বাগানে সাথী ফসল চাষ – কৃষক বন্ধুর বাড়তি আয়ের উৎস

KJ Staff
KJ Staff
Mixed farming (Image Credit - Google)
Mixed farming (Image Credit - Google)

নারকেল, সুপারি, আম, লিচু বা যে কোন বড় ফল বাগানে গাছ লাগানোর পর প্রথম দিকে গাছ ও সারির মাঝে অনেক ফাঁকা জায়গা পড়ে থাকে। প্রথম দিকে এই বাগানের ফাঁকা জায়গায় সাথী ফসলের চাষ করে জমির পূর্ণ ব্যবহার যেমন করা যায়, তেমনই কৃষক বন্ধুরা বাড়তি আয়ও করতে পারবেন। বাগানে সাধারণত দুটি গাছের মধ্যে মোটামুটি ৩-১০ মিটার পর্যন্ত দূরত্ব বজায় রাখা হয়। এই ফাঁকা জায়গা ফেলে না রেখে কৃষক বন্ধুরা বাগানে সাথী ফসল হিসাবে নানা ধরনের স্বল্পমেয়াদী ফসল উৎপাদনের ব্যবস্থা করে যথেষ্ট লাভবান হতে পারেন।  

সাথী ফসলের পরিচয় (Mixed crop practice) -

একটি দীর্ঘমেয়াদী ফসলের সাথে একই জমিতে দুই বা ততোধিক স্বল্পমেয়াদী ফসল একই সঙ্গে উৎপাদন করা যায়। এর মাধ্যমে বাড়তি আয়ও করা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদী ফসলটি হল প্রধান ফসল ও স্বল্পমেয়াদী ফসলটিকে সাথী ফসল বলে। নতুন বাগানে চারা লাগানোর পর দুটি সারির মাঝখানে যে ফাঁকা জায়গা পড়ে থাকে, সেখানে সাথী ফসল হিসাবে স্বল্পমেয়াদী অন্যান্য ফসলের চাষ করা যায়। এতে বাগিচা ফসলের কোনো ক্ষতি হয় না, বরং বাগিচা ফসলের ফলন আরও বৃদ্ধি পায়। বাগানে সাথী ফসল চাষ করলে কি কি লাভ হয়, তা দেখে নেওয়া যাক -  

  • বাগানে চারা রোপণের পর প্রথম কয়েক বছর কোনো ফলন পাওয়া যায় না। তাই এই সময় প্রধান ফসলের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানে সাথী ফসল চাষ করলে জমি থেকে বাড়তি আয় করা যায়।

  • বাগানে সাথী ফসল হিসাবে যেসব ফসল করা হয়, তাদের মধ্যে ডাল জাতীয় ফসল চাষ করলে বেশি লাভ হয়।

  • সাথী ফসল চাষ করলে বাগানে আগাছা ও রোগ-পোকার উপদ্রব কম হয়।

  • সারা বছর ফসল চাষ করার ফলে জমি আবৃত থাকে এবং মাটির ক্ষয়রোধ হয়।

  • শুষ্ক আবহাওয়াতেও বাগানের মাটিতে রসের অভাব হয় না।

  • সাথী ফসলের পরিচর্যার সঙ্গে একই সাথে বাগিচা ফসলের পরিচর্যাও হয়ে যায়। এর জন্য আলাদা খরচ লাগে না, উপরন্তু বাগিচা গাছের পুষ্টিবৃদ্ধির সাথে সাথে ফলন ক্ষমতা বাড়বে।

  • স্বল্প মেয়াদী সাথী ফসলে যে সার ব্যবহার হয়, তা সে পূর্ণ মাত্রায় নিতে পারে না। সেই অবশিষ্ট সার বা খাদ্য একাধারে যেমন বাগানের মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে, অন্যদিকে প্রধান ফসলের পুষ্টি ঘটায়।

বাগানে প্রায় সব ধরনের ফসলই সাথী ফসল হিসাবে নির্বাচিত করা যায়। গাছ একটু বড় হওয়ার সাথে সাথে যখন ডালপালার প্রসার ঘটে, এবং সূর্যের আলো ভেতরে কম প্রবেশ করে, সেই সময় চাষি ভাইয়েরা বাগানে সাথী ফসল হিসাবে ছায়ায় হতে পারে এমন ফসল যেমন- মশলা ও ঔষধি জাতীয় ফসল চাষ করতে পারেন। কারন এইসব ফসল আংশিক ছায়ায় ভালোভাবেই হয়।

সাথী ফসল নির্বাচনঃ

বাগানে যেসব আন্তঃ বা সাথী ফসল চাষ করা যাবে, সেগুলি যেন বাগিচা ফসলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সাথী ফসলগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায় -

ফল জাতীয় ফসলঃ

স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন, কম উচ্চতাযুক্ত ও খুব তাড়াতাড়ি ফল দেয় এমন ফসল নির্বাচন করতে হবে। কারন সাথী ফসল যেন মূল ফসলের সাথে খাদ্য, জল ইত্যাদির জন্য লড়াই না করে। ফল হিসাবে পেঁপে, কলা, আনারস এগুলি নির্বাচন করা যেতে পারে।

