কৃষি ও জলসেচে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে ইসরায়েলের অভিজ্ঞতা

Wednesday, 16 May 2018 12:10 PM

কৃষি ও জলসেচে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে ইসরায়েলের অভিজ্ঞতা

ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের একটি ছোট (আয়তনে ২১,৪৭১ বর্গ কি.মি.) সমৃদ্ধশালী ও উন্নত দেশ। এখানকার জলবায়ু শুষ্ক গরম ও হালকা শীত প্রকৃতির। ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিকাঠামো – রিপাবলিক; রাজধানী – জেরুজালেন; জনসংখ্যা – ৮.২ মিলিয়ন; ভাষা – হিব্রু, আরবী ও ইংরাজী; ধর্ম – ইহুদী, মুসলমান, ক্রিস্টান ও অন্যান্য। ২০১৩ সালের অর্থনীতি অনুযায়ী এখানকার জি ডি পি - $২৭৩ বিলিয়ন; জনপ্রতি জি ডি পি $৩৬,০০০(PPP) ; জি ডি পি বৃদ্ধি – ৩.২%; জনবৃদ্ধি – ১.৮%; বেরোজগারী – ৬.৩%; রপ্তানী - $৯৫ বিলিয়ন; আমদানী - $৯৪ বিলিয়ন।

ইসরায়েলের কৃষি প্রযুক্তি ক্ষেত্র তথ্য ও পরিসংখ্যান –

  • ২৮০ টি কৃষি প্রযুক্তি কোম্পানী
  • ২০০ কৃষি সংক্রান্ত রপ্তানীকারক
  • ৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানী বানিজ্য
  • শ্রম – গত ৬০ বছরে ১৭% থেকে কমে ২.৬%
  • চাষযোগ্য জমি – ২০% কমেছে
  • জলের ব্যবহার – ৫০% কমেছে
  • উৎপাদনের মূল্য ০.৫ ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ ডলার

ইসরায়েলের কৃষির ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য সমূহ -

জল –

  • দীর্ঘমেয়াদী স্বল্পতা,
  • বৃষ্টিপাত স্বল্প, তারতম্যযুক্ত ও বিক্ষিপ্ত,
  • মাত্র তিন মাসের মধ্যেই সারা বছরের মোট বৃষ্টিপাত,
  • ক্রমাগত খরার প্রাদুর্ভাব।

মাটি – বালি থেকে পলি মাটি;

জলবায়ু – ভূমধ্যসাগরীয়, উপক্রান্তীয়, আধাশুষ্ক ও শুষ্ক।

 

উচ্চতা-অবস্থান -  সি লেভেল থেকে ৪০০-১২০০ মিটার উঁচুতে।

ইসরায়েলী কৃষি প্রযুক্তির উন্নতির বৈশিষ্ট্য সমূহ –

  • কৃষির অভিমুখ হল ব্যবসায়ীক ও একটি স্থানীয় ছোট কৃষি বাজারের দিক নির্দিষ্ট থাকে
  • প্রতি নিয়ত নতুন বাজারের দিকে
  • নতুন উৎপাদনের দিকে
  • উচ্চগুণমানের উৎপাদন নির্ভরযোগ্য দামে পরিবোশন
  • ইসরায়েলের কাঁচা কৃষি উৎপাদনের ৩০-৩৫% রপ্তানী হয়
  • কৃষি ভিত্তিক শিল্পের রপ্তানী ৫০%
  • কৃষিতে প্রতিনিয়ত সহযোগীতা রয়েছে উৎপাদক – গবোষণা – কৃষি সম্প্রসারণ ক্ষেত্রে ও কৃষি বানিজ্যের মধ্যে

ইসরায়েলের বিভিন্ন কৃষি মডেল – “একজন ক্ষুদ্র চাষী এখানে একা নয়”

  1. ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বীজ থেকে প্লেট অবধি খাদ্য উৎপাদন কৃষি ফসলের প্রতিটির সমন্বয়।
  2. স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে একটি কেন্দ্রীয় খামার থেকে ছোট কৃষি খামারগুলির মধ্যে সমন্বয়।
  3. চুক্তি চাষের মাধ্যমে চাষিরা উৎপাদন করে বড় প্রক্রিয়াকরণ ও বিপনন ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রের জন্য।

