(Chrysanthemum flower cultivation) বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চন্দ্রমল্লিকা ফুলের চাষ করে উপার্জন করুন অধিক অর্থ

KJ Staff
KJ Staff
Chrysanthemum flowers
Chrysanthemum flowers

পথিবীর বুকে যত ধরনের ফুল চাষ হয় তাদের মধ্যে চন্দ্রমল্লিকার ফুলের উৎপাদন দ্বিতীয় স্থানে অর্থাৎ বিশ্ব বাজারে এর স্থান দ্বিতীয়, ঠিক গোলাপের পরে। এর জন্ম চিনদেশে হলেও আমাদের দেশে বেশ কয়েকটি রাজ্যে এর চাষ খুব ভালোভাবে হয়, যেমন পশ্চিমবঙ্গ, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, দিল্লী, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব ও হরিয়ানাতে। আমাদের দেশে এই ফুলটি এসেছে প্রায় ৭০০-৮০০ বছর আগে জাপান দেশের হাত ধরে। বর্তমানে এই ফুলটির চাষ যেমন ছেদন ফুল, তেমনি আলগা ফুল, এছাড়াও টবে তৈরি গাছ ও বাগান সাজাতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মানুষের আর্থিক উন্নতির সাথে সাথে বাজারে এর চাহিদা দিনে দিনে বাড়ছে। 

বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এই ফুলটি নিয়ে দীর্ঘ কয়েক বছর গবেষণা চালিয়ে কতগুলি তথ্য সংগ্রহ করেছে। সেই তথ্যগুলি চাষীভাইদের চাষের সুবিধার্থে এই অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ করা হল, যা আগামী দিনে সব ধরনের চাষী ভাইদের এই ফসলটির চাষের ক্ষেত্রে সুবিধা হবে।

১) উপযুক্ত জাতগুলি:

বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের খামারে পাওয়া যাবে।

(ক) আলগা ফুলের জন্য: বাসন্তি, বাসন্তিকা, বিধান লালিমা, বিধান চন্দ্রমল্লিকা-৭, বিধান চন্দ্রমল্লিকা-১৭, বিধান মাধুরী, বিধান তরুণ, তমারা, গৌরী, আরকা গোল্ড ইত্যাদি।

(খ) ছেদন বড় ফুলের জন্য: বিগ ভায়োলেট, হোয়াইট জেম, ইয়েলো জেম, পুসা সেন্টিনারি, কুনচিৎ, পুসা অরুণিমা, পুসা তাইচেন কুইন ইত্যাদি।

(গ) ছোট ছেদন ফুলের জন্য: অগ্নিশিখা, অজয়, আনমোল, বিধান মল্লিকা, বাসন্তি, বাসন্তিকা, গৌরী, নানাকো, ইয়েলো বয়, মাগি, পূজা, শোভা, বিষ্ণুপ্রিয়া, বিধান মাম, বিধান প্রদ্যোৎ, বিধান মাধুরী ইত্যাদি।

(ঘ) টবে ও বাগান সাজানোর জন্য: বিধান জয়ন্তি, বিধান রজত, বিধান তরুণ, বিধান সবিতা, বিধান গোল্ড, হিমাংশু, মাদার টেরেজা, পিঙ্ক স্টার, রেড বল, সৎভাবনা, হোয়াইট অনিমন ইত্যাদি।

(ঙ) টবে ফুল দেয় সারাবছর এমন জাত: অজয়, আনমোল, বিধান প্রদ্যোৎ, পুশা আদিত্য, বিধান পূর্ণা, বিধান মাধুরী, বিধান মল্লিকা এ-১৮/২২, বিধান-১৩ ইত্যাদি।

২) চন্দ্রমল্লিকা চাযের জন্য উপযুক্ত জমি ও মাটি:

