পশ্চিমবঙ্গে মরসুম ভিত্তিতে গাঁদা ফুল চাষ (Marigold cultivation)

KJ Staff
KJ Staff
Marigold cultivation (Image Credit - Google)
Marigold cultivation (Image Credit - Google)

গাঁদা সাধারণত উজ্জল হলুদ ও গাঢ় খয়েরী হয়ে থাকে, একটি সুগন্ধী ফুল যা সর্বত্র সহজে হয়ে থাকে এবং বিবিধ কাজে ব্যবহৃত হয়।  বৈজ্ঞানিক নাম Tagetes erecta। অঞ্চলভেদে এটি গন্ধা>গেন্ধা>গেনদা>গাঁদা । গাঁদা ফুল বিভিন্ন জাত ও রঙের দেখা যায়। সাধারণত: এটি শীতকালীন ফুল হলেও বর্তমানে এটি গ্রীষ্ম এবং বর্ষাকালেও চাষাবাদ হয়ে থাকে। বাগানের শোভা বর্ধন ছাড়াও বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বন ও গৃহসজ্জায় এর ব্যাপক ব্যবহার ফুলটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন  এলাকায় অধিক হারে চাষ হয় ।এই ফুল চাষে চাষীরা এখন আগ্রহী হয়েছে ।

বিভিন্ন প্রজাতি:

আফ্রিকান গাঁদাঃ এই শ্রেণীর গাঁদা হলুদ রঙের, গাছের আকৃতি বেশ বড়। উল্লেখযোগ্য জাতসমূহ হলঃ ইনকা, গিনি গোল্ড, ইয়েলা সুপ্রিম, গোল্ডস্মিথ, ম্যান ইন দি মুন, ইত্যাদি।

ফরাসি গাঁদাঃ এই শ্রেণীর গাঁদা কমলা হলুদ হয়ে থাকে। এজন্য এদের রক্তগাঁদাও বলা হয়। এর গাছ ক্ষুদ্রাকৃতির। পাপড়ির গোড়ায় কালো ছোপ থাকে।

উল্লেখযোগ্য জাতসমূহ হলঃ মেরিয়েটা, হারমনি, লিজন অব অনার, ইত্যাদি।

এছাড়াও সাদা গাঁদা, জাম্বো গাঁদা, হাইব্রিড এবং রক্ত বা চাইনিজ গাঁদার চাষ হয়ে থাকে।

চাষকৌশল সম্পাদনা:

গাঁদা ফুলের  চাষ করতে হলে পর্যায়ক্রমে যে কাজগুলো করতে হয় তা এখানে আলোচনা করা হলো-

জমি নির্বাচনঃ 

ফুলের চাষ করতে হলে প্রথমেই জমি নির্বাচন করতে হবে। সাধারণত এঁটেল দো-আঁশ মাটি ফুল চাষের জন্য বেশি উপযোগী। যে জমিতে ফুল চাষ করা হবে, খেয়াল রাখতে হবে তা যেন নিচু না হয়। অর্থাৎ জমিতে যেন জল জমে না থাকে। পাশাপাশি জমিতে সেচ দেয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

জমি চাষঃ 

জমি নির্বাচন করার পর জমিতে ৩/৪টা চাষ দিয়ে মাটি তৈরি করতে হবে। মাটি যেন ঝুরঝুরে ও ছোট টুকরো হয়। শেষ চাষের আগে জমিতে গোবর সার দিতে পারলে ভাল হয়। মাটির নিচে প্রচুর কেঁচো থাকে যা গাছ কেটে নষ্ট করে দেয়। তাই শেষ চাষের আগে মাটিতে কেঁচোনাশক যে কোন ওষুধ দিতে হবে। তারপর মই দিয়ে মাটি সমান করে দিতে হবে।

চারা সংগ্রহঃ

অগ্রহায়ণ - পৌষ মাসে সাধারণত গরম জাতের ফুলের চারা লাগাতে হয়। এই জাতের ফুলের চারা সংগ্রহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এই ফুলের চারা সাধারণত বাংলাদেশে কম উৎপাদন হয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে এই ফুলের চারা বেশি আসে। চারা তৈরির জন্য বীজ সংগ্রহ একটি জটিল ব্যাপার। আমাদের দেশের কিছু চাষি এই চারা উৎপাদন করে ঠিকই কিন্তু গুণগত মান ভালো হয় না। ভারতে অনেক আগ থেকেই ফুলের চাষ হয় এবং দীর্ঘদিন ঐ দেশের চাষিরা চারা উৎপাদন করছে। সুতরাং ফুল চাষে তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আমাদের চেয়ে বেশি। এই জন্য তাদের উৎপাদিত চারার মানও ভালো। তাই গরম জাতের ফুল চাষ করতে হলে বিশ্বস্ত মাধ্যম দ্বারা ভারত থেকে চারা এনে চাষ করাই ভালো। চারা সংগ্রহের আগে থেকেই যোগাযোগ করতে হবে।