ইসরায়েলের জলসম্পদের পটচিত্র –

  1. জল ও বর্জ্য জলের ব্যবস্থাপনা

ইসরায়েল –এর জলের ঘাটতি

  • প্রাকৃতিক জল রিফিল ১১.৭০ এম সি এম,
  • জল ব্যবহার ২০৩০ এম সি এম,
  • বাৎসরিক ঘাটতি ৪৫% প্রতিদিন গৃহে ব্যবহার জন প্রতি ২৫০ লিটার,
  • বাৎসরিক নিকাশী গড় ৫২০ এম সি এম।
  1. কিভাবে ঘাটতি মেটাচ্ছে ইসরায়েল (সমাধান)
  • ৪৭৫ এম সি এম নিকাশী জল সংগ্রহ করে আবার শোধন করা হচ্ছে যা ৯১%
  • এর মধ্যে ৭৫% বা ৩৬০ এম সি এম ব্যবহার হচ্ছে জল সেচের কাজে
  1. জল সম্পদের ব্যবহার
  • শিল্পে – ৬%
  • প্রাকৃতিক – ৩%
  • কৃষি – ৪৯%
  • প্রতিবেশী – ৭%
  • গৃহস্থলী কাজে - ৩৫%
  • মোট জলের চাহিদা ২০১০ এম সি এম / বছর

কীভাবে ইসরায়েল জলসেচকে কার্যকরী জলসেচে নিয়ে গেছে ?

ইসরায়েল উদ্ভাবন করেছে ড্রিপসেচ ব্যবস্থা যা হল সর্বোত্তম ব্যবস্থা, উপযোগী জল ব্যবহারের ক্ষেত্রে। এতে জলের অপচয় চাষীর ইচ্ছাধীন থাকে। অত্যাধুনিক জলসেচ ব্যবস্থা ও প্রযুক্তির ব্যবহার করা যায় ও গাছের চাহিদা অনুযায়ী জলসেচ করা যায়।

গবেষণার ক্ষেত্রে ইসরায়েল “ প্রিসিসন এগ্রিকালচার” এর মাধ্যমে জলের পরিমাপের জন্য “থার্মাল ইমেজিং” প্রযুক্তির ব্যবহার করছে। “থার্মাল ইমেজিং” ফসলের জলের চিত্র তুলে ধরে যার পার্থক্য খালি চোখে বোঝা যায় না।  এই থার্মাল ইমেজিং ব্যবহার করে ‘ওয়াটার স্ট্যাটাস ম্যাপ’ বানানো যায়, যার থেকে জলসেচ করা উচিত না উচিত নয় বোঝা যায়।

গবেষণার ক্ষেত্রে ইসরায়েল অত্যধিক নোনা জলকেও কৃষি কাজে ব্যবহার করার উপায় বের করেছে –

  • হ্যালোফাইট উদ্ভিদ নোনা জায়গায় জন্মায়
  • নানা প্রজাতির উদ্ভিদের সম্ভার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হয়েছে।
  • শুষ্ক দক্ষিণভাগে নোনা জায়গায় স্যালিকোর্নিয়াকে অর্থকরী ফসল হিসেবে চাষ করা হচ্ছে। এই উদ্ভিদকে স্যালাড সবজি হিসেবে রপ্তানী করা হচ্ছে।

ভারত – ইসরায়েল কৃষি সম্পর্ক

দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে কৃষি ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গত ২২ বছরে বানিজ্য ১৯২ মিলিয়ন ডলার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার এসেছে। অনেকগুলি  উল্লেখযোগ্য দিপাক্ষিক চুক্তি হয়েছে কৃষি , জলসেচ, ডেয়ারী ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে। ৩০০০ এর বেশী চাষি প্রতি ৩ বছর অন্তর ইসরায়েলের  “এগ্রি-টেক”  এক্সিবিশনে যায়। প্রচুর পরিমানে চাষীরা ইসরায়েলের  উদ্ভাবনী কৃষিপ্রযুক্তি প্রত্যক্ষ করতে আগ্রহী হচ্ছে কারণ “সেন্টার অফ এক্সেলেন্স” প্রকল্পে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন হচ্ছে ভারতে।

ইন্দো ইসরায়েল এগ্রিকালচারাল প্রজেক্ট (IIAP)

ভারতবর্ষের এগ্রিকালচারকে ইসরায়েলের মতো প্রযুক্তিগতভাবে আরো উন্নত করার উদ্দেশ্যে MASHAV (ইসরায়েল এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ও বিদেশ মন্ত্রক) ভারতে মোট ৩০ টি  “সেন্টারস্ অফ এক্সেলেন্স” তৈরী করা হয়েছে  সবজি, ফুল, লেবু, বেদানা , আম ও খজুর উৎপাদনে। ভারতের ১৬ টি রাজ্যে এই প্রজেক্টের উপর কাজ চলছে। হরিয়ানা সহ অন্যান্য রাজ্য গুলি হল পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, রাজস্থান, কর্নাটক, মিজোরাম, উত্তর প্রদেশ, বিহার, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশ ও গোয়া। এই সমস্ত ‘সেন্টারস্ অফ এক্সেলেন্স’ গুলির ফান্ড আসবে MID (মিশন ফর ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ইন হর্টিকালচার),  কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার কাছ থেকে। ইসরায়েল সরকার প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে। পশ্চিমবঙ্গে সবজিচাষের জন্য ‘সেন্টারস্ অফ এক্সেলেন্স’ (CoE) করা হয়েছে হর্টিকালচার দপ্তরের চুঁচুড়া হর্টিকালচার ফার্মকে।