চন্দ্রমল্লিকা চাষের জন্য উঁচু জমি প্রয়োজন যেখানে বৃষ্টিতে জল জমা হবে না, দিনভর সূর্যের আলো থাকবে ও সমতল ভূমি হবে। বেলে-দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি এই ফসল চাষের পক্ষে উপযুক্ত। কাদা ও একদম বেলে মাটিতে এর চাষ করা যাবে না।

৩) জলবায়ু:

চন্দ্রমল্লিকা গাছের বৃদ্ধির জন্য দিন ও রাত্রের তাপমাত্রা যথাক্রমে ২২ ও ১৬ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড প্রয়োজন, তবে এই ফুল গাছ ১৫-২৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত ভালো থাকে। বর্ষাকাল থেকে শীতের শেষ পর্যন্ত পলিহাউসের মধ্যে চাষ করা যেতে পারে। যেহেতু শীতকালে হ্যালোজেন লাইট রাত্রি বেলাতে লাগালে গাছের ফলন বৃদ্ধি পায়, ফুল দেরিতে উৎপন্ন হয়। এইসব ফুলের বাজার দর অনেকটা পারিপার্শ্বিক অনুষ্ঠানের উপর নির্ভর করে, সেই জন্য অতিরিক্ত আলো দিয়ে দেরীতে ফুল ফোটানো হয় আবার আলোকে সরিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি ফুল ফোটানো হয়। অনেক সময় সাময়িক ছায়া তৈরী করে তাড়াতাড়ি ফুল ফোটানো হয়, আবার ফসফেট ও পটাশ সার একটু বেশি মাত্রায় প্রয়োগ করেও তাড়াতাড়ি ফুল ফোটানো হয়। যাই হোক না কেন পূর্ণ সূর্যের আলোতে এবং কম আর্দ্রতাযুক্ত ও ঠাণ্ডা জায়গাতে চন্দ্রমল্লিকার ফলন ভালো হয়।

Chrysanthemum flower farming
Chrysanthemum flower farming

৪) চারা তৈরি:

চন্দ্রমল্লিকা ফুলের চারা তৈরি করার পদ্ধতি খুব সহজ এবং সারাবছর এর চারা তৈরী করা যেতে পারে কাটিং করে। একজন চাষীভাই একদিনে ৫০০-৬০০ কাটিং করতে পারে। এমনভাবে গাছের শাখা কাটা হয় যাতে ৪-৫টি গাঁট থাকে। কাটা অংশের উপরে গাঁটের থেকে পাতাকে ছেটে কাটা অংশে শিকড় বেরতে সাহায্যকারী রুটিং হরমোন যেমন, সিরাডেক্স / অ্যারাডেকস, রুটেক্স/কাটিং এড প্রভৃতি কাটা অংশে লাগাতে হবে। এরপর একটি বালির বেড বানাতে হবে। ওই বেডকে ব্লাইটক্স ২ গ্রা/ লিটার জলে গুলে ধুইয়ে দিতে হবে। তার পর চন্দ্রমল্লিকার কাটিং ওই বালির বেডের মধ্যে ধান রোয়ার মত রোপণ করে যেতে হবে এবং প্রত্যহ সকালে ও বিকালে ঝারি দিয়ে জল দিতে হবে। এইভাবে ১৫ দিনের মধ্যে চারার শেকড় জন্মাবে এবং ২২-২৮ দিনে চারা তৈরি হয়ে যাবে। এইভাবে অনেকে চারা তৈরি করে দেশের প্রান্তে পাঠাচ্ছে, তবে চারা যে গাছ থেকে নেওয়া হবে সেই গাছটি যেন রোগমুক্ত ও স্বাস্থ্যবান হয়।

৫) জমি তৈরী ও চারা রোপণ (Land preparation and planting of saplings) :