শাক-সবজিঃ

যেসব শাক ও সবজি জাতীয় ফসলের শিকড় বা মূল মাটির ২৫ সেমি গভীরতার মধ্যে থাকে, সেইসব সবজি ফসল নির্বাচন করতে হবে। যেমন- বেগুন, টোম্যাটো, ঢ্যাঁড়শ, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মূলা, আলু, লাল শাক, পালং শাক, পুঁই শাক, শশা, কুমড়ো ইত্যাদি।

মশলা জাতীয় শস্যঃ

যখন বাগানে পুরোপুরি সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে, সেক্ষেত্রে পেঁয়াজ, রসুন, লঙ্কা, ধনেপাতা চাষ করা যেতে পারে। আবার আংশিক ছায়ায় আদা, হলুদ ইত্যাদি খুব ভালো হয়। এছাড়া গাছের ওপর গোলমরিচের চাষ খুবই লাভজনক।

ডাল জাতীয় শস্যঃ

মুগ, মুসুর, কলাই, ছোলা ইত্যাদি ডালজাতীয় শস্য সাথী ফসল হিসাবে অত্যন্ত লাভজনক।

তৈলবীজঃ

তৈলবীজ হিসাবে সরিষা, তিল, চিনাবাদাম ইত্যাদি চাষ করা যাবে।

দানা শস্যঃ

নতুন বাগানে প্রথম দিকে ধান, গম এমনকি ভুট্টাও চাষ করা যায়।

এছাড়া ঔষধি ফসল ও নানা রকম গোখাদ্য চাষ লাভজনক ভাবে করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন - শ্রী পদ্ধতিতে ধান চাষ, রুখবে জলের অপচয়

সাথী ফসল চাষের শর্তাবলী (How to do mixed farming) - 

বাগানে সাথী ফসল চাষ করতে হলে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই মেনে চাষ করতে হবে। যেমন-

সাথী ফসল লাগানোর জন্য জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে তৈরি করতে হবে। জমি তৈরির সময় যাতে বাগিচা ফসলের শিকড় কাটা না পড়ে বা অন্য কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

বাগিচা ফসলের গোড়া কিছুটা ছেড়ে শুধু সারির মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় সাথী ফসল চাষ করতে হবে।

বারবার একই ফসল চাষ না করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন ফসলের চাষ করা উচিত।

সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাগিচা ফসলে যে পরিমাণ সার প্রয়োজন তা যেন বাদ না পড়ে এবং সাথী ফসলের জন্য নির্দিষ্ট সার সঠিক পরিমানে ও সময়ে অবশ্যই দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি ফসলের জন্য যেন অন্য ফসলের খাবারের ঘাটতি না হয়।

যেসব জমিতে প্রয়োজনীয় রসের অভাব আছে, সেক্ষেত্রে ফসলের প্রকৃতি ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে জলসেচের ব্যবস্থা করতে হবে।

রোগ-পোকার উপদ্রব হলে ফসলের চাহিদামত ও পরিস্থিতি অনুযায়ী দমন ব্যবস্থা নিতে হবে। বাগিচা ফসলের গাছ বড় হওয়ার সাথে সাথে অনেকটা অংশে ছায়া পড়ে এবং সাথী ফসলে রোগ-পোকার আক্রমণ বেশি হয়, সেক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে এর প্রতিরোধ ও দমন ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সাথী বা আন্তঃ ফসল তোলার পর ফসলের অবশিষ্টাংশ সরিয়ে ফেলা উচিত। অথবা সাথী ফসলের অবশিষ্টাংশ চাষ দিয়ে মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এতে জমিতে জৈব পদার্থ যোগ হয়ে মাটি উর্বর হবে।

সুতরাং নতুন বাগান করলে প্রথম কয়েক বছর এমনকি যেসব বাগানে গাছ এখনও খুব বেশি বড় নয়, সেইসব বাগানে সাথী ফসল চাষ করলে যেমন অন্তর্বর্তী ফাঁকা জমির সদ্ব্যবহার হবে, তেমনই কৃষক বন্ধুরা সাথী ফসল থেকে বাড়তি উপার্জনও করতে পারবেন। উপরন্তু বাগানের মাটির উর্বরতা বাড়বে এবং বাগিচা ফসলের পুষ্টিবৃদ্ধির সাথে সাথে ফলন ক্ষমতা বাড়বে।

আরও পড়ুন - বেগুনের পোকা রুখতে কৃষকদের ভরসা ‘ফেরোমেন ট্র্যাপ'

Like this article?

Hey! I am KJ Staff. Did you liked this article and have suggestions to improve this article? Mail me your suggestions and feedback.

Share your comments

আমাদের নিউজলেটার অপশনটি সাবস্ক্রাইব করুন আর আপনার আগ্রহের বিষয়গুলি বেছে নিন। আমরা আপনার পছন্দ অনুসারে খবর এবং সর্বশেষ আপডেটগুলি প্রেরণ করব।

Subscribe Newsletters