৮০-১৫০ কেজি বা ৩২০০-৬০০০টি লিচু পাওয়া যায়। অবস্থাভেদে এর তারতম্যও লক্ষ করা যায়।

আরও পড়ুন - প্রধান ফসলের সাথে গাজর চাষ করে আয় করুন অতিরিক্ত অর্থ (Carrot Cultivation Guide)

Like this article?

Hey! I am KJ Staff. Did you liked this article and have suggestions to improve this article? Mail me your suggestions and feedback.

Share your comments

আমাদের নিউজলেটার অপশনটি সাবস্ক্রাইব করুন আর আপনার আগ্রহের বিষয়গুলি বেছে নিন। আমরা আপনার পছন্দ অনুসারে খবর এবং সর্বশেষ আপডেটগুলি প্রেরণ করব।

Subscribe Newsletters