সাধারণত যে জমিতে চন্দ্রমল্লিকা লাগানো হয় তা আলগা ও ছেদনফুল চাষের জন্য। এখানে মাটিকে ২-৩ বার ভালো করে লাঙ্গল দেওয়ার পর ঘাসমুক্ত করতে হবে। শেষ বার চাষ দেওয়ার সময় একরে ৬ টন গোবর সার + ৫০ কেজি ইউরিয়া + ২০০ কেজি সিঙ্গেল সুপার ফসফেট + ৫০ কেজি মিউরিয়েট অফ পটাশ + ২৫ কেজি নিমখোল + ২৫ কেজি সরষের খোল মিশিয়ে দেওয়ার পর বেড বানাতে হবে। বেডের আকার হবে ৩ ফুট চওড়া ও ৬ ইঞ্চি উচু এবং জমির আকার অনুযায়ী লম্বা। ছােট ছেদনফুল ও আলগা ফুলের জন্য গাছ থেকে গাছ ও সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে যথাক্রমে ১.৫ x ১.৫ ফুট, অর্থাৎ প্রতিটি বেডেতে ২ টো করে গাছের সারি লাগানো যাবে। কিন্তু বড় ছেদন ফুলের ক্ষেত্রে একটি বেডেতে ৪ সারি গাছ লাগানো যেতে পারে। সেক্ষেত্রে গাছ থেকে গাছ এক ফুট ও সারির থেকে সারির দূরত্ব হবে ৮ ইঞ্চি। দুটি বেডের মাঝখানে একফুট জায়গা ছাড়তে হবে জল দেওয়ার ও অন্যান্য কাজের জন্য। সাধারণত গাছ লাগানো শুরু হয় শ্রাবণ মাস থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত। টবে ফুল চাষের জন্য মাটি ২ ভাগ + ১ ভাগ গোবরসার + ১ গ্রাম ইউরিয়া + ৪ গ্রাম সিঙ্গেল সুপার ফসফেট + ১ গ্রাম মিউরিয়েট অফ পটাশ + ১ গ্রাম নিমখোল + ১ গ্রাম সরষে খোল মিশিয়ে ৪ ইঞ্চি টবে গাছকে বসাতে হবে। গাছের বয়স যখন ১ মাস হয়ে যাবে তখন এই গাছকে ৮ ইঞ্চি টবে পরিবর্তন করতে হবে। সেক্ষেত্রে উপরোক্ত সারের ৪ গুণ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে তবে অন্য বড় টবে পালটাতে হবে। তবে টবে ৮০০-১০০০ ফুল প্রতি গাছে পেতে হলে চারা বসাতে হবে আষাঢ় মাসে।

৬) চাপান সার:

চাপানসার দুইবার দেওয়া হয়, প্রথমবার ২০ দিনের মাথায় ঘাস নিড়ানি দেওয়ার পর। এক্ষেত্রে ১০-২৬-২৬ সার ২৫ কেজি ও সরষের খোল ২৫ কেজি দিয়ে গোড়ায় মাটি ধরাতে হবে। দ্বিতীয়বার ৪০-৪৫ দিনের মাথায় আবার নিড়ানি দেওয়ার পর সমপরিমাণ সার দিয়ে আবার মাটি ধরাতে হবে। যদি দেখা যায় যে, গাছের বৃদ্ধি সেভাবে হয়নি তাহলে IFFCO ১৯-১৯-১৯ জলে দ্রবণীয় সার ১ গ্রাম প্রতি লিটার জলে গুলে প্রতি ১৫ দিন অন্তর স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। টবের গাছের ক্ষেত্রে শেষবার টবে গাছ লাগানোর পর প্রতি ১৫ দিন অন্তর সরষের খোল ও ১০-২৬-২৬ পচানো সার গোড়ায় ঢালতে হবে। এক্ষেত্রে ১০০ গ্রাম সরষের খোল + ১০০ গ্রাম ১০-২৬-২৬ সার ১ লিটার জলে মিশিয়ে পচাতে হবে। উক্ত জলে আরও ৫ গুণ জল মিশিয়ে ওই জল গাছের গোড়ায় ঢালতে হবে। আবার জমিতে সরষের খোল চাপানসার দেওয়া হয়, এক্ষেত্রে প্রথমে সরষের খোলকে বেডের মধ্যবর্তী জায়গাতে ছড়ানো হয় এবং জল দিয়ে ৭ দিন পচানো হয়, তারপর ওই মাটিকে বেডের মধ্যে তুলে দেওয়া হয়, তাতে বেড দুটির মধ্যবর্তী জায়গাগুলি পরিষ্কার থাকে এবং জলনিকাশী ভালো হয়।

