কৃত্রিম প্রজননের মাধমে শিঙ্গি মাছের পোনা উৎপাদন ও চাষের কৌশল

Saturday, 13 March 2021 11:53 PM
Singi Fish (Image Credit - Google)

Singi Fish (Image Credit - Google)

শিঙ্গি মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Heteropneustes fossilis। আমাদের দেশে শিঙ্গি মাছ অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাছ। খেতে খুবই সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর এই মাছের চাহিদা এবং বাজার মূল্যও অধিক। অত্যন্ত সুস্বাদু এই মাছটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা এবং চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পোনা উৎপাদনের লক্ষ্যে  মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে গবেষণার মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন এবং চাষ ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।

আমাদের দেশের অসংখ্য পুকুর ডোবা এবং নীচু জলাভূমি রয়েছে যেখানে শিঙ্গি মাছ চাষকরা সম্ভব। আধুনিক চাষ প্রযুক্তির মাধ্যমে কার্পজাতীয় মাছের চেয়ে লাভজনক ভাবে শিঙ্গি মাছ চাষ করা (Profitable Fish Farming) যেতে পারে।

প্রজনন ও চাষ ব্যবস্থাপনা (Fish Farming) - 

শিঙ্গি মাছের চাষ লাভজনক এবং এই মাছ বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের উপযোগী হলেও পোনার অপ্রতুলতা হেতু এর চাষ তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত পোনা ব্যাপক চাষাবাদের জন্য যথেষ্ট নয়। এই জন্যই কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন একান্ত জরুরী। কৃত্রিম প্রজনন ও চাষ ব্যবস্থাপনার ধাপ গুলো নিম্নরূপঃ

প্রজননক্ষম মাছ সংগ্রহ ও পরিচর্যা - 

কৃত্রিম প্রজননের জন্য ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারী মাসে প্রাকৃতিক উৎস থেকে সুস্থ সবল স্ত্রী ও পুরুষ মাছ সংগ্রহ করতে হবে। প্রতি হেক্টরে ১০,০০০টি মাছ মজুদ করতে হবে। মজুদকৃত মাছগুলোকে প্রতিদিন দেহের ওজনের শতকরা ৫-৬ ভাগ হারে সম্পুরক খাবার সরবরাহ করতে হবে। বাজারে প্রচলিত বাণিজ্যিক খাবার ব্যবহার করা যেতে পারে অথবা শতকরা ৪০ ভাগ ফিশমিল, ২০ ভাগ সরিষার খৈল, ২০ ভাগ চালের কুড়া, ১৫ ভাগ গমের ভূষি, ৪ ভাগ চিটাগুড় এবং ১ ভাগ ভিটামিন প্রিমিক্স সহযোগে এই খাবার তৈরী করা যেতে পারে। খাদ্যে প্রোটিন এর পরিমাণ ৩০ শতাংশ রাখতে হবে। মাঝে মাঝে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।

কৃত্রিম প্রজনন:

শিঙ্গি মাছ এক বৎসর বয়সেই প্রজনন উপযোগী হয়। সাধারণতঃ মে থেকে সেপ্টেম্বর/অক্টোবর মাস র্পযন্ত এরা প্রজনন করে থাকে। কৃত্রিম প্রজননের জন্য সুস্থসবল স্ত্রীও পুরুষ মাছ বাছাই করতে হবে। পুকুর থেকে মাছ ধরে দ্রুত এবং সাবধানতার সাথে সিমেন্টের ট্যাংক বা হাপায় স্থানান্তর করতে হবে এবং ক্রমাগত ৬-৮ ঘন্টা জলের প্রবাহ দিতে হবে।

হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগ:

শিঙ্গি মাছের ক্ষেত্রে শুধু মাত্র স্ত্রী মাছটিকেই হরমোন ইনজেকশন দিতে হয়। ইনজেকশন দেয়ার পর স্ত্রী ও পুরুষ মাছ আলাদা ট্যাংকে রাখতে হবে। ইনজেকশন দেয়ার ৮-১০ ঘন্টার মধ্যে স্ত্রী মাছের পেটে চাপ দিয়ে ডিম বের করা হয় এবং শুক্রানুর দ্রবণের সঙ্গে মিশিয়ে ডিম নিষিক্ত করা হয়। নিষিক্ত ডিম দ্রুততার সংগে ট্রেতে ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে ডিমগুলো জমাট বেধে না যায়। নিষিক্ত ডিম ৮-১০ সে.মি. জলেতে রেখে ক্রমাগত জলের ঝরণা দিতে হবে। ২০-২৪ ঘন্টার মধ্যে ডিম ফুটে রেনু পোনা বের হয়ে আসবে।

রেনু পোনা প্রতিপালন:

ডিম ফুটে রেণু পোনা বের হয়ে যাবার পর ডিমের খোসা সরিয়ে ফেলতে হবে। ডিম ফোটার ৩ দিন পর রেনু পোনাকে ডিমের কুসুম, টিউবিফেক্স ওয়ার্ম (ঞঁনরভবী ংঢ়ঢ়)। অথবা আর্টিমিয়া নপি-খেতে দেয়া হয়।

অঙ্গুলী পোনা উৎপাদন:

