শাখা কলম পদ্ধতিতে চারা তৈরির মাধমে চন্দ্রমল্লিকা ফুলের চাষ (Chrysanthemum Flower)

Thursday, 04 March 2021 01:14 PM
Chrysanthemum Flower (Image Credit - Google)

Chrysanthemum Flower (Image Credit - Google)

চন্দ্রমল্লিকা একটি খুবই জনপ্রিয় ফুল। চন্দ্রমল্লিকার আদিনিবাস হলো জাপান ও চীন।আমাদের দেশেও এই ফুলের বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ হয়। বিভিন্ন রংয়ের এই ফুলগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমূল্য রয়েছে প্রথম সারিতে। অক্টোবরে কুঁড়ি আসে এবং নভেম্বরে ফুল ফোটে৷ গাছে ফুল তাজা থাকে ২০ থেকে ২৫ দিন৷  জনপ্রিয়তার দিক থেকে গোলাপের পরই এর স্থান। এটি বিভিন্ন বর্ণ ও রঙের হয়ে থাকে। চন্দ্রমল্লিকা জাপানের জাতীয় ফুল।  বিভিন্ন জাতের চন্দ্রমল্লিকার ফুলের আকার, রঙ ইত্যাদির প্রকারভেদ আছে। এর মধ্যে তামাটে, সোনালি, হলুদ, বেগুনি, লাল, খয়েরি এবং “গ্রিন গডেস” নামের সবুজ চন্দ্রমল্লিকা অত্যন্ত জনপ্রিয়। চন্দ্রমল্লিকা ফুলের বাজারে চাহিদা থাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। 

চাষ:

জলবায়ু ও মাটি (Climate) -

চন্দ্রমল্লিকা তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা আবহাওয়া এবং রৌদ্রজ্জল জায়গা পছন্দ করে।  শীতকালই এই ফুল চাষের উত্তম সময়। জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ সুনিস্কাশিত দো আঁশ ও বেলে মাটি চন্দ্রমল্লিকা চাষের জন্য উপযোগী। মাটির পিএইচ ৬.০-৭.০ হওয়া বাঞ্জনীয়।

চারা তৈরি (Plantation) - 

বীজ, সাকার ও শাখা কলম থেকে চন্দ্রমল্লিকার চারা তৈরি করা যায়। বীজ থেকে চারা করলে তা থেকে ভাল ফুল পাওয়া যায় না এবং ফুল পেতে অনেক দিন লেগে যায়। অন্য দিকে ডাল কেটে শাখা কলম করলে বা সাকার থেকে চারা করলে এ সমস্যা থাকে না। এদেশে শাখা কলম করেই সাধারনত চারা তৈরি করা হয়। জুলাই মাসের  মাঝামাঝি সময় থেকে শাখা কলম করা শুরু হয়। এক বছর বয়সী সতেজ সবল ডাল থেকে ৮-১০ সেমি লম্বা ডাল তেরছাভাবে কেটে বেডে বা বালতিতে বসিয়ে দিলে তাতে শিকড় গজায়। ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে যখন ফুল দেওয়া শেষ হয়ে যায় তখন গাছগুলোকে মাটির উপর থেকে ১৫-২০ সেমি রেখে কেটে দেয়া হয়। কিছু দিন পর ওসব কাটা জায়গার গোড়া থেকে কিছু সাকার বের হয়। এসব সাকার ৫-৭ সেমি লম্বা হলে মা গাছ থেকে ওদের আলাদা করে ছায়াময় বীজতলায় বা টবে লাগানো হয়। মে- জুলাই মাসে চারাকে বৃষ্টি ও  কড়া রোদ থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

চারা রোপনঃ

শেষবারের মত নিদিষ্ট স্থানে কিংবা টবে রোপনের পূর্বে চারাগুলোকে স্বতন্ত্র জমিতে কিংবা টবে পাল্টিয়ে নিয়ে তাদের ফুল উৎপাদনের উপযুক্ততা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। জমি কিংবা টবে চারা রোপনের উপযুক্ত সময় অক্টেবর- নভেম্বর। জাতভেদে ৩০ x ২৫ অন্তর চন্দ্রমল্লিকা রোপন করতে হবে।

সার প্রয়োগঃ

চন্দ্রমল্লিকা গাছ মাটি থেকে প্রচুর পরিমানে খাদ্যোপাদন শোষন করে থাকে। এ কারণে জৈব ও রাসায়নিক খাদ্যযুক্ত মাটিতে এ গাছ খুব ভালোভাবে সাড়া দেয়। ভালো ফলন পেতে হলে জমিতে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে। নিম্নে হেক্টর প্রতি জমিতে সারের পরিমাণ দেওয়া হলো-