Chrysanthemum variety
Chrysanthemum variety

৭) ডাল ছাঁটা ও অন্যান্য পরিচর্যা:

আলগা ফুলের জন্য ৪-৫ বার শাখা প্রশাখার ডগা ছাঁটতে হবে প্রতি ১৫ দিন অন্তর। আবার ছেদন ফুলের জন্য ২-৩ বার ডাল ছাটতে হবে ১৫ দিন অন্তর। উভয় ক্ষেত্রে বেডেতে বাঁশের খুঁটি ও নাইলন দড়ি দিয়ে গাছকে সোজা রাখতে হবে, যাতে গাছ কোনভাবে না হেলে পড়ে। চন্দ্রমল্লিকায় জমিতে ঘাস মারার ওষুধ ব্যবহার না করাই ভাল, এতে গাছের বৃদ্ধির ক্ষতি হয়। নিড়ানির মাধ্যমে আগাছা দমনে ফলন ভালো পাওয়া যায়।

৮) ফলন (Yield) -

প্রতি ৩-৪ দিন অন্তর আলগা ফুল তুলতে হবে এবং ৫-৬ টন ফুল প্রতি একরে পাওয়া যাবে। ছেদন ফুলের ক্ষেত্রে প্রতি একরে ১৮০০০-২০,০০০ গাছ থেকে প্রায় ২,০০,০০০ ফুল পাওয়া যাবে, তবে এক্ষেত্রে ১৫ দিনের মধ্যে সব ফুল তোলা যাবে।

৯) আয় ও ব্যয় (Income and Expenditure) -

প্রতি একরে আলগা ফুলের ক্ষেত্রে ৭০,০০০-৭৫,০০০ টাকা খরচ করে ১,৪০,০০০-১, ৫০,০০০ টাকা পাওয়া যেতে পারে, যদি ফুলের দাম ৩০ টাকা-৩৫ টাকা প্রতি কেজিতে পাওয়া যায়। ছেদন ফুলের ক্ষেত্রে ১,০০,০০০-১,২৫,০০০ টাকা খরচ করে প্রায় ২,৫০,০০০-৩,০০,০০০ টাকা পাওয়া যেতে পারে।

নিবন্ধ - ড. তাপস কুমার চৌধুরী (বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়, মোহনপুর, নদীয়া)

Image Source  - BCKV & Google

Related link - (New seed cultivation in Sunderban) ক্ষেতে মিশেছে নোনাজল, পোক্কালি নিয়ে এল ধানচাষে নয়া দিশা

(Vegetable Seed Sowing Calendar) কৃষকদের জন্য সবজি বীজ বপনের ক্যালেন্ডার ২০২০-২১

(White sandalwood) শ্বেত চন্দন চাষ করে কৃষক উপার্জন করতে পারেন ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি পর্যন্ত

Like this article?

Hey! I am KJ Staff. Did you liked this article and have suggestions to improve this article? Mail me your suggestions and feedback.

Share your comments

আমাদের নিউজলেটার অপশনটি সাবস্ক্রাইব করুন আর আপনার আগ্রহের বিষয়গুলি বেছে নিন। আমরা আপনার পছন্দ অনুসারে খবর এবং সর্বশেষ আপডেটগুলি প্রেরণ করব।

Subscribe Newsletters