নার্সারী পুকুরে ৫-১০ দিন বয়সের ধানী পোনা মজুদ করে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে অঙ্গুলী পোনা পাওয়া যায়। নার্সারী পুকুর সঠিকভাবে প্রস্তু‘ত করে ৫-১০ দিন বয়সের ধানী পোনা শতাংশ প্রতি ৮০০০-১০,০০০ টি পর্যন্ত মজুদ করা যেতে পারে। নার্সারী পুকুর ১ মিটার উচু জাল দিয়ে ঘিরে দিতে হবে যাতে ক্ষতিকর ব্যাঙ, সাপ পুকুরে প্রবেশ করতে না পারে। প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন দেহের ওজনের ২ থেকে ৩ গুণ খাবার ২ বারে খাওয়াতে হবে। খাদ্য হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত চিংড়ি বা পাঙ্গাসের নার্সারী ফিড ব্যবহার করা যেতে পারে। পোনা ছাড়ার ৩০-৪৫ দিনের মধ্যে পোনার আকার গড়ে ৪-৫ সে.মি. হয়। পুকুর ছাড়াও স্টীলের ট্রে, সিমেন্টের ট্যাংক কিংবা জালের খাঁচায়ও অঙ্গুলী পোনা উৎপাদনকরা যেতে পারে। স্টীলের ট্রে, সিমেন্টের ট্যাংক কিংবা জালের খাঁচায় প্রতি বর্গমিটারে ১০০-২০০ টি ধানী পোনামজুদ করে ৩০-৪০ দিন পর অঙ্গুলী পোনা পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে খাদ্য হিসেবে নার্সারী ফিড বা জু-প্লাংকটন দেয়া যেতে পারে।

চাষ পদ্ধতি -

  • পুকুরের পাড় মেরামত করে পুকুর থেকে রাক্ষুসে মাছ সরিয়ে ফেলতে হবে।

  • প্রতি শতাংশে ১ কেজি চুন, ১০ কেজি গোবর, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১০০ গ্রাম টিএসপিসার প্রয়োগ করে পুকুর তৈরী করতে হবে।

  • সার প্রয়োগের ৪-৫ দিন পর পুকুরের জলে সবুজ বা হালকা বাদামী হলে পুকুরে শতাংশ প্রতি৭৫০-১০০০টি পোনা মজুদ করতে হবে।

আরও পড়ুন - উপযুক্ত রোগ বালাইয়ের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুকুরে পাঙ্গাস মাছ চাষের কৌশল

৯.খাদ্য প্রয়োগ -

খাবার হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ক্যাটফিশ ফিড কিংবা নিম্নোক্ত উল্লিখিত ফর্মুলা অনুযায়ী খাবার তৈরী করে দেওয়া যেতে পারে।

খাদ্য উপাদান ফর্মূলা- ১ ফর্মূলা- ২

ফিশ মিল ৪০% ২৫%

বোন এন্ড মিট মিল ০% ১৫%

সরিষার খৈল ২০% ২০%

চালের কুড়া ২০% ২০%

গমের ভূষি ১৫% ১৫%

চিটা গুড় ৪% ৪%

ভিটামিন ও খনিজ লবন ১% ১%

মাছের দেহের ওজনের ৪-৫% হারে দিনে ২ বার খাবার দিতে হবে।

রোগ ব্যবস্থাপনা:

  • শিঙ্গি মাছ একটু শক্ত প্রকৃতির মাছ হওয়ায় রোগ ব্যাধি খুব একটা দেখা যায় না।

  • পোনা মজুদকরণের সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে পোনা আঘাত প্রাপ্ত না হয়।

  • জলের গুণাগুণ নষ্ট হলে মাছে ঘা দেখা দিতে পারে। এই রোগে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন এবং ১ কেজি লবণ দুই বারে তিন দিন অন্তর প্রয়োগ করতে হবে।

  • এছাড়াও প্রতি মাসে পুকুরে ১/২ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করলে জলের গুণাগুণ ভালো থাকে।

মাছ আহরণ ও উৎপাদন:

  •  জাল টানার র্পূবে জলে কমিয়ে নিতে হবে।

  • পুকুরে জাল টেনে বেশীর ভাগ মাছ ধরতে হবে।

  • সুষ্ঠুভাবে পরিচর্যা করলে ৮-১০ মাসে হেক্টর প্রতি ৮০০০-৯৫০০ কেজি পর্যন্ত উৎপাদন হতেপারে।

আরও পড়ুন - পুকুরে মাগুর মাছের লাভজনক চাষ করে আয় করুন অতিরিক্ত অর্থ

English Summary: Production and cultivation techniques of singi fish fry through artificial insemination

আপনার সমর্থন প্রদর্শন করুন

প্রিয় অনুগ্রাহক, আমাদের পাঠক হওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার মতো পাঠকরা আমাদের কৃষি সাংবাদিকতা অগ্রগমনের অনুপ্রেরণা। গ্রামীণ ভারতের প্রতিটি কোণে কৃষক এবং অন্যান্য সকলের কাছে মানসম্পন্ন কৃষি সংবাদ বিতরণের জন্যে আমাদের আপনার সমর্থন দরকার। আপনার প্রতিটি অবদান আমাদের ভবিষ্যতের জন্য মূল্যবান।

এখনই অবদান রাখুন (Contribute Now)

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.