পঁচা গোবর/কম্পোস্ট ৮-১০ টন

ইউরিয়া       ১৫০ কেজি

টিএসপি      ১০০ কেজি

মিউরেট অব পটাশ   ১০০ কেজি

জিপসাম      ৩৫ কেজি

বোরিক এসিড ১০ কেজি

জিংক অক্সাইড       ১০ কেজি

সাকার রোপণের ১০-১৫ দিন পূর্বে পঁচা গোবর/কম্পোস্ট এবং ইউরিয়া বাদে অন্যান্য সার ৭-১০ দিন পূর্বে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। সাকার রোপণের ২৫-৩০ দিন পর ইউরিয়া সারের অর্ধেক প্রয়োগ করতে হবে এবং বাকি অর্ধেক সার সাকার রোপণের ৪৫-৫০ দিন পর  অর্থাৎ ফুলের কুঁড়ি আসার সময় গাছের গোড়ার চারপাশে একটু দূর দিয়ে প্রয়োগ অথবা উপরি প্রয়োগ করতে হবে। উপরি প্রয়োগের পর সার মাটির সাথে মিশিয়ে সেচ দিতে  হবে।

টবে সার প্রয়োগ:

পটে জন্মানোর জন্য ২ ভাগ মাটি, ২ ভাগ গোবর সার, ১ ভাগ পাতা পচা সার ও ১ ভাগ হাড়ের গুঁড়ার সাথে ৩ গ্রাম টিএসপি, ৩ গ্রাম মিউরেট অব পটাশ এর মিশ্রণ ব্যবহার করা উত্তম। ৮ গ্রাম ইউরিয়া সারের অর্ধেক সাকার/কাটিং রোপণের ২৫-৩০ দিন পর গাছের দৈহিক বৃদ্ধির সময় এবং বাকি অর্ধেক ফুলের কুড়ি আসার সময় উপরি প্রয়োগ  করা উচিত।

সেচ:

চন্দ্রমল্লিকার চারা বিকালে লাগিয়ে গোড়ার মাটি চেপে দিতে হবে। চন্দ্রমল্লিকার চারা লাগানোর পর হালকা সেচ দিতে হবে। চন্দ্রমল্লিকা গাছ কখনো বেশি পানি সইতে পারে না। তাই পানি এমনভাবে দিতে হবে যেন গোড়ায় বেশিক্ষণ পানি জমে না থাকে। চারা রোপণের পূর্বে এবং পরে প্রতিদিন নিয়মিতভাবে পরিমানমত পানি সেচ দেয়া জরুরি।

চন্দ্রমল্লিকার অন্যান্য পরিচর্যাঃ

কুঁড়ি বা শাখা ভাঙ্গা: কাণ্ডের আগার অংশ অর্থাৎ অগ্রভাগ কেটে ফেলাকে শাখা ভাঙ্গা বা পিনচিং বলে। সাধারণত চারা লাগানোর ২৫-৩০ দিন পর পিনচিং করলে গাছটি লম্বা না হয়ে ঝোপালো হয় এবং অধিক ফুল পাওয়া যায়।

কুঁড়ি অপসারণ:

অনাকাঙ্ক্ষিত অপরিপক্ক ফুলের কুঁড়ি অপসারণ করাকে কুঁড়ি অপসারণ বলা হয়। চারা গাছে তাড়াতাড়ি ফুল আসলে তা সঙ্গে সঙ্গে অপসারণ করতে হয়। বড় আকারের ফুল পেতে হলে  ডিসবাডিং করা উচিৎ অর্থাৎ মাঝের কুঁড়িটি রেখে পাশের দুটি কুঁড়ি কেটে ফেলতে হয়। আর মধ্যম আকারের ফুল পেতে চাইলে মাঝের কুড়িটি অপসারন করা উচিত।

ঠেস দেওয়া:

চন্দ্রমল্লিকার ফুল সাধারণত ডালপালার তুলনায় ভারী ও বড় হয়। তাই গাছের গোড়া থেকে কুঁড়ি পর্যন্ত একটা শক্ত কাঠি পুঁতে দিতে হয়। এতে ফুল নুয়ে পড়বে না। চারা লাগানোর সময় কাঠি একবারই পুঁতে দেয়া ভাল। এজন্য জাত বুঝে চন্দ্রমল্লিকা গাছের উচ্চতা অনুযায়ী বাঁশের কাঠি চারার গোড়া থেকে একটু দূরে পুঁতে দিতে হবে। একবারে গোড়ায় পুঁতলে বা গাছ বড় হয়ে যাওয়ার পর পুঁতলে অনেক সময় শিকড়ের ক্ষতি হতে পারে, এমনকি শিকড়ে ক্ষত সৃষ্টি হলে রোগ জীবাণু ক্ষতের মাধ্যমে গাছে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে পারে।

আরও পড়ুন - কাঠ গোলাপ বা ফ্রাংগিপানি ফুলের চাষ পদ্ধতি (Frangipani Flower Cultivation)

রোগবালাই ও দমন ব্যবস্থা:

পাউডারী মিলডিউ: এ রোগ হলে গাছের পাতার উপর সাদা থেকে ধূসর গুঁড়ার মতো আবরণ পড়ে এবং আস্তে আস্তে পাতা কুকড়িয়ে নষ্ট হয়ে যায়। বেশি আক্রমণে পাতা শুকিয়ে গাছ মারা যায়। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে।

রোগ দমনঃ

মাঠে যথাযথ রোপণ দূরত্ব অনুসরণ করে গাছের জন্য পর্যাপ্ত আলো বাতাস সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

