আত্মনির্ভরতার স্থায়ী সমাধান, গোষ্ঠী নির্ভর উন্নয়নের মাধ্যমে

KJ Staff
KJ Staff
Sustainable agriculture (Image Credit - Google)
Sustainable agriculture (Image Credit - Google)

ভারতবর্ষ দেশটা তার গ্রামে বাস করে। প্রতি ১০০ জনের দুই-তৃতীয়াংশ কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত এবং নিরলস পরিশ্রমের দ্বারা খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন বাকিদের ঘরে ঘরে। এসমস্ত রাশিবিজ্ঞানের সরল তথ্য অনেক বছর ধরে যারা কৃষি বিষয়ে অল্প বিস্তর গবেষণা করছি তাদের সকলেরই জানা। তবু, কৃষি অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল দেশের তথা রাজ্যের কৃষকের আয়ের সূচক ক্রমশ নিম্নগামী।

দেশে বেকারত্ব - 

২০১৮ সালের ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর এক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন দেশের ১০ জন মানুষ বেকারত্বের কারণে আত্মহত্যা করেছেন। অতএব, বেকারত্বের কারণে ভারতীয় মধ্যবিত্ত জনমানুষে আত্মহত্যার ধারা আগে থেকেই আছে। করোনা অন্তর্বর্তী সময় সেই ধারাকে ত্বরান্বিত করেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। জাতিসংঘের রিপোর্টেও ভারতবর্ষের প্রায় ১৩ কোটি যুবক-যুবতীর ক্ষুদ্র ব্যবসা বা অসংগঠিত ক্ষেত্রে রোজগারের সঙ্গে যুক্ত এমন মানুষের কাজ হারানোর শঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে ইতিপূর্বেই। এই দুঃসময়ে রোজগারের সুদুরপ্রসারী পথ বাতলানোই একমাত্র চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রথমেই মনে রাখা দরকার, সুস্থায়ী রোজগারের বন্দোবস্ত করা কিন্তু অল্প সময়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা মাফিক উন্নয়নের রূপরেখা তৈরির। বেকার যুবক-যুবতীদের গোষ্ঠীবদ্ধ করে নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের মাধ্যমে দেশব্যাপী বেকারত্বের সূচক অধগামী করা যেতেই পারে। নির্দিষ্ট কোনো পণ্য উৎপাদন ও দেশ-বিদেশে বিপণনের বিস্তৃত বাজার এরকম গোষ্ঠীগুলোকে স্বনির্ভর করে তুলবে। পরবর্তীতে এই গোষ্ঠী নির্ভর স্বনির্ভরতাই গোষ্ঠীর সদস্যদের আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে দেবে অনেকখানি। তবে, প্রথমেই বললাম এই গোষ্ঠী গঠন ও গোষ্ঠী নির্ভর উৎপাদনের মাধ্যমে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা। উদাহরণ মাফিক ধরা যাক, কোনো এক গ্রামে চাষিরা ধারাবাহিকভাবে চাষ করে আসছেন বংশপরম্পরায়। নির্দিষ্ট শস্যপর্যায়ে চাষ করে উৎপাদন করছেন অনেক রকম ফসল। এবার সেই গ্রামের নির্দিষ্ট কোন এক চাষিকে সমীক্ষা করে যদি তার চারপাশে সমস্যাগুলো দেখা যায় তবে ফসলের সঠিক দাম না পাওয়া, বিপণনের সমস্যা, ফসলের পুরনো জাত বছরের পর বছর চাষ করায় উৎপাদন হ্রাসের সঙ্গে আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় চাষের ক্ষতির দিকগুলো উঠে আসবে। সমস্যা গুলো খুব জোরালো না হলেও, একজন ক্ষুদ্র বা মাঝারি কৃষকের পক্ষে নিজের আর্থসামাজিক জায়গায় দাঁড়িয়ে এই সমস্যা গুলোর মোকাবিলা করা বেশ কঠিন। এবার দেখা যাক, এরকম অনেক কৃষক গোষ্ঠীবদ্ধভাবে চাষাবাদ করলে সমস্যা গুলোর কতটা সমাধান সম্ভব। গোষ্ঠীবদ্ধভাবে একসঙ্গে অনেক কৃষক চাষাবাদ করলে ফসলের সঠিক দাম পেতেন বা তাদের উৎপাদিত ফসলের বিপণনের সমস্যা দূর হতো নিমেষেই।