 

ইন্দো ইসরায়েল এগ্রিকালচারাল প্রজেক্ট (IIAP) এর উদ্দেশ্য

  • ফসল বৈচিত্র বাড়ানো
  • উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো
  • প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার উপযোগীতা বাড়ানো।

হরিয়ানার ঘরোন্দায় মডেল ‘সেন্টারস্ অফ এক্সেলেন্স’(CoE)

আচ্ছাদনের মধ্যে সবজি চাষ প্রযুক্তি সাফল্য গাথা –

  • এশিয়ার মধ্যে সর্ব-বৃহৎ সবজির অত্যাধুনিক নার্শারী
  • শশার মত ফসলে উৎপাদন ক্ষমতা ভারতীয় গড় উৎপাদনের ১০ গুণ বেশী করা সম্ভব হয়েছে।
  • ২ বছরে ২০০০০ পরিদর্শনকারী প্রযুক্তির পাঠ নিয়েছে
  • সবরকমের পরিস্থিতিতে সবজিচাষের নতুন দিশা
  • চাষি, ছাত্র ও কৃষি আধিকারীকদের প্রশিক্ষণের এক উৎকর্ষ কেন্দ্র
  • ভারত ও আফগানিস্তানের প্রতি রাজ্যের কৃতি আধিকারীকরা এখানে প্রশিক্ষণ নিতে আসেন।

মহারাষ্ট্রের দাপোলী – আলফানসো আমের উৎকর্ষকেন্দ্র (CoE)

এখানে সাফল্য এসেছে পুরোনো অফলদায়ী গাছের পুনোরজ্জীবন ও অতি ঘনত্বের বাগিচা গ্রাফটিং পদ্ধতিতে স্থাপনে –

  • চাষীরা গত ১০০ বছর আম চাষ করে আসছে তারা নতুন প্রযুক্তি নিতে আগ্রহী ছিল না।
  • পুনোরুজ্জীবনের পরে ফল আসতে ৩ বছর নেয় তাই সীমিত এই প্রযুক্তির ব্যবহার হয়েছিল।
  • গাছ কাটাতে এক সামাজিক বাধাও ছিল।
  • তিনজন চাষীর ৩৩ টি গাছ নিয়ে পুনোরুজ্জীবন শুরু হয়।
  • পরে ৩৯ জন চাষির ২০৫ টি গাছে এই প্রযুক্তি ব্যবহার হয়
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরের ১৫৪৮ টি ও ১০৮ জন চাষীর ৬৫২ টি গাছে এই প্রযুক্তির ব্যবহার হয়।
  • ফল হয়েছে অকল্পনীয় ও নতুন চাষীরা এই প্রযুক্তিতে প্রতিনিয়ত আগ্রহী হচ্ছে।

নাগপুরে লেবুর উৎকর্ষ কেন্দ্র (CoE)

প্রযুক্তির ব্যবহার হয়েছে রিজ করে অতি ঘনত্বের বাগান  -

লেবু চাষে কী অসুবিধা ছিল?

  • লেবুর প্রতি একরে কম ফলন
  • ফাইটপথোরা রোগে লেবুর বাগান নষ্ট হত।
  • ড্রিপ ব্যবস্থা পরিচর্যার অভাবে নষ্ট হত।

ইসরায়েলী প্রযুক্তি কীভাবে সাফল্য নিয়ে এলো ?       

  • রিজ করে চাষ জলসেচের অতিরিক্ত প্রবাহ কমালো।
  • লেবুর তাড়াতাড়ি বাড় বৃদ্ধি যা ফাইটপথোরা রোগ থেকেও রক্ষা করলো।
  • মা গাছের আচ্ছাদনের মধ্যে রিজার্ভ নার্শারী তৈরি হল।
  • রোগ পোকা ও গবেষণায় পরীক্ষাগার ব্যবস্থা চালু হল।
  • অগ্রনী চাষিদের দ্বারা প্রযুক্তি কাজে লাগানো হল।
  • মনরেগার অর্থ বরাদ্দ ও প্রকল্প কাজে লাগিয়ে তিনটি মডেল প্লট গড়ে তোলা হল।

 

পশ্চিমবঙ্গে সেন্টার অফ এক্সেলেন্স বা উৎকর্ষ কেন্দ্র সবজির আচ্ছাদনের মধ্যে চাষ প্রযুক্তির উদ্দেশ্যে চুঁচুড়া ফার্মে গড়ে তোলা হবে। রাজ্যের উদ্দানপালন দপ্তর এম আই ডি এইচ থেকে ১০ কোটি টাকা ইতিমধ্যে পেয়েছে। প্রকল্প গড়ার কাজ শুরু হয়েছে।

রুনা নাথ।

 

 

 


CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.