চারা রোপনঃ 

যে দিন চারা আসবে অর্থাৎ নিজের হাতে যে দিন চারা পৌঁছাবে সে দিনই জমিতে শেষ চাষ এবং কেঁচো মারার ওষুধ দিয়ে দুপুরের দিকে সেচ দিয়ে সমস্ত জমি ভেজাতে হবে। তারপর বিকালে যখন রোদের তাপ কমে যায় তখন চারা রোপণ করতে হবে। চারা রোপণ করার সময় রশি ধরে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের জন্য সারি থেকে সারির দুরত্ব হবে দুই হাত এবং চারা থেকে চারার দুরত্ব হবে ৬ ইঞ্চি। গরম জাতের ফুলের চারা লাগানোর পরে অনেক চারা মারা যায় এবং অনেক গাছে পুরুষ ফুল হয় সেটা বাজারে চলে না। তাই ওই জাতীয় গাছগুলো তুলে ফেলতে হয়। এইজন্য অন্যজাতের চেয়ে গরম জাতের চারা একটু ঘন করে লাগাতে হয়। চারাগুলো লাগানোর আগে পাত্রে জল নিয়ে দুই চা চামচ "ডিথেন এম-৪৫" ওষুধ মিশিয়ে চারাগুলো ঐ জলতে ভিজিয়ে ৫/৬ মিনিট পর তুলে লাগালে চারার মৃত্যু হার অনেকাংশে কম হয়।

পরিচর্যাঃ 

কোন সাফল্যের মূলেই রয়েছে সততা, সঠিক পরিকল্পনা এবং পরিশ্রম। যে কোন ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিচর্যাটাই হচ্ছে প্রধান। ফসলের সঠিক পরিচর্যা যদি না করা হয়, সঠিক ভাবে সার ও ওষুধ যদি না দেয়া হয় তাহলে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সফলকাম হওয়া যায় না। এইজন্য ফুলের চারা লাগানোর পর তার সঠিক পরিচর্যাটাই হচ্ছে মূল কাজ। চারা লাগানোর পর ৮/১০ দিন কোন কিছু করতে হয় না। এর পর যদি জমি শুকিয়ে যায় অর্থাৎ যদি মনে হয় মাটিতে পর্যাপ্ত রস নেই তাহলে সেচ দিতে হবে। সেচটা সাধারণত খুব ভোরে অথবা সন্ধার আগে দেয়া ভালো। কারণ এসময় প্রচন্ড রোদে জমির মাটি গরম থাকে। ঐ অবস্থায় জমিতে সেচ দিলে চারার খুব ক্ষতি হয়। এইজন্য জমির মাটি ঠান্ডা থাকা অবস্থায় সেচ দেয়া ভালো। ১৫/২০ দিন পর চারা মাটিতে লেগে যায়, একটু বড়ও হয়। তখন গাছে ওষুধ এবং সার দেয়া শুরু করতে হয়। শুধু "ডায়াথেন এম-৪৫" এবং "রোভরাল" এই দুই প্রকার ওষুধ দিলেই চলে। গাছকে তাড়াতাড়ি বৃদ্ধির জন্য "থিওভিট " ওষুধ দিতে হয়। ১০ লিটার জলতে প্রতিটি ওষুধ ২ চা-চামচ করে মিশিয়ে স্প্রে করে দিতে হয়। এ সময় মাটিতে জো হলে এবং আগাছা বেশি হলে নিড়ানী দিয়ে শুধু গাছের গোড়া এবং কোদাল দিয়ে সমস্ত জমি কুপিয়ে দিতে হয়। তারপর প্রতি বিঘা জমিতে ২০ কেজি হারে ডিএমপি সার শুধু গাছের সারির মধ্য দিয়ে ছিটিয়ে দিয়ে সেচ দিতে হবে। সেচ দেয়ার দুই তিন দিন পর যে জায়গার চারাগুলো মারা গেছে সেই জায়গা পূরণ করতে হবে। যে চারাগুলো অতিরিক্ত থাকবে এবং প্রত্যেক সারিতে লক্ষ্য করতে হবে সেখানে চারার পরিমাণ বা ঘনত্ব বেশি সেই জায়গা থেকে চারপাশের মাটিসহ চারা তুলে খালি জায়গায় লাগিয়ে দিতে হবে। কাজটা করতে হবে বিকালে।

কয়দিন পর চারা যখন একটু বড় হবে তখন গাছের গোড়ায় মাটি টেনে দিতে হবে। এ সময় অনেক গাছে কুঁড়ি আসবে। কুঁড়িগুলো ভেঙ্গে দিতে হবে। বৃষ্টিপাত না হলে মাটি বেশি শুকানোর আগেই সেচ দিতে হবে। গাছ যত বড় হবে গাছে ওষুধ এবং সার দেয়ার পরিমাণও বাড়াতে হবে। এছাড়া গাছের গোড়ায় মাটি বেশি দিতে হবে। এ সময় গাছে পোকার আক্রমণ শুরু হয় এবং আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। তাই এ সময় সপ্তাহে ২/৩ দিন ওষুধ দিহে হবে। বাজারে অনেক কীটনাশক ওষুধ পাওয়া যায়। ভালো মানের ওষুধ দিলে কাজ ভালো হয়।

ভেষজ গুণাবলী সম্পাদনা:

গাদা ফুল গাছের ভেষজ গুণাবলি রয়েছে। কাঁটা স্থানে গাদা ফুল গাছের রস লাগালে ক্ষত স্থান থেকে রক্ত পরা বন্ধ হয়। গ্রামে এখনও এটি ক্ষতের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

আরও পড়ুন - প্রধান ফসলের সাথে এই মরসুমে ওলকপি চাষ করে আয় করুন অতিরিক্ত (Earn Extra Money By Cultivating Oleracea) অর্থ

Like this article?

Hey! I am KJ Staff. Did you liked this article and have suggestions to improve this article? Mail me your suggestions and feedback.

Share your comments

আমাদের নিউজলেটার অপশনটি সাবস্ক্রাইব করুন আর আপনার আগ্রহের বিষয়গুলি বেছে নিন। আমরা আপনার পছন্দ অনুসারে খবর এবং সর্বশেষ আপডেটগুলি প্রেরণ করব।

Subscribe Newsletters