কৃষকদের লাভের পন্থা - 

পাশাপাশি, গোষ্ঠীর মাধ্যমে সরকারি কৃষি দপ্তরে সহযোগীতায় ফসলের নতুন জাত, চাষের পদ্ধতি বা চাষের নতুন প্রযুক্তিগুলি সম্বন্ধে গোষ্ঠীর সদস্য কৃষক ভাইয়েরা অনায়াসেই জানতে পারতেন। এই সুবিধা গুলি থেকে কিন্তু একজন কৃষক বঞ্চিত হন। তার নিজের প্রয়াসে এতদূর পর্যন্ত তিনি পৌঁছতে পারেননা। আর ভারতবর্ষের মতো ঘন জনবসতিপূর্ণ দেশে একজন কৃষি আধিকারিক বা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীও একক কৃষক পরিষেবা প্রদান করতে পারেন না। কৃষকের সংখ্যা আনুপাতিক সম্প্রসারণ কর্মীর সংখ্যায় অপ্রতুলতাই স্বতন্ত্র কৃষক পরিষেবা দেওয়ার  ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। সেক্ষেত্রে গোষ্ঠীবদ্ধ হলে আখেরে লাভ কৃষকেরই। পাশাপাশি, গোষ্ঠী গঠনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোন অঞ্চল যে যে কৃষিপণ্য ও প্রাণিজ সম্পদ উৎপাদনে এগিয়ে আছে, সেই অঞ্চলে ওই বিশেষ পণ্য উৎপাদনে আরও জোর দেওয়া যায় এতে উৎপাদনের পরিমাণ অবশ্যই বাড়বে এবং অতিরিক্ত লাভের অবশ্যই সন্ধান পাবেন কৃষকেরা।

এবার আসা যাক গোষ্ঠী গঠনের পদ্ধতিতে। কোন নির্দিষ্ট গ্রামে গোষ্ঠী গঠনের ক্ষেত্রে, প্রথমেই সেই গ্রামের কৃষিজীবী মানুষদের ওপর সমীক্ষার মাধ্যমে কৃষিকাজের সমস্যাগুলির চিহ্নিতকরণ-ই হবে প্রথম কাজ। পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক মানদণ্ড অনুযায়ী ওই গ্রামের বৃহৎ ও ক্ষুদ্র বা মাঝারী চাষীদের তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর ৮০-১০০ জন চাষীকে নিয়ে গোষ্ঠী গঠনই হবে প্রথম লক্ষ্য। সেখানে আনুপাতিক হারে প্রান্তিক চাষী বা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া চাষীদের সঙ্গে প্রগতিশীল চাষীদের রাখতে হবে। প্রতি ১০ জনে ৯ জন প্রান্তিক চাষী বা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া চাষী এবং একজন প্রগতিশীল চাষী কে রেখে গোষ্ঠী গঠন করতে হবে। এতে নতুন নতুন প্রযুক্তি বা চাষের পদ্ধতির আদান-প্রদান হবে খুব সহজেই। গোষ্ঠী গঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি কৃষি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে চাষাবাদের নতুন নতুন প্রশিক্ষণও পাবেন এই প্রান্তিক কৃষিজীবী মানুষগুলো।

আরও পড়ুন - জেনে নিন এপ্রিকট বা খুবানি ফল চাষের বিবরণ

এখানে মনে রাখতে হবে, গোষ্ঠীগঠন করে গোষ্ঠীর বিভিন্ন উচ্চপদে সদস্যদের দ্বারা মনোনীত কোনো ব্যক্তিকেই বসানো প্রয়োজন। এতে, সুষ্ঠ ও নিয়মমাফিক কৃষক গোষ্ঠী চালানো যাবে অনায়াসে। প্রয়োজনে দীর্ঘদিন কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকেও এই সমস্ত পদে বসানো যেতে পারে। উপযুক্ত ব্যক্তিকে এই সমস্ত পদে না বসলে অচিরেই কৃষকগোষ্ঠী বিপথগামী হয়ে যাবে। এই জায়গায় সুদীর্ঘ সাত দশক ধরে সাফল্যের সাথে পেরিয়ে আসা গুজরাটের আমূল দুগ্ধ সমবায়ের উদাহরণ নেওয়া যেতেই পারে। ডক্টর বার্গিস কুড়িয়ানের ঐকান্তিক চেষ্টায় গুজরাটের কয়রা জেলার দুগ্ধ উৎপাদকদের সমবায় আজ ভারত তথা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় সমবায়। কিন্তু যেটা এখনই বোঝা দরকার, তা হলো এই সাফল্য একদিনে আসেনা। সমবায় গঠনের জন্য প্রয়োজন সমবায় গঠনের মানসিকতা। যা পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যের মানুষের মধ্যে নেই বললেই চলে। অবশ্য , এ আমার ব্যক্তিগত মতামত। পরের ভাগে সমবায় গঠনের নীতিসমূহ ও তার পিছনের সমাজ বিজ্ঞান নিয়ে আরো বিশদে আলোচনা করব। শেষ করার আগে শুধু এটুকুই বলতে চাই, আত্মনির্ভরতার পথে পশ্চিমবঙ্গকে গোষ্ঠিনির্ভর উন্নয়নের ধারায় স্নাত করতে আজ একজন ভার্গিস কুড়িয়ানের বড়ই প্রয়োজন।

আরও পড়ুন - চাহিদা বাড়ছে লাভজনক গ্রীষ্মের ফুলকপি চাষে, রইলো চাষ পদ্ধতি ও জাতসমূহ

Like this article?

Hey! I am KJ Staff. Did you liked this article and have suggestions to improve this article? Mail me your suggestions and feedback.

Share your comments

আমাদের নিউজলেটার অপশনটি সাবস্ক্রাইব করুন আর আপনার আগ্রহের বিষয়গুলি বেছে নিন। আমরা আপনার পছন্দ অনুসারে খবর এবং সর্বশেষ আপডেটগুলি প্রেরণ করব।

Subscribe Newsletters