শিশুর প্রাথমিক পুষ্টিতে মায়ের প্রথম দুধ জরুরী

Saturday, 04 August 2018 01:09 PM

সদ্যোজাতদের প্রথম খাদ্যের মালিক শিশুর মা নিজেই। আর সদ্যোজাতর জন্য মায়ের দুধের কোনও বিকল্পও নেই। ১-৭ অগস্ট পৃথিবী জুড়ে পালন করা হচ্ছে ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’। মায়ের দুধকেই শিশুর প্রাথমিক ও প্রধান খাদ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং এই ঘোষণাটি প্রতিষ্ঠিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

জন্মের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে স্তন্যপান করানো উচিত কোলোস্ট্রামের জন্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন, বা ‘হু’)- র নির্দেশ অনুযায়ী, জন্মের ১ ঘণ্টার মধ্যেই শিশুকে স্তন্যপান করালে ভবিষ্যতে নানা অসুখ-বিসুখকে দূরে রাখে তা। পাশাপাশি বুদ্ধির বিকাশ হয় দ্রুত।

প্রসবের ঠিক পর পরই মায়ের স্তনবৃন্ত থেকে ঈষৎ হলদেটে ঘন দুধ নিঃসৃত হয়, বাংলায় যাকে বলে শালদুধ, জীব বিজ্ঞানের ভাষায় এই দুধকে বলা হয় কোলোস্ট্রাম। পুষ্টি বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘তরল সোনা’।প্রসবের পর ম্যামারি গ্ল্যান্ডে জমে থাকা ঘন কোলোস্ট্রাম, স্বাভাবিক মাতৃদুগ্ধের থেকে প্রায় ১০ গুণ ঘন হয়।

প্রসবের পর মোটে ২–৩ দিন এই দুধ নিঃসৃত হয়। কোলোস্ট্রাম নিঃসরণের পরিমাণ অত্যন্ত কম। সারা দিনে মাত্র কয়েক চামচ। তবে তা নিয়ে চিন্তা করার কোনও কারণ নেই, কারণ, সদ্যোজাতর পাকস্থলির আকারও একটা মার্বেল গুলির মত। যদিও প্রতি মুহূর্তে পাকস্থলী আকারে বাড়ে। তবে তার পরও ওইটুকু কোলোস্ট্রাম যথেষ্ট শিশুদের পক্ষে।

কোলোস্ট্রাম জীবাণু আটকায়

কোলোস্ট্রামে আছে IgA নামক এক বিশেষ ধরণের অ্যান্টিবডি— যা সদ্যোজাতর মুখগহ্বর, গলা থেকে শুরু করে ফুসফুস ও অন্ত্র প্রতিটি অঙ্গের রক্ষাকারী আবরণ মিউকাস মেমব্রেনকে সুরক্ষিত রাখে। মিউকাস স্তর মজবুত হলে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সহজ। এমনকি, যদিও বা সংক্রমণ হয় তা-ও বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌছতে পারে না। বিশেষ করে যে সব শিশু নির্ধারিত সময়ের আগে ভূমিষ্ঠ হয়েছে, অর্থাৎ প্রি টার্ম বেবি, তাদের শ্বাসনালী ও ফুসফুসে সংক্রমণের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি। তাই শালদুধ এই শিশুদের জন্য অনিবার্য ।

পুষ্টির খনি কোলোস্ট্রাম

  • এতে শুধুই যে IgA অ্যান্টিবডি আছে তা নয়, সদ্য মায়ের প্রথম দুধে আছে এমন কিছু পুষ্টিকর উপাদান, যা শিশুকে দিলে তার জীবনভর সুরক্ষা প্রায় সুনিশ্চিত। মায়ের এই দুধ পান করলে শিশুকে ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিসের সমস্যায় ভুগতে হয় না। একই সঙ্গে মায়ের শরীরের সব হরমোন নিঃসরণ দ্রুত নির্দিষ্ট ছন্দে ফিরে আসে।
  • কোলোস্ট্রামে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় আছে এক বিশেষ ধরণের প্রোটিন সাইটোকাইনস। শরীরের প্রতিটি কোষের গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয় এটি। একই সঙ্গে জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে, ব্যথা কমাতে এবং অ্যান্টি টিউমার অ্যাক্টিভিটি বা টিউমার তৈরিতে বাধা দেয় সাইটোকাইনস।
  • এতে আছে লাইসোজাইম নামে এক বিশেষ ধরণের অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল এনজাইম। এটি ব্যাকটিরিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
  • মায়ের প্রথম দুধে আছে ল্যাক্টালবুমিন। এটি মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নামে নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দিয়ে বুদ্ধির বিকাশ ও মন ভাল রাখতে সাহায্য করে। এই রাসায়নিকটির প্রভাবে একাগ্রতা বাড়ে। গবেষণায় প্রমাণিত, ল্যাক্টালবুমিনের টিউমার ও ক্যানসার আটকানোর ক্ষমতা আছে।
  • সদ্য মায়ের প্রথম দুধ কোলোস্ট্রাম গ্রোথ ফ্যাক্টরে পরিপূর্ন। বাচ্চার ত্বক, পেশি, কার্টিলেজ, নার্ভ টিস্যু ও হাড় গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নেয় এই গ্রোথ ফ্যাক্টর। জন্মের পর প্রথম দু’-তিন দিন এই দুধ পান করলে প্রায় জীবনভর সুরক্ষিত থাকবে আপনার পরবর্তী প্রজন্ম।
  • প্রোটিন রিচ পলিপেপটাইড বা ‘পিআরপিএস’ সমৃদ্ধ কোলোস্ট্রাম নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, ই-কোলাই, রোটা ভাইরাস, সিগেলার মতো মারাত্মক জীবাণুদের হাত থেকে এটি আজীবন সুরক্ষা দিতে পারে। এই প্রসঙ্গে একটা কথা জেনে রাখা ভাল যে, আমাদের দেশ-সহ প্রায় সব ক’টি উন্নয়নশীল দেশে রোটা ভাইরাসের সংক্রমণে অজস্র সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যু হয়। কোলোস্ট্রাম খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে অনায়াসে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়।এগুলো ছাড়াও কোলোস্ট্রামে আছে গ্লাইকোপ্রোটিন, ইমিউনোগ্লোবিউলিন, ল্যাক্টোফেরিন-সহ অজস্র উপাদান। যা একজন মানবশিশুর সুস্থ শরীর ও মন গড়ে তুলতে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা নেয়। তাকে দিতে পারে সুস্থ নীরোগ দীর্ঘজীবন।
  • আজকের এই সাইবার যুগেও মায়ের প্রথম দুধকে ‘উইচ মিল্ক’ বলে ফেলে দেওয়ার কু-সংস্কার আছে। এই ভুল ধারণা ভেঙ্গে মায়ের কোলে তুলে দিন সদ্যোজাত সন্তানকে। এই অমৃত পান করে আজীবন সুস্থ থাকুক আপনার সন্তান।

- Sushmita Kundu

 

Share your comments



Krishi Jagran Bengali Magazine Subscription Subscribe Online


Download Krishi Jagran Mobile App

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.