সোডিয়াম বাইকার্বোনেট (যেমন-বেকিং সোডা) ১ লিটার পানিতে ৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ৩-৫ বার স্প্রে করতে হবে।

আক্রমণ বেশি হলে জাতীয় ছত্রাকনাশক (যেমন-থিয়োভিট ৮০ ডব্লিউজি বা কুমুলাস ডিএফ) ১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে অথবা প্রোপিকোনাজোল (যেমন-টিল্ট ২৫০ ইসি) ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

পাতায় দাগ পড়া বা ঝলসানো রোগঃ

এ রোগের আক্রমণে প্রথমে নিচের পাতায় হলদে দাগ পড়ে এবং আক্রমণের মাত্রার উপর নির্ভর করে বাদামী থেকে কালো দাগে পরিণত হয়।

দমনঃ

গাছের গোড়াতে খড় জাতীয় মালচ্ ব্যবহার করলে তলার পাতার আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম থাকে।

পরিমিত সেচ প্রদান করতে হবে এবং সেচের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন গোড়ার পাতা না ভিজে।

আক্রমণ বেশি হলে কার্বেন্ডাজিম (যেমন-অটোস্টিন বা নোইন বা এমকোজিম বা বেনলেট) প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম অথবা ট্রাই ব্যাসিক কপার সালফেট (যেমন-কিউপ্রোক্স্যাট ৩৪৫ এসসি) ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার গাছে স্প্রে করতে হবে।

গ্রে মোল্ড:

এ রোগের আক্রমণে ফুলের পাঁপড়ি, পাতা এমনকি কাণ্ডেও বাদামী পানি ভেজা দাগ দেখা যায়। আক্রান্ত গাছে ধূসর থেকে বাদামী পাউডারের মত আস্তরণ পড়ে। দীর্ঘকালীন আর্দ্র ও মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া এ রোগ বিস্তারে খুবই সহায়ক।

দমনঃ

এ রোগ দমনে রোপণ দূরত্ব অনুসরণ করে গাছকে পর্যাপ্ত আলো বাতাস সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

আক্রমণ বেশি হলে রোভানন বা রোভরাল (০.২%) স্প্রে করা যেতে পারে।

পোকামাকড় ও দমন ব্যবস্থা: চন্দ্রমল্লিকা ফুলে সাধারণত জাব পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়।

জাবপোকা:

এ পোকা খুব ছোট আকৃতির, নরম ও কালো-সবুজ বর্ণের। শীতকালে এর প্রকোপ খুব বেড়ে যায়। এ পোকা গাছের পাতা, ডগা এবং ফুল থেকে রস চুষে খেয়ে গাছের ক্ষতি করে। আক্রান্ত নতুন কুঁড়ি ও পাতা কুঁকড়ে যায়।

দমন ব্যবস্থাঃ

এ পোকা দমনে প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত পাতা বা ফুল ছিঁড়ে ফেলে পোকাসহ ধ্বংস করা উচিত।

সাবান গুঁড়া ৫ গ্রাম/লিটার হারে পনিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন অন্তর ২-৩ বার স্প্রে করেও এ পোকা দমন করা যেতে পারে।

আক্রমণ বেশি হলে ডাইমেথয়েট জাতীয় কীটনাশক (পারফেকথিয়ন/সানগর/ রগর / টাফগর ৪০ ইসি) ২.০ মিলি./লিটার  অথবা ইমিটাক্লোপ্রিড জাতীয় ( টিডো/ ইমিটাফ ) ২ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

ফুল সংগ্রহঃ

চন্দ্রমল্লিকা ফুল কুঁড়ি অবস্থায় তুললে ফোঁটে না। বাইরের পাপড়ি গুলো সম্পূর্ণ খুলে গিয়েছে এবং মাঝের পাপড়ি গুলো ফুটতে শুরু করেছে এমন অবস্থায় খুব সকালে অথবা বিকেলে ধারালো ছুরি দিয়ে দীর্ঘ বোঁটাসহ কেটে ফুল তোলা উচিত।

আরও পড়ুন - আলু পরবর্তী ফসল রূপে ভুট্টার চাষে হবে কৃষকের দ্বিগুণ লাভ, জানালেন কৃষি বিজ্ঞানীরা (Maize cultivation As Zaid Crop)

English Summary: Cultivation of chrysanthemum flowers by making seedlings using graft system

আপনার সমর্থন প্রদর্শন করুন

প্রিয় অনুগ্রাহক, আমাদের পাঠক হওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার মতো পাঠকরা আমাদের কৃষি সাংবাদিকতা অগ্রগমনের অনুপ্রেরণা। গ্রামীণ ভারতের প্রতিটি কোণে কৃষক এবং অন্যান্য সকলের কাছে মানসম্পন্ন কৃষি সংবাদ বিতরণের জন্যে আমাদের আপনার সমর্থন দরকার। আপনার প্রতিটি অবদান আমাদের ভবিষ্যতের জন্য মূল্যবান।

এখনই অবদান রাখুন (Contribute Now)

CopyRight - 2018 Krishi Jagran Media Group. All Rights Reserved.